—কেউ ছিল বুঝি সঙ্গে।
-আরে না না। আমি তেমন মেয়েই নই। তবু কি জানেন, আমরা যে হোটেলটায় উঠেছিলাম, তার নীচে দুটো বাউন্ডুলে ছেলে কদিন থেকে খুব মদদ
খেয়ে পড়ে থাকত। বিকেল হলেই ওরা বের হয়ে যেত গাড়িতে। ঘুরে ফিরে আসতে অনেক রাত করে ফেলত। আমি চুপচাপ বারান্দায় বসে থাকতাম।
—এদের আপনার ভালো লেগে গেছিল।
–একদিন আমাদের তিনজনকে নিয়ে ওরা রাঁচির দিকে রওনা হয়ে গেছিল। ভারি সুন্দর স্বভাব। সেদিন ওরা এত ভালো হয়ে গেছিল, যে বোঝাই যায়নি, ওরা মদো মাতাল। আমারও পাহাড়ে উঠে যাই ওদের সঙ্গে। ফিরি রাত করে। ওরা কখনো বলবে, কি সুন্দর আকাশ। নক্ষত্র উঠলে আমার বলতে ইচ্ছে হত, জীবন এ-ভাবেই বুঝি মানুষের শুরু হয়। আমার কেন জানি নিরিবিলি গাছের ছায়ায় ওদের সঙ্গে কত রকমের কথা বলতে ইচ্ছে হত। তবে কি জানেন, আমি পারি না। ঠিক জমিয়ে গল্প করতে পারি না। ভেতরে কত রকমের ইচ্ছে হয়, সব কী বলা যায়। আর বললে ওরাই কী ভাববে বলুন, দুদিনের পরিচয়ে মানুষ তো আর সব তার খুলে দিতে পারে না। আচ্ছা আপনিই বলুন, পারে?
সুন্দর মতো যুবকটি খুক খুক করে হাসল।
-আপনি হাসছেন।
–আহা একটু দেখে হাঁটুন।
সত্যি সে ভারি অন্যমনস্ক হয়ে গেছিল। যুবকেরা চারপাশে কেন যে কেবল এ ভাবে আজকাল ক্রমে ভিড় বাড়াচ্ছে। এক পয়সার পালা দেখে যারা বের হয়েছিল, তাদের অনেককে হতাশ করে হালসিবাগানের মোড় থেকে সে বাসে উঠে গেল।
বাইরে টিপ টিপ বৃষ্টি তেমনি পড়ছে। কনডাকটার হাঁকছে, পরেশনাথ গেট। একজন যুবক ওর পেছন থেকে ঠেলে বের হয়ে গেল। হাতটা ঠিক জায়গায় একবার চুঁইয়ে গেছে। ঘাড়ের ওপরে নিঃশ্বাস পড়তেই বুঝল, আবার কেউ এসে তার শরীর ঘেঁসে দাঁড়িয়েছে। সে বুজতে পারে এই বয়সে কেউ কখনও খালি থাকে না। সে তার খাতাটা বুকের কাছে আর তুলে রাখার দরকার মনে করেনি। নেমে যাবার সময় খুব ভিড় থাকলে খাতাটা আবার দরকার পড়বে। সে এখন বেশ সোজা হয়ে দাঁড়াতে পেয়েছে।
মানিকতলায় আসতেই মোটা মতো বুড়িটা উঠে গেল। এতক্ষণ প্রায় দুজনের মতো জায়গা জুড়ে বসেছিল। শ্রাবণী টুপ করে জায়গায় বসে পড়ল।
বেশ আরাম। চোখ বুজে আসতে চাইল আরামে! ভিড়ের বাসে এই একটুখানি বসার জায়গা কত যে দুর্লভ না বসতে পারলে ঠিক বোঝা যায় না। কেন আর তার শরীর ছুঁয়ে পুরুষেরা কাঁঠাল পাকার মতো টিপে টিপে কিছু আর পরখ করার সুযোগ পাবে না। শ্রাবণীর ভিড়ের বাসে উঠলেই এমন মনে হয়। সব বজ্জাত হয়ে যায়। তখন বোঝাই যায় না এরা কেউ সংসারে বাবা, দাদা, কাকা। যেন সবই তখন ভিড়ের মধ্যে নানারকম অছিলায় মেয়েদের শরীরের যেটুকু ঘ্রাণ পাওয়া যায় চুরি করে নিতে পছন্দ করে।
বাসটা চলতে আরম্ভ করলেই রাস্তার মানুষ-জন চোখে পড়তে থাকে। ছাতা মাথায়, কাদা মাড়িয়ে তারা যাচ্ছে। বৃষ্টিটা বোধ হয় আজ আর থামছে না। এই বৃষ্টির দিনে আর বসে তার রেয়াজ করতে ভালো লাগে, কবিতার বই পড়তে ভালো লাগে। আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে যত প্রসাধন আছে সব শরীরে মুখে মেখে কারও জন্য অপেক্ষা করতে ভালো লাগে। তখন যে যুবকই যাক না রাস্তা ধরে, সুন্দর সুপুরুষ যুবা হলে মনে মনে তার কাছে আত্মসমর্পণ করতে ইচ্ছে হয়।
এ-সব কেউ বুঝি তার বুঝতে পারে না। না বাবা, না মা। বরং বাবা মা-তো ওর কথাবার্তা শুনে মনে করে সে ভারি বালিকা। তার এখনও কত কাজ পড়ে আছে। কলেজের পড়া শেষ করাটা তার এখন সবচেয়ে বেশি দরকার। গান বাজনার শখ আছে। মা তাকে শৈশবে একটা নাচের স্কুলে ভর্তি করে দিয়েছিল- এখনও সে সেই এক নৃত্যনাট্য যখন কেউ বাড়ি থাকে না, আয়নার সামনে গুন গুন করে গান গাইতে গাইতে দুই হাতে যাবতীয় মুদ্রা ফুটিয়ে পা তুলে, অথবা ফাঁক করে মন মোর মেঘের সঙ্গী’…উড়ে যেতে ভালোবাসে। কেউ বোঝে না কেন এটা হয়। ভেতরে কে এই অপরূপ? যার জন্য সে কেবল ফুটে উঠতে চায়। সেই সুন্দরমতো ছেলেটার জন্য, না নিজের শরীরের রক্তে ক্রমে কূট খেলায় মত্ত হবার বাসনাতে কেউ ভেতরের আগুনটা উসকে দিচ্ছে।
তখনই কেউ যেন বলল, হে যুবতী আমি এখানে।
–তুমি কোথায়।
—আমি এখন রেলে চলে যাচ্ছি।
–আমাকে নিয়ে যাবে না।
—তোমাকে সবাই নিয়ে যেতে চায়। আমিও চাই।
–তবে নাও না। আর ভালো লাগছে না।
তবে চলে এস না। রেলগাড়ি ঝিক ঝিক-গ্রাম মাঠ পার হয়ে চলে যাচ্ছে। কোথাও সবুজ দিগন্ত, কোথাও শুধু আকাশ, কোথাও নক্ষত্রের বর্ণমালা রেলগাড়ি ঝিক ঝিক
—সে এর সে। দুজন সে। মুখোমুখি। মুখোমুখি বসে বসে কত কথা।
–আমার আজকাল মরে যেতে ইচ্ছে করে।
–কেন, কেন।
–জানি না যাও।
-তুমি মরে গেলে আমিও মরে যাব।
–এই।
–কী।
—আমার পাশে এসে বোস না। সুন্দরমতো যুবকটি শ্রাবণীর পাশে বসে গেল।
—শরীরে তোমার সুন্দর গন্ধ।
–তোমারও।
–আমি একটু ঘ্রাণ নেব? সুন্দরমতো যুবকটি বলল।
-না।
–কেন না?
–লজ্জা করে।
–এই যে বললে দরজা বন্ধ করে দিতে। রেলগাড়ি ঝিক ঝিক।
–এমনি বললাম।
–আর রেলগাড়িতে বেড়াতে যাওয়া কেন।
-দেশ দেখব। ঘুরে বেড়াব। গাছের ছায়ায় দু-জনে বসব। কোন নদীর পাড়ে বসে থাকব। হা হা করে বাতাস ছুটে আসবে। চুল উড়বে দু-জনার।
-আর কিছু করার ইচ্ছে নেই তবে?
–আছে।
—সেটা কী?
–সোনালী যব গমের খেতে ঢুকে যাব। দু-জনে। তারপর টুপ করে ডুব দেব। কেউ দেখবে না।
