শ্রাবণী ধরফর করে ঠিক-ঠাক হয়ে বসল। রাজাবাজার এসে গেছে। সে ব্যাগ থেকে কুড়িটা পয়সা বের করে টিকিট কাটল। টিকিটটা নিয়ে ঘড়ির ব্যান্ডে খুঁজে রাখার সময় দেখল বুকের আঁচল সামান্য আলগা। একটা মধ্যবয়সী লোক আড়চোখে বেশ গোপনে কিছুটা মজা পাচছে।
পাশের মেয়েটা নোংরা পোষাকে বসে আছে। সে যতটা পারছে আলগা হয়ে বসার চেষ্টা করেছিল। কিন্তু ভিড়ের বাসে তা হয় না। একজন বেটে মতো যুবক কখন ঠেলে আরও ভেতরে ঢুকে গেছে। আগের মানুষটাকে ঠেলে সরিয়ে দিয়ে তার শরীরের গন্ধ নেবার জন্য কেমন ঝুঁকে দাঁড়িয়েছে। ভিড়ের অছিলায় সে তার একটা পা ওর পায়ের ভাঁজের মধ্যে কোন এক ফাঁকে ঢুকিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। মাত্র পাঁচ ইঞ্চির মতো ব্যবধান। ওর রেলগাড়ি ঝিক ঝিক আর তার নিজের রেলগাড়ির ঝিক-ঝিকের মধ্যে ব্যবধান ফুট ইঞ্চিতে মাপলে এত কম দূরত্ব যে শরীরে সামান্য উষ্ণতা না জেগে পারে না।
একবার তো সে আর সুজয় সারা বিকেল একটু নিরিবিলি জায়গায় বসে প্রেম প্রেম খেলা খেলতে চেয়েছিল।
রেস্তোরাঁয় ওরা ভেবেছিল পর্দা টেনে খেলাটা খেলবে। আশ্চর্য বেয়ারাগুলো, এট ওটা, আর কি লাগবে, চা, তারপর কাটলেট, জল, এবং এতবার পর্দা ফাঁক করে ওদের লক্ষ রাখছিল যে দু-পায়ে ছুঁয়ে বসে থাকা বাদে আর বেশি কিছু করা যায়নি। অথচ ভিড়ের বাসে ইচ্ছে থাকলে কত কিছু হয়ে যেতে পারে। সে ভাবল সেই সুন্দরমতো যুবককে নিয়ে একদিন ভিড়ের বাসে ঘুরে বেড়াবে। ভিড়ের বাসে, তার মনে হল, কিছুই আটকায় না। শিয়ালদায় শ্রাবণী নেমে গেল। টুকিটাকি দুটো একটা জিনিস কিনতে হবে। একটা পেস্ট, এক কৌটো ফেশ-পাউডার, কুড়ি পয়সার চিনেবাদাম, বাবার জন্য দুটো গেঞ্জি, পছন্দমতো ব্রেসিয়ার পেলে একটা কিনে নেবে। অথচ টিপ টিপ বৃষ্টিটা থামছে না। এরই মধ্যে গল গল করে ট্রেনগুলো উগড়ে দিয়ে যাচ্ছে লোকজন। গায়ে গায়ে ঠোকাঠুকি সতর্ক না থাকলে হবেই। সে ভেবেছিল বড়ো মাসির ছেলেকে নিয়ে একদিন ভি আই পি রাস্তাটা হেঁটে পার হবে। একবার ট্যাকসিতে সে ছোটো মাসি আর তার দেওর অময়কাকুর সঙ্গে দমদম এয়ারপোর্টে গিয়েছিল। তখনই সেই সুন্দরমতো ভারি প্রশস্ত রাস্তাটা দেখে অবাক। কত সব গাছপালা, ফুল ফলের গাছ, বোগেনভেলিয়ার ঝাড়। পিংক কালারের ফুলে একেবারে সারা রাস্তাটা উজ্জ্বল হয়ে আছে। বড়ো বড়ো পুকুর প্রায় হ্রদের সামিল। ছই দেওয়া একটা নৌকাও সে দেখেছিল। নৌকাটার মধ্যে তার ইচ্ছে হয়েছিল সেই সুন্দর মতো ছেলেটাকে নিয়ে কিছুক্ষণ বসে থাকবে।
—এই।
–কী।
—বসবে একটু।
–বসে কি হবে। এস না হাঁটি।
–দেখব।
–কী দেখবে বলবে তো?
—এই মানে।
–আচ্ছা মুসকিল তোমাকে নিয়ে। সোজা কথা সহজভাবে বলতে পার না।
–তুমি রাগ করবে।
-রাগ করার কথা হলে রাগ করব না?
–ওটা রাগ করার কথাই।
—তা হলে বল না।
–ঠিক আছে। ওঠ।
–এই হল মুখ গোমড়া করে ফেললে তো।
–না, মুখ গোমড়ার কি আছে। এমন সুন্দর নিরিবিলি জায়গা তো পাওয়া যায় কোথাও।
-সত্যি নিরিবিলি। গাছপালা পার হয়ে খালের ধারে দু-জনে বসে, কেউ দেখতে পাচ্ছে না, এর চেয়ে নিরিবিলি জায়গা কলকাতায় আর কোথায় আছে।
—সেই তো। কত ফুল। ওগুলো কী ফুল?
–চিনি না। বেশ ফুলগুলি। গুচ্ছ গুচ্ছ, কদম ফুলের মতো।
—সত্যি কদম ফুলের মতো। তারপরই কেমন সুন্দরমতো ছেলেটা বলল, বয়স বাড়লেই মানুষের কী যে হয়। কদম ফুল দেখার সখ হয়।
শ্রাবণীর মুখটা কেমন লাল হয়ে গেল। মনের মধ্যে এই বয়সে এই এক খেলা। কখনো কদম ফুল, কখনো বাবুইর বাসার মতো নরম সবুজ শুকনো ঘ্রাণ, আর যেন কি একটা কিনতে হবে—ও দুটো গেঞ্জি। কত মাপের? ছত্রিশ। ছত্রিশে বাবার আজকাল হয় না। আটত্রিশ দরকার। শ্রাবণী বলল, আটত্রিশ আছে?
দোকানি বলল, আছে। বলে বাক্স টেনে বের করল।
শ্রাবণী বলল, দুটো দাও।
দোকানি গেঞ্জী দুটো দিলে সবটা ভাঁজ খুলে দেখল কোথাও টুটা-ফাটা আছে কিনা। সে ব্রেসিয়ার চাইল একটা। খুব হাল ফ্যাসানের একটা বাকস। ওপরে জাঙ্গিয়া আর ব্রেসিয়ার পরা একটা মেয়ের ছবি। সে ছবিটার দিকে তাকিয়ে ভাবল, আজকাল মেয়েরা শাড়ি শায়ার নীচে কেউ কেউ জাঙ্গিয়া পরে। সে অবশ্য এখনও পরে দেখেনি। কলেজে পেনু বলে একটা মেয়ের সঙ্গে ওর খুব সখ্যতা। ওর অনেক পুরুষ বন্ধু। ওদের সঙ্গে সে বেশ ঘুরে বেড়ায়। ওর কথা শুনলে মনে হয়, সে কাউকে বিশ্বাস করে না।
প্যাকেট হয়ে গেলে শ্রাবণী বলল, কত দাম।
দোকানি বলল, আঠারো টাকা আশি পয়সা।
কিছু কম হবে না।
–দুটো দোকানে জিজ্ঞেস করতে পারেন। এখানে এক দাম।
আর বাকি থাকল কুড়ি পয়সার চিনাবাদাম। ওটা কেনা হলেই তার হয়ে যায়। ঘড়িতে দেখল আটটা বেজে গেছে। বাসে ওঠার জন্য তাকে আরও পনেরো মিনিট। দাঁড়িয়ে থাকতে হবে। সে দেখেছে, তার বাসটাই বেশি দেরি করে আসে। বাসস্ট্যান্ডে গরম বাদাম ভাজা পাওয়া যায়। টিপটিপ বৃষ্টিতে বাদাম ভাজা চানাচুর ভাজা খেতে শ্রাবণীর বেশ লাগে। শ্রাবণী এমনিতেই লম্বা, শরীরে মাসে আরও একটু হলে সে খুবই সুন্দরী হতে পারত। এই মাংস লাগাবার জন্য আজকাল কলেজ থেকে ফিরে একটু দিবানিদ্রার অভ্যাস করেছে। আগে বড়ো গল্পের বই পড়ার নেশা ছিল।
বাসটা এসে গেল যা হোক। কুড়ি পয়সার চিনাবাদাম শেষ পর্যন্ত কেনা হল না। বাদাম কিনতে গেলে বাসটা ধরা যেত না।
