একদিন সুনন্দা হাউহাউ করে চিৎকার করছিল, তোমার কী হয়েছে! স্থির হয়ে বসে আছ, নিশ্বাস বন্ধ করে—এই কী করছ, তুমি কি আমাকে মেরে ফেলবে। এভাবে শ্বাসবন্ধ করে কেউ বসে থাকে!
দেখছি।
কী দেখছ?
মানে দেখছি।
মানে। মানে তোমার বের করছি। সঙ্গে সঙ্গে পুত্র-কন্যাদের ফোন করতে গেলে তিনি হেসে ওঠেন। আরে যোগাভ্যাস করছি।
যোগ্যভ্যাস।
হ্যাঁ, যোগাভ্যাস বোঝ। মৃত্যুকে বোকা বানাতে চাই।
সুনন্দা কেঁদে ফেলে।–তুমি পাগল হয়ে যাচ্ছ।
ধুস! প্রিয়তোষ তাড়াতাড়ি আয়নার সামনে থেকে সরে যান। এই আয়নার সামনে মেনকা সেজেছে, সুনন্দা সেজেছে। পুত্র পুত্রবধূরা, নাতি নাতনিরাও। তারা উড়ে যাবার পর, আয়নাটার কাজও যেন ফুরিয়ে গেছে। আয়নার সামনে এখন তিনি নতুন সাজে দাঁড়িয়ে থাকতে চান। আয়নায় তো আর কেউ মুখ দেখে না। আয়নাটাই বা কী ভাবে?
রাস্তায় বের হলেও, তাঁর সমবয়সিদের সঙ্গে দেখা হয়।
কী খবর দাদা?
তুমি কেমন আছ প্রিয়তোষ বল।
ভালো, খুব ভালো।
আমি তো তোমার মতো ভাল নেই।
শরীর গোলমাল করছে?
করলে তো বাঁচা যেত।
তবে! আপনার পুত্র-পুত্রবধূ তো সঙ্গেই থাকে। নাতি-নাতনিরাও। খুব জমিয়ে আছেন। বাজার করছেন, নাতিকে স্কুলে দিয়ে আসছেন, বংশাবলি ঠিক রাখার জন্য সব দায়ই পালন করছেন।
প্রিয়তোষের সামনে গলা নীচু করে বললেন, শান্তিরক্ষা করছি। ঘাড় ধাক্কা দিয়ে বের করে দিলে এ বয়সে যাবটা কোথায়।
কেন, আপনার বউমা তো দেখলেই বলবে, কাকা ভালো আছেন! কী মিষ্টি কথাবার্তা। আপনার কথাও খুব বলে।
প্রিয়তোষের সময়বয়সি মানুষটি হাসলেন। তারপর আরও গলা নামিয়ে বললেন, পাহারাদার। এত কষ্টের বাড়ি, পুত্র কৃতী, পুত্রবধু কৃতী, আমি ভাই গোলাম।
গোলাম ভাবলেই গোলাম। বংশাবলি ঠিকঠাক রেখে যেতে হলে এটা শেষ বয়সের বোনাস ভেবে নিন দাদা।
তিনি কেমন বিরস বদনে বললেন, তোমার বউদি গত হয়েছেন। এখন বাড়িতে সারাদিনই একা। কে কী খাবে সবই ঠিক রাখতে হয়। নাতিরাও অর্ডার করবে, আমার যে কি খারাপ লাগে প্রিয়তোষ! খাওয়ার টেবিলে কেউ থাকে না। থালা বাটিতে সব পড়ে থাকে খেলে খাও, না খেলে ফেলে দাও।
বউমা কী করে?
টিভি দেখে।
খাই, আর চোখের জল ফেলি। কোথায় এসে উঠলাম প্রিয়তোষ। তুমি তো ভালোই আছ দেখছি প্রিয়তোষ।
যোগাভ্যাসের ফল।
বউমা কেমন আছে?
ওর শরীরটা জুতের নেই দাদা। ওকে বলেছিলাম, যোগাভ্যাস করতে। আমাকে দাদা তেড়ে এল। বলে কি না তুমি পাগল হয়ে যাচ্ছ।
প্রিয়তোষ বুঝতে পারেন এই বয়সটাই খারাপ। কিছু করার থাকে না। তবু সুনন্দা আছে বলে, তিনি সারারাত তন্দ্রার মতো বিছানায় পড়ে থাকতে পারেন। সুনন্দাকে নিয়ে ব্যস্ত থাকতে হয়। হাতের এই কাজটা এখনও আছে বলে তিনি একেবারে একা হয়ে যাননি।
সুনন্দা অসুখে ভুগে ভুগে খিটখিটে স্বভাবের হয়ে গেছে। সুনন্দার জরাব্যাধির জন্য তিনিই যেন দায়ী। সারাজীবন আঠার মতো লেগে থাকা, আর এখন আঠা আলগা হয়ে যেতেই যত নষ্টের মূলে নাকি তিনি।
পুত্রকন্যাদের দোষ দিয়েই বা কী লাভ!
এই যে একা হয়ে যাওয়া, কারও সময়ই হয় না একবার উঁকি দিয়ে দেখার, তারাও যে অসহায়, সারাদিন কাজের মধ্যে লড়ালড়ি চলছে, তাদেরও যে চাই বংশাবলি, কেউ সঁতার শিখছে, কেউ গান, কেউ নাচ, স্কুলের পড়াশোনার চাপও তো কম না—একেবারে ল্যাজেগোবরে অবস্থা, তাদের উঁকি দিয়ে দেখার সময় নাই থাকতে পারে। এই উঁকি দিয়ে না দেখার ক্লেশ সুনন্দার থাকতেই পারে! পুত্রদের মানুষ করতে গিয়ে তারও কম হ্যাপা পোহাতে হয়নি—তিনি বোঝেন। কাজের লোকেরা তো খটাখটি লাগিয়ে দিয়ে মজা দেখত। এখন তারাই বাড়িটায় প্রায় চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত করে ফেলেছে। নিজের মানুষ দূরে সরে গেছে, দূরের মানুষ কাছে এসে গেছে। মেনকা চলে না গেলে, সেও তার মাসির জন্য প্রাণপাত করতে পারত—এসব ভাবলেই তিনি শুনতে পান।
এমন মেরুদণ্ডহীন লোক আমি আর কোথাও দেখিনি বাপু। কাউকে কিছু বলবে না।
তিনি খাটে চোখ বুজে পড়ে যাচ্ছেন।
সারাদিন, সুনন্দার অভিযোগ।
সংসার অসার তোমার জন্য। এমনিতেই অনিদ্রায় ভোগেন, তারপর সুনন্দার অভিযোগ শুনলে, ঘুম আর। আসেই না।
এই যে মেনকা রাস্তায় মেরে হয়ে গেল। এবার দেখা হল, বলবে তো, তোর মাসিমা তোকে যেতে বলেছে। মেয়েটা আমাকে কি ভালোবাসত।
তিনি শুয়েই আছেন।
তোমার আয়া ফ্লাক্সে একটু গরম জল পর্যন্ত রেখে যায়নি। কতক্ষণে যাবে।
তিনি শোনেন, তারপর উঠে নীচ থেকে গ্যাস জ্বালিয়ে গরম জল করে আনেন।
ফের, চোখ লেগে আসে। তন্দ্রায় আচ্ছন্ন হন।
আরে ঘুমোচ্ছে নাকি! রাতের ওষুধ কোথায়?
ফের আরে ঘুমোচ্ছে নাকি, মশা ঢুকে গেছে মশারিতে।
এই করে তাঁর তন্দ্রা লেগে আসে। আবার ভেঙেও যায়।
শেষে তিনি চোখ বুজে ব্যালকনির খাটে পড়ে থাকেন, আর ভাবেন—এত কষ্টের সংসার, সব ফাঁকা–শেষে সত্যি তিনিও যে কোথায় এসে উঠলেন। যোগাভ্যাস ফের শুরু করবেন নাকি। যোগাভ্যাসে শরীর এবং মনের উন্নতি হয়।
সুনন্দার মশারি খুলে, মশারি ফের টানিয়ে বারান্দা অন্ধকার করে যোগাভ্যাস শুরু করে দিলেন। সেই পালতোলা নৌকার মতো মায়ের মৃত্যুদৃশ্য ভেসে যাচ্ছে। অশেষ যন্ত্রণায় অস্থির। ঘোরের মধ্যে থাকা মানুষ হাওয়ায় যেন ভেসে যাচ্ছে। সাদা চাদরে মুখ ঢাকা–দূরে অনেক দূরে চলে যাচ্ছে সেই দৃশ্য। এক দুই পাঁচ সাত এবং এভাবে যোগাভ্যাস শুরু করলে সেই কষ্ট এবং যা নিদারুণ এবং অশেষ। দমবন্ধ করে বসে থাকা, অর্থাৎ মৃত্যুর সময় শ্বাস খাটো হয়ে আসে, মগজের আলো নির্বাপিত হয়। হৃদযন্ত্রটিও বিকল হয়ে যায়, মৃত্যুর এইসব আবদার রক্ষা করা যে কত বড়ো কঠিন, যোগাভ্যাসে টের পান।
