তুই মেনকা না?
হ্যাঁ। আজ্ঞে …
তিনি কিছুটা থমকে গেলেন।
কতকাল পর দেখা। বয়স হয়েছে, তবু মেনকা যুবতী। তাঁর বাড়ি থেকে উধাও হয়ে যাবার পর মাঝে মাঝে বাস স্ট্যান্ডে মেনকার সঙ্গে দেখা যে না হয়েছে তা নয়, মেনকা ভিড়ের মধ্যে লুকিয়ে থাকার চেষ্টা করেছে, কোনো পুরুষ—যুবকই হবে, সঙ্গে থাকতে পারে, এই পাঁচ-সাত বছর পরে দেখা হলে যা হয়, প্রিয়তোষ ইচ্ছে করেই না দেখার ভান করে হেঁটে যেতেন, ধরা পড়ে গেলে মেনকা লজ্জায় পড়ে যেতে পারে, এমন সাত-পাঁচ ভেবেই তিনি ভিড়ের মধ্যে বলতেন না এই মেনকা, তুই এখানে দাঁড়িয়ে, এখানে কী করছিস! মেনকা বলে ডাকলেই যেন মেয়েটা অপ্রস্তুত হয়ে যাবে–
এভাবেই একদিন দেখেছিলেন, বাইকের পেছনে মেনকা, তার পুরুষ বন্ধুটি খুবই সাবলীল, মাথায় হেলমেট, প্রায় মেনকাকে উড়িয়ে নিয়ে যাচ্ছে, ভাবতেন, জীবন, জীবন রে। ছুটছে।
এভাবেই মাঝে মাঝে আরও দু-একবার দেখা গেছে তাকে, প্রিয়তোষ শেষের দিকে খুব সেজেগুঁজে তাকে বাস স্ট্যান্ডে দাঁড়িয়ে থাকতেও দেখেছেন। শ্যামলা রঙের মেয়ে, চোখে আশ্চর্য ধার, আর মুখখানি ভারি সুন্দর, প্রিয়তোষের কষ্ট হত দেখলে।
তার স্মৃতি তাঁকে পীড়া দিত। সুনন্দাকে এসে বলতেন, জানো মেনকাকে দেখলাম?
কোথায়?
কিছু বললে না?
না।
মেনকা তোমাকে কিছু বলল না?
না।
তুমি ডাকলে না কেন?
আমাকে না দেখার ভান করলে ডাকি কী করে!
ও তো ওরকমেরই। যা জ্বালিয়েছে!
কী জ্বালিয়েছে বল। ছেলেমানুষ, মা নেই, বাবা নেই, স্নেহময়ী তোমাকে দিয়ে গেল, মাসিমা আমার দশবাড়ি কাজ, এটুকুন মেয়েকে রাখবেই বা কে বলুন। আপনার কথা মনে পড়ল। এটুকুন মেয়ে হলে কী হবে খুব চালাক। মুখের কথা না খসতেই দেখবেন সব কাজ সারা।
আর প্রিয়তোষের তো সায় ছিল না। সত্যি তো সাত-আট বছরের মেয়েটা কতটা আর সংসারের কাজে আসতে পারে!
সুনন্দা বলেছিল, থাকুক না। কী সুন্দর মিষ্টি মুখখানি দেখ। দেখে তোমার মায়া হয় না!
সত্যি ভারি মিষ্টিমুখ। একখানা পুঁটুলি সম্বল করে এসে উঠেছিল।
আবছা মতো অন্ধকারে মেনকা তাঁর দিকে তাকিয়েই আছে। এই রাস্তায় কিছু পাকা বাড়ি, পাট্টা পাবার পর কেউ কেউ পাকা বাড়ি তুলেছে। বস্তি এলাকাটা খালপাড় ধরে একেবারে মহিষবাথানের কাছাকাছি চলে গেছে। অধিকাংশের জীবিকা রাজমিস্ত্রির, জোগানেরও কাজ করে কেউ। প্লাম্বার মিস্ত্রির থেকে ফুটপাথে হকারি সবই চলে। কেউ কেউ বড়ো রাস্তার নাগালে বাড়ি বলে ঝুপড়ির মধ্যেই মিঠাইমন্ডার দোকানও করেছে। চাউমিনের দোকানও আছে। এলাকার বিস্তার এত বড়ো যে কেউ কাউকে সঠিকভাবে চেনে বলেও মনে হয় না। বাড়ির কাজের মেয়েরাও এই এলাকার। স্বামী রাজমিস্ত্রি না হয় জোগানের কাজ করে। ফ্ল্যাটবাড়িরও অন্ত নেই। প্রায় সারাদিন রাস্তায়, মোড়ে, বাসস্ট্যাণ্ডে মেলার মতো ভিড়।
প্রিয়তোষ বললেন, তুই কোথায় থাকিস এখন?
মেনকা মাথা নীচু করে কী বলল, ঠিক শুনতে পেলেন না। আজকাল তিনি কানেও খাটো। মেনকা যে ভালো আছে, এটা তিনি অন্তত বুঝতে পারছেন। কপালে সিঁদুরের টিপ বড়ো করে। ওর পেছনেও কেউ যেন দাঁড়িয়ে আছে। মেনকার হাতে বালা, গলায় হার, চুলের প্রজাপতি ক্লিপ আবছা অন্ধকারেও স্পষ্ট। দামি সেন্টেরও গন্ধ পাচ্ছিলেন। যাক মেয়েটার একটা হিল্লে হয়েছে। পাঁচ-সাত বছর কেউ একই ছাদের তলায় থাকলে মায়া না পড়ে যায় না। মেনকা উধাও হয়ে গেলে প্রিয়তোষ আতান্তরেই পড়ে গেছিলেন। খোঁজাখুঁছি, থানা কিছুই বাদ দেননি।
স্নেহময়ীর এক কথা, না আসেনি। ওকে তো জানেন বাবু, দু-মাস টাকা দিলেন, ওর মাস মাইনে। আপনাকে সোজা বলে দিল, বাবু দেবেন না। আমার টাকা, আমার হাতে দেবেন। তিনি আবার মেনকাকে টাকা দিলে তার এক কথা। আমি টাকা দিয়ে কী করব! রেখে দিন, পরে নেব। আমি তো খাই পরি, দরকার পড়লে নেব। এমনও যে পাসবই করে দেবেন, একটা বাচ্চা মেয়ের পাসবই করাও যে কঠিন। মেয়েটি থাকে ভালো, খায় ভালো, এত বড়ো তিনতলা বাড়ি, ফুলের বাগান, রান্নাঘর সবই প্রায় বলতে গেলে তার হেফাজতে। প্রিয়তোষের সময় নেই, অফিস আড্ডা, সুনন্দার সময় নেই, সকালে স্কুল, টিউশান, বিকেলে রাতে বাড়িতে ঠিকা ঝি ঠিকা রান্নার লোক, তাঁর দুই পুত্র হোস্টেলে থাকে—একজন আই. আই. টি. আর একজন মেডিক্যাল কলেজে, সময়ে উদয় হয়, সময়ে আবার বিদায়ও নেয়। কন্যে বিয়ে হয়ে মার্কিন মুলুকে। সুনন্দাই স্নেহময়ীকে বলেছিলেন, দ্যাখ তো একটা মেয়ে যদি পাও, থাকবে, খাবে, ফুটফরমাস খাটবে, আমি তো একদণ্ড সময় পাই না।
আর মেনকা দু’-পাঁচদিন যেতে না যেতেই সুনন্দার ন্যাওটা হয়ে গেল। প্রিয়তোষের বসার ঘরে ও উঁকি দিতে থাকল, মিষ্টি মুখখানা দেখলে প্রিয়তোষের কী যে মনে হত, হতচ্ছাড়ি মেয়েটা এ বয়সেই সব খুইয়েছে, কাজেই আবদার করলে এটা ওটা তিনিও কিনে দেন। তাকে বইখাতাও কিনে দিয়েছেন—রোজ সকালে তাঁর কাছে এসে বসতেও বললেন, তার পরেই শুরু হল উৎপাত। ডাকলে আর সহজে সাড়া পাওয়া যায় না।
এই মেনকা, তুই কোথায়?
রান্নার মেয়েটা বলল, ডাকলে সাড়া পাবেন না বাবু। সে কি আর এখানে আছে! পাঁচিলে উঠে ঘোরাঘুরি করছে।
প্রিয়তোষ খুবই ক্ষুব্ধ হতেন।
