দরজার কাছ থেকে আবার ফিরে এলেন, এই মেনকা! সাড়া নেই।
আবার ডাকলেন।
হঠাৎ দরজার আড়াল থেকে মুখ বার করে বলেছিল, ডাকছ কেন?
বইখাতা আন।
সে খুবই বাধ্য মেয়ের মতো ছুটে বইখাতা নিয়ে এসেছিল। কতকালের যেন যুগ্ম চেষ্টায়, কোনো রকমে বাংলা পড়তে পারে। লিখতে পারে। যোগ বিয়োগ করতে পারে। ইংরেজি এক বর্ণ শেখানো যায়নি। হাই ওঠে তার।
হাই তুলছিস!
কী করব হাই উঠলে বল!
নে, এই টাস্ক থাকল। দশটা যোগ, দশটা বিয়োগ অঙ্ক থাকল। বিকেলে ঘুম থেকে উঠেই পড়তে বসবি। তারপর মাসিকে দেখাবি?
আমি যাত্রা দেখতে যাব না?
না। যাবি না।
মেয়েটা আজকাল তার পছন্দমতো কাজ না হলে অবাধ্য হয় প্রিয়তোষ জানেন। আর পড়ার ব্যাপারে তো তার সাত খুন মাপ। তিনি বললেন, বাড়ির বার হবি তো হাত-পা বেঁধে ফেলে রাখব। ভেবেছিস কি। অফিস যাওয়ার সময় সুনন্দাকেও সতর্ক করে দিয়ে গেলেন।
সুনন্দা ডাকছেন, এই মেনকা তোর হল?
মেনকা অন্য ঘরে পড়ছে। হাতের লেখা লিখছে, যোগ-বিয়োগ করছে! তেনারও হয়েছে, পড়তেই চায় না, তাকে রাজ্যের যোগ-বিয়োগ দিয়ে গেছে। দেরি তো হবেই।
সুরা ফের ডাকলেন, তোর হল?
হচ্ছে মাসিমা।
সুনন্দা বুঝতে পারছিলেন এত সময় লাগার কথা না। সাঁজ লেগে যাবে। ধূপধুনো দিতে হয়। সুনন্দা তাঁর ছাত্রীদের বললেন, তোমরা জেরক্স নিয়ে যাবে, নোট লিখে জেরক্স ফেরত দিয়ে যাবে। আমি আসছি।
ঘরে চুপি দিয়ে সুনন্দার মাথায় হাত।
কীসের অঙ্ক, কীসের পড়া! মেনকা বইয়ের ওপর বসে অঙ্কের খাতায় পা রেখে আলতা পরছে পায়ে। নখে নেলপালিশ লাগানো হয়ে গেছে। পাউডার স্নো একটা বইয়ের ওপর সাজানো। ঘরে ঘরে আয়না। সে আলো জ্বেলে আয়নার সামনে সাজছে। বাবু শখ করে রুপোর চেলি করে দিয়েছিল পায়ের, তাও পরেছে। পা ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে দেখছে।
এই তোর পড়া! আসুক তোর বাবু! তুই কী করে যাত্রা দেখতে যাস দেখি। কোথাকার ভজা, সেই বেশি হয়ে গেল। বড়ো হচ্ছিস, নিজের ভালোমন্দ বুঝবি না?
কোথায় বড়ো হলাম! তোমাদের যে কী অলুক্ষুণে কথা বাপু!
মেয়েটার সঙ্গে কথায় পারা মুসকিল। ছাত্রীরা চলে গেলে নীচের দরজার তালা লাগিয়ে দিলেন। তিনি মেনকার সঙ্গে আর একটা কথা বললেন না। মেনকা তার নিজের ঘরে থম মেরে বসে আছে। তারপর চিৎকার, আমি যাব না, কোথাও যাব। আমার কোনো ইচ্ছে থাকতে নেই। কেবল দাসী-বাঁদির মতো খেটে মরব। তোমরা পেয়েছ কি। আর তারপরই সিঁড়িতে পায়ের শব্দ পেলেন, কোথায় যাচ্ছে! সুনন্দা দ্রুত নীচে নেমে অবাক। নতুন ফ্রক গা থেকে খুলে পুরোনো ফ্রক গায়ে একটা মাদুরে শুয়ে আছে। ঠোঁটের লিপস্টিক ঘষে তুলতে গিয়ে সারা মুখ তার লাল-নীল চিত্র-বিচিত্র হয়ে আছে। মাদুরে শুয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদছে।
প্রিয়তোষের ফিরতে বেশ রাত হয়। কাগজের অফিস। কোন খবর যাবে, কোন খবর যাবে না, মোটামুটি কাগজের লে-আউট সেরে বাড়ি ফিরতে রাত বারোটা বেজে যায়। কলাপসিবল গেটের তালার ডুপ্লিকেট চাবি থাকে তাঁর কাছে। বাইরে থেকে তিনি নিজেই খুলে ভেতরে ঢোকেন। আর তখনই প্রিয়তোষের মাথা খারাপ। গেট খোলা। এত রাতে গেট খোলা! যাত্রা ভাঙতে রাত দুটো, মেয়েটা কি সত্যি যাত্রার নাম করে ভজার সঙ্গে পালাল। এতটুকুন মেয়ের শরীরে গরম ধরে গেছে।
সেই অন্ধকার আবছা মতো জায়গা থেকে মেনকা একটু এগিয়ে এল, বাবু আমায় বড়ো ছেলে। প্রণাম কর। কিশোর ছেলেটি তাকে প্রণাম করলে তিনি বললেন, তুই কোথায় থাকিস?
আমার দু-ছেলে বাবু। ছেলেরা মাসির কাছেই থাকে। আমি টাকা পাঠাই।
কেন তোর বর কিছু করে না!
কিছুই বলল না মেনকা, মাথা নীচু করে রাখল।
কোথায় থাকিস, কী কাজ করিস।
দরিয়াগঞ্জে আছি বাবু।
প্রিয়তোষ আর একটা কথা বলতে পারলেন না। হন হন করে হাঁটার চেষ্টা করলেন, তিনি মেনকার কাছ থেকে সত্যি যেন নিষ্কৃতি চাইছেন। দরিয়াগ তো খুবই খারাপ জায়গা। নরম একটা শরীরে গরম ধরে গেলে এই হয়—শেষে তুই পতিতালয়ে।
৩.
প্রিয়তোষের আরও বয়স বাড়ে। মেনকাকে দেখার পর তাঁর বয়স যেন এক লাফে অনেকটা বেড়ে গেল। সেই মৃত্যুর দিকে ধাবমান সবাই। ঘর সংসার প্রিয়জন—এবং ধাবমান অশ্বের মতো জীবন পরিক্রমা। এমনিতেই বয়স যত বাড়ছে তত অনিদ্রার শিকার হচ্ছেন। ঘুমের বড়ি খেলে ঘুম হয় ঠিক তবে গভীর নিদ্রা হয় না। হালকা চালের নিদ্রায় তিনি অদ্ভুত বিদঘুটে স্বপ্নও দেখেন। মেনকার খোঁজ এভাবে শেষ পর্যন্ত পাবেন, এবং যৌনতা, মানুষজন, গোরু, ভেড়া সবাইকে তাড়া করছে–সারা রাত মায়ের মৃত্যুদৃশ্যও চোখে ভেসে গেল। কখনো মায়ের মুখ, কখনো মেনকার মুখ, কখনও সুনন্দার মুখ। সবাই যেন যৌনতার ঘোরে যে যার বংশাবলি তৈরি করে যাচ্ছে।
এভাবে তাঁর দিন যায়, বছর যায় এবং এভাবে বছরের পর বছর এক নিদ্রাহীন জগতে ঢুকে যান। রাতে বিছানায় যেতেই তাঁর আজকাল কেমন আতঙ্ক হয়। দেশবাড়ির সঙ্গেও সম্পর্ক আলগা হয়ে গেছে। শুধু শৈশবের কথা মনে হলে তাঁর অন্নকষ্টের দিনগুলির কথা মনে পড়ে। বর্ষায় কিংবা বৃষ্টির দিনে টালির ঘরের বারান্দায় বসে কাঁঠাল বিচি ভাজা খাওয়ার কথা মনে পড়ে। মা তাঁর আঁচলে কাঁঠাল বিচি ভাজা নিয়ে বসে আছেন। তাঁরা ভাইবোনেরা বৃষ্টিঝরা বিকেলে মার আাঁচল থেকে খুঁটে খুঁটে তুলে নিচ্ছে ভাজা বিচি। নিখোঁজ বাবা মাঝে মাঝে আসেন, আবার চলেও যান। কাকা, জ্যাঠারাও ভালো নেই। ছিন্নমূল হলে যা হয়। অদৃষ্টের ওপর ছেড়ে দিয়ে তাঁরা অন্ন সংস্থানের অথবা বলা যায় অর্থ সংস্থানের খোঁজে বের হয়ে পড়েছেন। মেনকা যখন দু-পা ছড়িয়ে কাঁঠাল বিচি ভাজা খাওয়া কী যে মজা, এমন বলত, তখন কেন জানি মেয়েটা তাঁর নাড়ি ধরে টান দিত।
