সে দুজন যাত্রীকে ঠেলে প্রায় আগে উঠে গেল। এ-বাসটায় একটা পিন পড়ার জায়গা নেই। ইস্টবেঙ্গল মোহনবাগান খেলা কাল। পাশে দু-জন যুবক খুব হই-চই করছে। ওরা দুজনই টিকিট সংগ্রহ করে ফিরেছে। দুনিয়াতে ওরা এখন এমন ভালো কাজ নেই যা করতে পারে না। ওরাই ওকে মাঝখানটায় চ্যাপ্টা হয়ে যেতে দেখে খুব ভালো মানুষের মতো ঠেলে একটু এগিয়ে যাবার রাস্তা করে দিল। বলল, দেখুন ওদিকে লেডিস সিট খালি থাকতে পারে। কিন্তু শ্রাবণীর এই সাতফুট রাস্তা অতিক্রম করা এ-জীবনে সম্ভব নয় বলে ভিড়ের মধ্যে ক্রমে চ্যাপ্টা হয়ে যেতে থাকল। সামনে চাপ, পেছনে চাপ ডাইনে চাপ বাঁয়ে চাপ।
বাস থেকে নেমে শ্রাবণী হতবাক। লোড শেডিং। চারপাশে গভীর আচ্ছন্ন অন্ধকার। বাস থেকে নেমে এতটা পথ অন্ধকারে যাবে কী করে, ভাবতেই কেমন মুষড়ে পড়ল।
সামনের রাস্তাটা হঁট সুড়কির। ডানদিকে বড়ো একটা মাঠ। মরশুমে ফুটবল খেলে পাড়ার ছেলেরা। বাঁদিকে কিছুটা বস্তি অঞ্চল পার হয়ে একটা টিনের কারখানা। রাস্তা বরাবর অনেকটা দূর পর্যন্ত লোনাধরা হঁটের দেয়াল। তারপর বেশ ফাঁকা মতো জায়গা কিছুটা—একটা ভাঙা শ্যাওলাধরা বাড়ি। কবেকার কে জানে। দিনের বেলাতেই বাড়িটা ভূতুড়ে বাড়ি বলে মনে হয়। একজন বুড়োমতো মানুষ থাকে বাড়িটাতে। সারারাত জানালায় সে দেখেছে কেউ একটি হ্যারিকেন জ্বালিয়ে রাখে। সব বাড়িতেই বিদ্যুতের আলো—কেবল ও-বাড়িটাতে এখনও কেরোসিনের বাতি জ্বলে। ও-বাড়িটা পার হলে সূর্যদের বাড়ি। নমিতার দাদা সূর্য বেকার যুবক। দুবারের পর বি-এ পাস করেছে। এখন পাড়ার বেশ ডাকসাইটে মাস্তান। দুবার চাকু খেয়েও প্রাণে বেঁচে আছে। চায়ের দোকানি গোবিন্দ এখন ওর একমাত্র সঙ্গী। গত শীতেও একবার ওকে দেখে শিস দিয়েছিল। সে এ-রকম সময়ে খুব সাহসী হয়ে যায়। কাছে গিয়ে বলেছিল, কী, কিছু বলবেন? সূর্যদা খুব ভালোমানুষ সেজে গেছিল তখন। বলেছিল, কোথায় গেছিলে। শ্রাবণী বলেছিল, সিনেমা দেখতে।
কী বই?
–সোলে।
-বাপস। আমি তো তেরোবার দেখলাম। আবার দেখব।
শ্রাবণী বলেছিল, আমি একবারই দেখেছি। আর দেখব না।
তারপরই সে রাস্তার অন্ধকারে পা বাড়াল। সেই চায়ের দোকানটায় সুন্দরমতো ছেলেটাকে দেখল না। অথবা হ্যারিকেন জ্বালিয়ে রেখেছে বলে স্পষ্ট বোঝাও যায় না, কারা ওখানে আছে। এই রাস্তাটুকু যদি সে এসে পার করে দিয়ে যেত।
এমনিতে সামান্য রাত হলে রাস্তাটা খালি হয়ে যায়। দু-একজন উঠতি বয়সের ছোকরা হিন্দি সিনেমার গান গেয়ে এ জিন্দাগি লুট গেয়া বলে চেঁচায়, শ্রাবণী ওদের ভয় পায় না। কিন্তু সূর্যটা খুবই বেপরোয়া। ওর কেমন ঘাম দেখা দিল শরীরে। আশ্চর্য, সারাটা রাস্তা কতভাবে যে এতক্ষণ নৈনিতাল উটি হাজারিবাগে ঘুরে এল। সঙ্গে সেই সুর্যের মতো কেউ সারাক্ষণ পাশে পাশে হেঁটেছে।
টিপ টিপ বৃষ্টিটা আর নেই।
সুনীলদা টিউশান সেরে এ সময়ই ফেরেন। ওর সঙ্গে দেখা হয়ে গেলেও এতটা ভয় থাকত না। ওর খুবই ইচ্ছে হচ্ছিল, সুনীলদা এখন সঙ্গে থাকুক। টিউশান সেরে যদি ঠিক এই সময়ে ম্যাজিকের মতো সামনে এসে উপস্থিত হত। এতে তার কয়েক প্রকার সুবিধা ছিল। প্রথমত সুনীলদা খুব বেশি একটা চায় না। সে যতটা দেবে সুনীলদা ততটাই নেবে। একবার অদ্ভুত কাণ্ড ঘটেছিল সনীলদার ঘরে। এবং সেই দাদাটির ঘরে পড়ার নাম করে কিছুক্ষণ থাকতে পারলে শরীরের মার্জিনেল ইউটিলিটির মানেটা স্পষ্ট বোঝা যেত তখন।
কী কাণ্ড। এটা কী করছ সুনীলদা!
দরজা বন্ধ করে দিলে শ্রাবণী বলেছিল।
সুনীলদা বলেছিল, কেউ নেই। দাদা বৌদি অন্নপ্রাশনের নেমন্তন্ন খেতে গেছে।
শ্রাবণী বলেছিল, তাই বলে দরজা বন্ধ করে দেবে।
সুনীলদা কেমন অপরাধীর গলায় বলেছিল, আমি একটু দেখব। এই বলে তস্করের মতো তার দিকে তাকিয়েছিল কিছুক্ষণ।
সুনীলদা অবশ্য ডিম্যান্ড অ্যান্ড সাপ্লাই-এর টোট্যাল ইউটিলিটির দিক থেকে কিছুটা কমতি ছিল। বাবা-মা ওর জন্য যা টাকা সঞ্চয় করেছে, তাতে করে ডাক্তার এঞ্জিনিয়ার পাত্র সহজেই সাপ্লাই পাওয়া যাবে। তবে সে তো আরও কিছুদিন প্রতীক্ষা করার পর। অনার্স নিয়ে বি.এটা পাস, গানের স্কুল থেকে ডিপ্লোমা—এতসব হবার পর। দীর্ঘসময় কিন্তু ভেতরটাতে বরাবরই আগুনের ফুলকি উঠছে। পুরুষ মানুষের কাছে থাকলে কেমন বাতাসটা আরও বেড়ে যায়। ফুলকিরা শরীরের আনাচে-কানাচে ঘোরে। খুব নির্বোধই মনে হয়েছে সুনীলদাকে। বড়ো বেশি ভালো মানুষ। মেয়েদের শরীরে কিছু আছে, কথাবার্তায় এতটুকু বোঝ যেত না তার। এক বিকেলে সিঁড়ি ধরে নেমে যাচ্ছে সুনীলদা, শ্রাবণী বাথরুম থেকে বের হয়েছে। বালতিতে সামান্য জল। কেউ কাছেপিঠে নেই—কী যে ইচ্ছে হল তার—একটু জল নিয়ে সুনীলদার শরীরে ছিটিয়ে দিতেই কেমন চোখ মুখ জ্বলে উঠল মানুষটার। বলল, এদিকে এস।
-না না। আমি পারব না।
–তবে যাও। বলে সুনীলদা চলে গেল।
বাসে যেতে আসতে, কলেজে গানের স্কুলে আত্মীয়ের বাড়ি, রানার মামার বাড়ি যখন যেখানে শ্রাবণী থাকে যখন যেখানে যে-ভাবে থাকে শীতে গ্রীষ্মে, শরতে বসন্তে সব সময় শরীর তার মার্জিনেল ইউটিলিটির আওতায়। কিন্তু এখন সে কী করবে। গানের স্কুল থেকে ফিরতে এমনিতেই একটু বেশি দেরি হয়ে গেছে। বাড়িঘর তেমন খুব ঘন নয় এখানে। মাঝে মাঝে ছোটোছোটো ঝোপ জঙ্গলও আছে খালের পাড়টাতে। দু-একবার ছিনতাইটিনতাইও হয়েছে বলে খবর পাওয়া গেছে। বাস থেকে নেমে সেডের নীচে কিছুক্ষণ দাঁড়িয়েছিল। মানুষজন আছে কথাবার্তা বলছে সবাই—অথচ এতবড়ো কলকাতায় তার যে কত বড়ো সমস্যা ওই রাস্তাটুকু পার হয়ে যাওয়া কেউ বুজছে না। সে আরও দাঁড়িয়েছিল, পাড়ার পরিচিত কাউকে বাস থেকে নামতে দেখলে তার সঙ্গে হেঁটে চলে যাবে। দুটো তিনটে বাস এল। কারু মুখই এ-সময় চেনা মনে হল না। শুধু একবার দেখল দু তিনজন যুবক রাস্তাটার অন্ধকারে নেমে গেল। শ্রাবণীর কেমন যেন রাগ হল মা বাবার ওপর। বাড়ি ফিরতে দেরি হচ্ছে কেউ একটু ভাববে না। বড়ো রাস্তায় এসে কারও দাঁড়িয়ে থাকা উচিত না! সে যেন বাবা-মার ওপর রাগ করেই অন্ধকার নির্জন পথটার নেমে গেল। তে যে ভালো হয়ে আছি, সেটা কার মুখের দিকে চেয়ে! আর তোমরা নিশ্চিন্তে বসে আছ বাড়ি। টেলিভিশন দেখছ। তারপরই মনে হল লোডশেডিং, টেলিভিশন দেখবে কী করে। আবার মনে হল, ওদের দিকটায় লোডশেডিং নাও হতে পারে। খুব মজা। যাকগে কিছু হয়ে গেলে আমি কিচ্ছু জানি না। আমার কোনো দোষ নেই। তোমরা মা-বাবা, তোমরা যদি না বোঝ এই অন্ধকার রাস্তায় হাঁটা আমার অনুচিত, তবে আমি কী করব।
