মৃত্যুচিন্তা
বয়সটা তাঁর বড়ো খারাপ প্রিয়তোষ বোঝেন। এই বয়সে একা থাকলেই তাঁর যত মৃত্যুচিন্তা মাথায় ঢুকে যায়।
কেবল ভাবেন আর কত দিন!
প্রশ্নটা নানাভাবে তাঁকে তাড়া করে। মৃত্যুচিন্তা তাঁকে বড়োই পীড়া দেয়। মায়ের মৃত্যুর পরই এটা তাঁর বেশি হয়েছে। মৃত্যুকষ্ট কী যে সাংঘাতিক, তাঁর মনে হত মা ঘোরে পড়ে আছেন, হুঁশ নেই, মাঝে মাঝে হাত-পা নাড়ছেন, হাত কাঁপছে, বুক প্রচণ্ড ওঠানামা করছে—মুখ লালা গড়াচ্ছে, কাউকে চিনতে পারছেন না, চোখে জল, তিনি মৃত্যুকষ্ট সহ্য করতে পারছেন না। আত্মীয়স্বজনেরও ভিড়, হঠাৎ এটা যে কী হল! ভালোই তো ছিলেন, স্বপাকে খেতেন, অসুখ-বিসুখ ছিল না, সহসা মাথা ঘুরে পড়ে গিয়ে সে যে ঘোরের মধ্যে গিয়ে ঢুকলেন—আর সাড়া নেই। স্যালাইন অক্সিজেন চলছে। নার্সিংহোমে ঢুকতে একটা ঝাউগাছের ছায়ায় প্রিয়তোষ দাঁড়িয়ে থাকেন। মা-র কষ্ট দেখতে হবে ভেবেই তাঁর আর সিঁড়ি ধরে উপরে উঠতে ইচ্ছে হত না। কাছে থাকলে কষ্ট বাড়ে। আত্মীয়-স্বজনরাও চাইত না, মায়ের পাশে তিনি বেশিক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকেন। তাঁর তো বয়স হয়েছে।
আর কী যে হয়, কিছুটা তিনি পলাতকের মতোই প্রায় তখন দেশের বাড়িতে ফিরতেন। সুনন্দা বলত মা ভালো হয়ে যাবে, তুমি এত ভাবছ কেন। ভালো যে হবে না তিনি জানেন। তবু সুনন্দা কিংবা ভাইরা তাঁকে কিছুটা আগলে রাখত। দৌড়-ঝাঁপ তারাই করছে। শুধু টাকা-পয়সার বন্দোবস্ত রাখা ছাড়া তাঁর আর কোনো দায়ই ছিল না। মৃত্যুর সঙ্গে মা-র লড়ালড়িটা ছিল মাসাধিককাল।
তাঁর মাঝে মাঝে মনে হত, মা এই ঘোরের মধ্যে মৃত্যুকষ্ট কি টের পাচ্ছেন না টের পাচ্ছেন না। এক সাবলীল নৌকা যদি ঝড়ে নদীর কিনারায় উলটে পড়ে থাকে, তার দিকে আর কে তাকায়! ঝড় অথবা অতি নিবিড় স্নেহ কি এই ঘোরের মধ্যেও জীবনকে জড়িয়ে রাখে।
মা কি বলতে চান, বড়ো কষ্ট, আমি আর পারছি না রে। এই শরীর কিছুতেই মুক্তি দিচ্ছে না রে। গলায় ফাঁসের দড়ি ঝুলিয়ে আমাকে তোরা দোলাচ্ছিস কেন? ফাঁসটা আলগা করে দে। আমাকে মুক্তি দে।
এই মাসাধিককাল তার মনে হত, বড়োই ভয়ংকর দুঃসময়, কষ্ট, অতি কষ্ট, এবং গলা টিপে হত্যা করার চেয়েও প্রবল এক কষ্ট অথবা কি কোনো সুখ, জড়তার সুখ মাকে আচ্ছন্ন করে রাখছে! মা হয়তো কোনোই মৃত্যুযন্ত্রণা অনুভব করছেন না। অকারণ সবাই মায়ের কষ্ট দেখে চোখের জল ফেলছে।
মৃত্যুযন্ত্রণার মধ্যে ঢুকে না গেলে কেউ বোঝেই না মৃত্যুর ভাষা কী হয়, কীভাবে বদলায়।
মৃত্যুর মধ্যেও কি সুখ থাকে?
জীবনে যে সুখ নিত্যবহ, মৃত্যুযন্ত্রণাও কি শরীরে অন্য সুখ এনে দেয়। তিনি জানেন না, জীবিতরা কেউ জানে না, মৃত্যুর এই অবচেতন অন্ধকারে কোনো নীল ভূখণ্ডের স্বপ্নে মা বিভোর হয়ে গেছেন কি না।
তারপর যা হয় সাদা চাদরে মুখ ঢেকে দেওয়া হয়।
সুনন্দা ডাকছিল, তিনি কোথায় গেলেন।
কেউ বলল ঝাউ গাছটার নীচে বসে আছেন।
আসতে বল। তিনি তাঁর বড়ো পুত্র। গঙ্গাজল দিক।
জেঠু শিগগির উপরে যাও। ঠাকুরমার মুখে জল দিতে হবে। প্রিয়তোষ সাড়া দিতে পারনেনি। কিছুতেই তিনি মায়ের মরা মুখ দেখতে রাজি না। কেউ তাকে নিয়ে যেতে পারেনি। কখন সবার অলক্ষে তিনি তাঁর দেশের বাড়ির দিকে চলে গেছিলেন নিজেও টের পাননি।
রিকশায় যেতে হয়।
দেড় ক্রোশ পথ যেতে হয়।
গাছপালা, ধানের মাঠ এবং পাকা সড়ক পড়ে বাড়ি যেতে। রিকশায় বসে কেমন একাকিত্বে ডুবে যাচ্ছিলেন এই নয়, মা নেই বলে, বয়েস হলে সবাইকে যেতে হয়, এক জীবন থেকে অন্য জীবনে, অথবা কোনও জীবনেই হয়তো নয় মৃত্যু শেষ কথা বলে, জন্মের আগেও কিছু নেই, মৃত্যুর পরও কিছু থাকে না, সময়ের এক মধ্যবর্তী সময় জীবন নামক এক অস্তিত্বে ক্ষণিক লড়লড়ি, আসলে মৃত্যুকষ্টই তাঁকে বেশি পীড় দিচ্ছে।
কখনো নদীর মতো প্রবহমান আর্তির কথা— অথবা জীবন তো শেষ হবেই, জীবনের শেষ কথা বলেও কিছু নেই–অথচ কী সুন্দর এই গ্রহ, কত পাখপাখালি উড়ে যাচ্ছে, চাষিরা মাঠে যাচ্ছে, কয়েদবেল গাছ থেকে এক বালক ফল চুরি করে পালাচ্ছে কিংবা জীবনের নিত্য ম্রিয়মাণ অস্তিত্ব এই আকাশ এবং নক্ষত্রের আলোতে ভেসে যায়। কুয়াশায় ডুবে থাকে ঘাস, ওড়ে প্রজাপতি, দূরে কোনো বনাঞ্চলে শোনা যায় হরিণের পায়ের শব্দ, অতি দ্রুত গতি তার, সৌরমণ্ডলে এই গ্রহে আছে শুধু প্রাণ। এবং যৌনতাই তার জন্মের কারণ, যৌনতার নির্যাসই প্রাণ এবং প্রাণের নির্যাসই মৃত্যু।
তিনি রিকশায় চড়ে যাবার সময় এমন সব যাবতীয় চিন্তায় মগ্ন হয়ে যাচ্ছিলেন। মা এবং তাঁর শৈশব অথবা বালিকা বয়সের চাঞ্চল্য এবং বড়ো হয়ে ওঠার মধ্যে ছিল, এক অতীব আশ্চর্য ধারাবিবরণী, স্বামী, শ্বশুর এবং পুত্ররা, কন্যারা তারপর ধীর প্রবাহে এক বংশাবলি তৈরি হয়ে গেল।
২.
সেদিন প্রিয়তোষ ফিরছিলেন, সন্ধ্যা হয়ে গেছে, খালপাড় ধরে কিছুটা হেঁটে বড়ো রাস্তায় উঠে, বাস স্ট্যান্ড পার হয়ে, এক সরু চিলতে বস্তির রাস্তা পার হয়ে আবার বড়ো রাস্তায় পড়ে এবং কিছুটা গেলে তার বাড়ির রাস্তা, বেশ হন হন করেই হেঁটে যান, বয়সের ভারে তাঁর হৃদযন্ত্রটি দুর্বল না হয় তাই ডাক্তারের পরামর্শে এই সান্ধ্যভ্রমণ এবং সরু চিলতে রাস্তায় হঠাৎ কে যেন তখন ডাকল, বাবু-আবছা অন্ধকারেও চিনে ফেলতে তার কষ্ট হল না। মেনকা।
