আয়, পড়েটড়ে হাত-পা যে ভাঙবে! বইখাতার কথা বললেই কোথায় যে গা ঢাকা দেয়। ডাক! আর ডাক।
তাকে তখন খুঁজেই পাওয়া যেত না।
সুনন্দা বাড়ি নেই, সকালে তাঁর স্কুল। তাঁর নিজের কাজ কাগজের অফিসে। দুটোয় বের হতে হয়, সুনন্দা স্কুল করে বারোটার মধ্যে ফিরে আসে। সুনন্দা বাড়ি এলেই মেয়েটার উৎপাত তত থাকত না। কিন্তু বই-খাতার কথা বললে, সুনন্দার কাছেও পালিয়ে বেড়াত।
আর সবই ভালো, কেবল পড়ার কথা বললে নানা উৎপাত। এসে বসবে ঠিক, তারপর রাজ্যের গল্প, জানো বাবু আমার বাবা তো মাহিন্দারের কাজ করত। আমার মা দশবাড়ি খেটে খেত। আমাদের একটা টালির ঘর ছিল জানো! বৃষ্টি হলে, উঠোন জলে ভেসে যেত। মা আমি বারান্দায় বসে বৃষ্টি দেখতাম। মা আমি বারান্দায় বসে কাঁঠাল বিচি ভাজা খেতাম। বৃষ্টি ভিজে মাঠে বাপের ভাত দিয়ে আসতাম। বড়ই সুদিন ছিল গো বাবু। প্রিয়তোষ ধমক দিতেন, পড় অ আ। পড় ক খ। খাতায় রুল টেনে নে।
তখনই একদিন মেনকা বলে ফেলল, তুমি বাবু ভালো না।
বলে কি পুচকে মেয়েটা। এত সাহস! তার পরই মনে হয় ছেলেমানুষ, ছেলেমানুষ ভাবলেই রাগ কম হয়ে যায় প্রিয়তোষের।
আমি ভালো না?
না।
কেন! আমার মুখে কী দেখ বল তো? আমার লজ্জা হয়।
ওরে বাপ রে, তোর এত পাকা কথা। আমি তোকে দেখি—আমার কেন যে তখন নিজের ছেলেবেলার কথা মনে হয়। আমিও যে তোর মতো ছোটো ছিলাম। আমি তাকালে তোর লজ্জা হবে কেন?
হবে না! তুমি পুরুষ মানুষ না!
প্রিয়তোষ আচ্ছা বিপাকে পড়ে গেলেন।–ঠিক আছে তাকাব না। রুল টেনে অ আ ক খ লেখ।
বাবু!
আবার বাবু! রুল টান বলছি।
আমাকে বাবু আলতা কিনে দেবে?
সে দেব। একদম আর কথা না।
প্রিয়তোষ সকালবেলাটায় সব কাগজগুলি খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখেন। সকালবেলায় এটাই তাঁর বড়ো কাজ। কোনো খবর মিস করলেন কি না, খবর মিস করলে কীভাবে খাওয়ানো যাবে খবরটা, এমন নানা চিন্তা তো থাকেই, আর পায়ের কাছে দু-পা ছড়িয়ে মেনকা, সে তার নখ দেখে, পা দেখে, সামনেই বড়ো আয়না, নিজের মুখ দেখে।
আমায় নেলপালিশ কিনে দেবে বাবু?
দেব। পড়ার সময় তোর নেলপালিশের কথা মনে হল!
কী করব মনে হলে, দত্তবাবুর মেয়ে জানো, রোজ নখে নেলপালিশ লাগায়, কী সুন্দর লাগে দেখতে।
আচ্ছা ফ্যাসাদ, তোর নেলপালিশ চাই, আলতা চাই, সেফটিপিন চাই, মাথার প্রজাপতি ক্লিপ চাই, মাসিকে বলতে পারিস না? পড়ার সময় তোর যত আবদার।
মাসিকে বলব কেন? মাসি দেবে কেন! তুমি এনে দেবে। তুমি না আনলে নেলপালিশে কোনো মজা থাকে না। আমার বাবা থাকলে ঠিক কিনে দিত জানো জানো, আমাদের বাড়িতে বাবা পরি নামাতে পারত! পরি দেখতে খুব সুন্দর হয়, তাদের পাখা থাকে। যেখানে সেখানে খুসিমতো উড়ে যেতে পারে। আমার খুব উড়তে ইচ্ছে করে।
মারব এক থাপ্পড়। পড়তে বসলেই তোর দেখছি ওড়ার কথা মনে হয়।
তুমি আমাকে মারবে?
হ্যাঁ মারব।
সেদিনই সুনন্দা স্কুল থেকে ফিরলে বলেছিল, তুমি নিয়ে বসাও। আমাকে দিয়ে হবে না। এ মেয়েকে পড়ানো আমার কম নয়।
একবার ভেবেছিলেন স্নেহময়ীকে ডেকে পাঠাবেন। না হয়ে না, পড়তে বসালে ওর উড়তে ইচ্ছে করে, নিয়ে যাও, কিন্তু ওই এক ল্যাঠা, মেয়েটার ওপর কেমন মায়া পড়ে গেছে। বাড়িটায় এখন তাঁরা দুজন, মেয়েটা আসায় তিনজন, পুত্ররাও বাড়িতে এলে যাই করে, বেঁচে থাকতে মাকে তোষামোদ করে কতবার নিয়ে এসেছেন। মাসখানেক থাকলেই হাঁপিয়ে উঠত। ভাইরাও যে যার সংসার নিয়ে ব্যস্ত, অথচ তাঁর যে সবাইকে নিয়ে থাকতে ইচ্ছে হয়। এসব কারণেই, আর স্নেহময়ীকে ডেকে পাঠাননি। আছে, থাকুক, বয়স হলে একটি পাত্র দেখে বিয়েও দিয়ে দিতে পারেন তাঁর সে ক্ষমতা আছে। পুত্ররা ক্যামপাসেই চাকরি পেয়ে যাবে। কেউ আর তাঁর ওপর নির্ভরশীল নয়—এবং এসব কারণেই মেনকা তাঁর দুর্বলতা টের পেয়ে একদিন বলেই ফেলল, আমি যাত্রা দেখতে যাব।
ইদানীং যে বায়নার বহর বেড়েছে, সুনন্দাও টের পাচ্ছিলেন। প্রিয়তোষকেও হুমকি দিয়েছে, তুমি আর তার মাথাটি খাবে না। লিপস্টিক কিনে দিলে। রুপোর চেলি বানিয়ে দিলে–
বলল যে।
বললেই দিতে হবে।
তুমি সুনন্দা নিজেই তো তাকে আলতা কিনে দিয়েছ? দোকানে নিয়ে গিয়ে ফ্রক, জুতো, যখন যা চায়। চাইলেই দিতে হবে। এখন বোঝ ঠ্যালা, বলছে যাত্রা দেখতে যাবে। কার সঙ্গে যাবে তাও জানি না।
সুনন্দা এমন কথায় তেলেবেগুনে জ্বলে উঠেছিলনা যাবে না। বাবু যায় না, আমি যাই না। তেনার এখন যাত্রা দেখায় বায়না।
তোমরা যাও না বলে, আমিও যাব না, সে আবার কেমন কথা।
প্রিয়তোষ কেন যে খেপে গেছিল, পা খোঁড়া করে রেখে দেব। গিয়ে দেখ না! টিকিটের পয়সা কে দিল! কোথায় কার পায়ের তলায় চেপ্টে থাকবি, কে খুঁজবে?
ভজা।
ভজা!
ভজাকে চেন না।
প্রিয়তোষ সুনন্দার দিকে তাকাল, সুনন্দা প্রিয়তোষের দিকে। মেনকা বড় হয়ে যাচ্ছে। তবু চোখ গরম করলে ভয় পায় এখনও। প্রিয়তোষ অফিসে বের হওয়ার আগে মেনকাকে ডেকে বলে গেলেন, তুই যাবি না। বারণ করে গেলাম। মনে থাকে যেন। ভজাটা কে শুনি!
তুমি কি সবাইকে চেন? ভজা জোগানের কাজ করে! খু
বই উত্তপ্ত হয়ে যান প্রিয়তোষ। সুনন্দাকে ডেকে বললেন, তোমার ঘরে নিয়ে শোবে। এ মেয়ে সব পারে।
