এভাবে এক রাতে সম্ভবত কৃষ্ণপক্ষই হবে, শেষ রাতে পুবের আকাশে কৃষ্ণপক্ষের চাঁদ দেখতে পেলেন তিনি। ভাঙা চাঁদ, নীল আকাশ, কখনো মেঘের ওড়াউড়ি, আর অজস্র নক্ষত্রের ভিতর চাঁদ, ভাঙা চাঁদ টুকরো হয়ে গেছে, কিংবা ক্ষয় পেতে পেতে অমাবস্যার অন্ধকারে তাঁর জানলায় উঁকি দিয়ে গেল–
কি হে প্রিয়তোষ যোগাভ্যাসে বসেছ।
আজ্ঞে না, শুয়ে আছি।
মিছে কথা বলছ, পদ্মাসনে বসে আছ, আর বলছ কি না শুয়ে আছ? তোমার কি সত্যি মাথা খারাপ হয়ে গেল?
কী করব, ঘুম আসে না, গোপনে যোগাভ্যাস, কেউ দেখে ফেললেই হা হা করে ছুটে আসে। ভোররাতের দিকটা সুবিধা, কেউ জেগে থাকে না। জোরে কথা বলে না। সুনন্দার ঘুম ভেঙে যাবে। তিনি টের পেলে আমার মাথা চিবিয়ে খাবেন। তাকে ফেলে পালিয়ে যাওয়ার সাহস হয় কী করে? তোমার আর গোয়েন্দাগিরি না করলেও চলবে চাঁদু।
দম বন্ধ অবস্থায় বেশি কথা বলা যায় না। কতক্ষণ আর নিশ্বাস আটকে রাখা যায়! মৃত্যুকষ্টকে সহজ করে নেবার এই প্রক্রিয়াটুকু পর্যন্ত ধরা পড়ে গেলে তাঁর রাগ হয়। ভোস করে নাকে মুখে শ্বাস বের হয়ে এলে তিনি টের পান খুবই ঘেমে গেছেন।
তবু যেন কত দিনের সখা, সেই শৈশব থেকে ক্ষয়ে যাওয়া চাঁদেরই বা দোষ কি?
বলল, কেমন আছ প্রিয়তোষ?
ভালো না। তোমার মতোই পরিণতি।
সেই ক্ষয়ে যাওয়া চাঁদের সঙ্গে কথাবার্তা শুরু হলে যা হয়, ফের প্রিয়তোষ বললেন, আর তো মেরে কেটে পাঁচ-দশ বছর। পূর্বপ্রস্তুতি বলতে পার।
পাঁচ-দশ বছর ভাবছ কেন প্রিয়তোষ? আজ এই মুহূর্তে যদি হয়।
প্রিয়তোষ বললেন, না না সে হবে কেন?
চাঁদের মুখে অস্তমেদুর হাসি।
কেউ যেতে চায় না হে প্রিয়তোষ—যতই ঘুম হোক না হোক বিছানায় পড়ে থাকতে ইচ্ছে হয়। তোমার বয়সে কেউ আর ভালো থাকে না। তোমার ভরা কোটাল শেষ। জীবনের শেষ কোটালের জন্য অপেক্ষা করছ—অথচ যেতে ইচ্ছে হয় না, আবার যোগাভ্যাসেও বসতে ইচ্ছে হয়। আরে এই এই করছ কি, আবার নিশ্বাস বন্ধ করে মেরুদণ্ড সোজা করে নিশ্বাস আটকে রেখেছ! তুমি কি সত্যি মরতে চাও। আরে, ইস প্রিয়তোষ প্রিয়তোষ।
আমাকে ডাকছ!
হ্যাঁ ডাকছি শুনতে পাও না।
তারপরই এই হালকা মেঘে ছেয়ে গেল আকাশ। সামনের বাড়িঘর হাইরাইজ দালানকোঠা কোনো এক স্বপ্নবৎ দৃশ্য তৈরি করে ফেলে। শ্বাসপ্রশ্বাসের স্বাভাবিক ক্রিয়ায় শরীর সতেজ হয়ে যায়। আরাম। ভারি আরাম—বেঁচে থাকায় অনন্ত ইচ্ছেরাও প্রবল ঝাঁকুনি দেয়। গাছপালায় জোনাকি ওড়ে। কুকুরের ডাক শুনতে পান, দূরে রেলের ঝুমঝুম শব্দ ভেসে আসে। তিনি কেমন হাবাগোবার মতো বিছানায় চুপচাপ বসে থাকেন। আকাশ এবং এই ব্যাপ্ত চরাচরের মুগ্ধতা তখনও শেষ হয়ে যায়নি তবে।
রাজার টুপি – অতীন বন্দ্যোপাধ্যায়
জলের মতো রঙ ছিল সেদিন আকাশের। সুরমা বিছানায় শুয়েছিল। সুরমা রুগ্ন। বাবুল বারান্দায় রেলগাড়ি চালাচ্ছিল। সতীশ রথের মেলা থেকে বাবুলকে রথ কিনে না দিয়ে রেলগাড়ি কিনে দিয়েছিল। রেলগাড়ির চাকায় সামান্য শব্দ হচ্ছিল; পাখি ডাকছিল আকাশে। ভোরের সূর্য উঠে আসছে। জানলায় পাতাবাহারের গাছ। গাছে লাল, নীল, হলুদ পাতা। বৃষ্টি হয়ে যাওয়ায় পাতার উপরে পরিচ্ছন্ন ভাব : সতেজ এবং স্নিগ্ধ। বাবুল গাড়ি চালাতে চালাতে ডাকল, বাবা আমার গাড়িটা চলছে না।
সতীশ গাড়িটাতে দড়ি বাঁধা দেখল। গাড়ির চাকা ঘুরছে না বলে বাবুল দড়ি ধরে টানছে এবং চালাবার চেষ্টা করছে। সতীশ নুয়ে গাড়িটা উল্টে দিল। আর পিন লাগালে গাড়ির চাকা আবার ঘুরতে থাকল। বাবুল রেলগাড়িটা টানতে টানতে দেয়ালে বোধহয় পাখি দেখল, বোধহয় পাখি উড়ে গেলে দেয়ালে সে নিজের ছায়া দেখে থেমে গেল এবং কেমন ভয় পেয়ে বলল, বাবা তুমি আমার পাশে বসবে।
বুঝতে না পেরে সতীশ বাবুলের মুখের দিকে তাকিয়ে থাকল কিছুক্ষণ। বড় চোখ বাবুলের। হাসলে গালে টোল পড়ে। কালো রঙ। মুখের ভিতর চোখ দুটোই সার। ছোট করে ছাঁটা চুল এবং মুখশ্রীতে কেমন যেন যাদু আছে। যেন দূরের কোনো মাঠে বৃষ্টিপাতের পর সামান্য জ্যোৎস্না-জ্যোৎস্নায় ছোট্ট শিশু দু’হাত তুলে ছুটছে। সতীশ মুখের কাছে মুখ নিয়ে বলল, কি বললে?
বাবুল এবার গাড়িটা বগলে নিয়ে সতীশের সামনে সোজা হয়ে দাঁড়াল। বলল, এখানে তুমি আমি বসব। বলে সে এনজিনের দিকটাতে স্থান নির্দিষ্ট করলে সতীশ বলল, মা কোথায় বসবে? কথা শুনে বাবুল একটু দ্বিধায় পড়ে গেল। মা পাশে না বাবা পাশে? কে পাশে বসবে সে এ-মুহূর্তে কিছুই স্থির করতে পারল না। ওর চোখে মুখে ক্লিষ্ট এক ভাব ফুটে উঠছে। সুতরাং সতীশ বলল, তুমি যেখানে বসবে আমরা সেখানেই বসব। তোমার গাড়িতে কে কোথায় যাবে তুমিই ঠিক করবে। বাবুল এবার গাড়িটা ফেলে মায়ের কাছে ছুটে গেল। সুরমা এখন ঘুম থেকে ওঠেনি। ওর দেরি করে ওঠার অভ্যাস। ঝি আসবে এসে সব হাতের কাছে এনে দিলে সে রান্না করবে। ওর পেটে কী যেন কষ্ট সব সময়। সামান্য অপারেশনের দরকার। এবং অপারেশন হলেই সুরমা মরে যাবে এমন একটা ভয় তার। বাবুল বিছানার পাশে আসতেই সুরমা মাথায় হাত রাখল। বলল, ভোরবেলা গাড়ি নিয়ে খেলতে নেই। এখন পড়তে বোস। এমন কথায় বাবুল বিষণ্ণ হয়ে গেল। সতীশের দিকে না তাকিয়েই বলল, বাবা তুমি আমার পাশে বসবে। মা দিদি পিছনে বসবে। ভোর হলে সূর্য আপন মহিমায় যেমন আকাশে উঠে আসে, এই বাবুল, ছোট্ট বাবুল সেইরকম দাপাদাপি করে এই সংসার ভরে তুলছিল। পড়ার কথায় সে বিষণ্ণ হয়ে গেল।
