সুনন্দাও অসুস্থ সেই কবে থেকে। অসুস্থ বলে পাঁচ-সাত বছর একসঙ্গে শোওয়াও হয় না। বাড়ির দোতলার বারান্দা কাচ দিয়ে মুড়ে নিয়েছেন। সেখানেই তিন বাই ছয় একটি খাট পাতা। পরদা ঝুলিয়ে আলাদা শোওয়ার ব্যবস্থা করে সেখানেই রাত যাপনের ক্লান্তি দূর করতে হয়।
বারান্দার ঠিক মুখের ঘরটায় সুনন্দা শোয়। দরজা খোলা থাকে। জিরো পাওয়ারের আলো জ্বেলে রাখা হয়। সুনন্দার মাঝে শ্বাসকষ্ট প্রবল হলে, পুত্ররা, পুত্রবধূরা আসে, বাড়িটা আবার ভরে যায়—এবং এভাবে নার্সিংহোমে অথবা বছরে দু-বছরে একবার হাসপাতালেও রেখে আসতে হয়।
এই করে দিন যত যায় তত প্রিয়তোষ একা হয়ে যান। তাঁর কিছু আর ভালো লাগে না। সুনন্দার হতাশ মুখ এত কাতর করে রাখে, তাঁর মনে হয় তিনি নিজেও কখনো অসুস্থ হয়ে পড়তে পারেন। তখনই কেন জানি মায়ের মৃত্যুযন্ত্রণার ছবিটা পর্দার মতো ভেসে ওঠে। সুনন্দার বেশি বাড়াবাড়ি হলে আয়াও রাখা হয়।
বাড়িটা তাঁর বড়ো, বেশ বড়ো। তিনতলা বাড়িটা দুই পুত্র এবং সুনন্দার থাকার জন্য নিজে তদারকি করে নির্মাণ করেছিলেন। সেগুন কাঠের দরজা জানলা। দোতলার ঘরগুলিতে, এমনকী তিনতলার ঘরগুলিতে পাথরও বসিয়েছিলন। বাবার তখন বড়ো আক্ষেপ, প্রিয়তোষ বাড়িটা করলে, দেশের বাড়িতে করলে কি ক্ষতি হত! সুনন্দা নারাজ। এমন গজাগায় মানুষ থাকে! তুমি কী খেপেছ! আমার ছেলেমেয়েরা ওখানে থাকতেই পারবে না। আর দশরথের পুত্র সেজে বাহবা না নিলেও চলবে। অনেক তো করেছ।
বছর ছয় হয়ে গেল, বাড়ির বাইরে স্নোসেম, ভিতরে ডিসটেম্পার— তারপর ধীরে ধীরে তিনি কী করে যে বাড়িটার কথাও যেন ভুলে গেছেন। এই বাড়ির প্রতিটি ইটকাঠের সঙ্গে তাঁর রক্তের সম্পর্ক। সুনন্দা অসুস্থ হয়ে যাওয়ার পর ধীরে ধীরে সব কেমন তাঁর অর্থহীন হয়ে গেল। একতলার ঘরগুলি কোনোটা বসার, কোনওটা ডাইনিং স্পেস হিসেবে ব্যবহার করা হয়, দোতলার ঘরগুলি এখন ফাঁকা, তিনতলার ঘরগুলিও। পুত্ররা, পুত্রবধূরা থাকত, নাতি-নাতনিরা থাকত এখনও এলে থাকে, তারা কিছুই নিয়ে যায়নি। খাট, আলমারি, বুক সেলফ, টিভি সবই পড়ে আছে। বছরে ছুটিছাটায় আসতেই হয়, তখন সবই ঠিকঠাক না থাকলে তারা শোবে কোথায়, থাকবে কোথায়। ওরা যে আসে ওতেই খুশি প্রিয়তোষ। খোঁজখবর যথেষ্টই নেয়। প্রিয়তোষের কাজ ঠিকা মেয়েটা এলে পরিত্যক্ত ঘরগুলির দরজা খুলে দেওয়া, ঘর মোছার কাজ হয়ে গেলে ফের দরজা বন্ধ করে দেওয়া। পুত্ররা, পুত্রবধূরা এলে বিন্দুমাত্র অসুবিধা না হয় তিনি সেজন্য প্রায় সব সময় তটস্থ হয়ে থাকেন। বড়ো কন্যা সহ দুই পুত্র, দুই বউমা। নাতি-নাতনি গোনাগুনতি। তখন কাজের লোকই বেশি। কাজের লোকরা সকাল থেকে ব্যস্ত। তাদেরও থাকা-খাওয়া তখন এ বাড়িতে।
পুত্রদের যার যার আলাদা ঘর-দোতলা তিনতলার সব ঘরই সুনন্দা তাদের দিয়ে দিয়েছেন। এইসব করে যখন একটা ঘর এবং সামনের ব্যালকনি সম্বল করে সুনন্দার সঙ্গে প্রিয়তোষের দিন কাটছিল, তখনই অসুখটার ছোটোখাটো উপসর্গ দেখা দিতে থাকল। তিনি পাশ ফিরলে সুনন্দার ঘুম ভেঙে যায়, ঘরে হাঁটাহাঁটি করলে সুনন্দার ঘুম ভেঙে যায়। অসুস্থ মানুষের অনিদ্রা হলে আরও খিচখিচে স্বভাব হয়ে যাওয়া স্বাভাবিক। আবার মশার উৎপাত থাকায় রাতে মশারি তুলে বের হলে, মশা ঢুকলে তখন আর এক অশান্তি। আলো জ্বানিয়েও মশাটাকে খুঁজে পাওয়া যায় না। তারপর যা হয় কুপিত হয়ে পড়েন সুনন্দা। তাঁর আসকারাতেই পুত্ররা এত স্বাধীন, বউমারা খুশিমতো আসে থাকে, চলেও যায়, তিনি কিছু বলেন না, এমন ম্যাদামারা মানুষের এমনই পরিণতি হবে, বেশি কি! এসব কারণেই এই বারান্দায় শেষে তিনি তাঁর শেষ নির্বাসনে এসেছেন। অন্য ঘরে থাকাও যায় না। রাতে কখন শ্বাসকষ্ট শুরু হবে ঘুমের মধ্যে, শ্বাসকষ্ট আর কাশি, কাছাকাছি না থাকলে ওষুধ কিংবা পাফের ব্যাগ কে এগিয়ে দেয়।
সুনন্দার কাছ থেকে সরে এসেছেন ঠিক, তবে ঘুম হয় না।
এই বুঝি কাশি শুরু হল।
এই বুঝি টান উঠে গেল। যথাসময়ে সব হাতের কাছে দিলে একেবারে নিরাময়। ইচ্ছে করলেই প্রিয়তোষ আলাদা ঘরে শুতে পারেন না।
পুত্ররা সবাই কৃতী। বউমাদেরও ভালো উপার্জন। এসব সত্ত্বেও তাঁর কেন যে মনে হত বাড়ির বাইরে কেউ চলে গেলে বাড়িটা তার আরও খালি হয়ে যাবে। সুনন্দা যথেষ্ট চেষ্টা করেছেন, তিনিও। কাউকে আটকাতে পারেননি। মেনকাকেও না।
সুনন্দা আর তিনি সংসার তৈরি করেছেন ঠিক-বংশাবলিও, সবাইকে নিয়ে জড়িয়েও ছিলেন এবং সবার গতি হয়ে গেলে, তাঁর কেন যে মনে হয় রাস্তা হারিয়ে ফেলেছেন। মায়ের মৃত্যুদৃশ্যও তাঁকে তাড়া করে, এত কিছু করা, ফুল ফোঁটানো, বাগান আগলে রাখা, গোরু বাছুর ঢুকে না যায়, সতর্ক পাহারা—শেষে যে কী হয়, বাগানের এক কোনার মালির ঘরটিতে তিনি যেন বসে আছেন। সবাইকে তাঁর অপরিচিত মনে হয়, কোনো বীজ বপনের সাক্ষ্য নেই, সবই যেন নিজস্ব গতিতে মাথা তুলে দাঁড়িয়েছে।
মাঝে মাঝে মায়ের মৃত্যুদৃশ্য তাড়া করলে, তিনি দম বন্ধ করে বোঝার চেষ্টা করেন, কতটা মৃত্যুকষ্ট। শ্বাস বন্ধ করে একবার আয়নার সামনে বসেছিলেন, চোখ যে ফেটে বের হয়ে আসছে। সঙ্গে সঙ্গে শ্বাস ছেড়ে দিলে, কী আরাম, বেঁচে থাকার আনন্দ টের পান। আজকাল এই খেলাটাও তার জমে উঠেছে। এই আছি, এই নেই। সেকেন্ড মিনিটের তফাত। বেঁচে থাকতে হলে একটা কিছু তো চাই।
