হুঁশিয়ার–কথা বলবে না। নিরাময়দা সর্তক করে দিলেন।
হুঁশিয়ার—নজর রাখবে। নিরাময়দা উঠে দাঁড়ালেন। হাতে টেঁটা।
জলের তোড়ে বানা কাঁপছে। খালের এপাড় ওপাড় বানা পুঁতে দেওয়া। বানায় কাছে ঘোরাঘুরি শুরু করলেই-জলের ঘাস নড়ানড়ি করবে। জলের উপর ঘাসের লম্বা ডগা ভেসে আছে। পূর্ণিমার রাত, বুঝতে কষ্ট হয় না—যে দিকে চোখ যায় নির্জন মাঠ। কিছু হাটুরে মানুষ পাড় ধরে যাবার সময় বলল, নিরাময় না?
আজ্ঞে নিরাময় দাস।
মাছের গন্ধ পেয়েছে!
তা বলতে পারেন।
কী মাছ মনে হয়?
তাতো বলতে পারব না। অগাধ জলের মাছ, মাছ না অজগর। কে জানে। আমরা বললাম, ও নিরাময়দা, অজগর বলছ কেন?
হতেও পারে। কাছে ভাওয়ালের গড় আছে। মুসংয়ের পাহাড় আছে। বন জঙ্গলে কারা ঘুরে বেড়ায় কেউ বলতে পারে।
অজগর সাপ হলে কী করবে?
টেঁটায় গেঁথে ফেলব।
বড়দা বলল, আমি নিরাময়দা নৌকার চলে যাচ্ছি।
মেজদা বলল, না, ওটা কুমির হতে পারে।
আমি বললাম, বড়দা দাঁড়া আমিও যাব।
মেজদা বলল, তুমি সত্যি করে বল নিরাময়দা ওটা কী?
কুমিরও হতে পারে। দেখা যাক না। বলে একখানা বিড়ি ধরালেন জুত করে।
হরি বিশ্বাসকে কুমিরে খেয়েছে তবে! বকর বকর করবি না। কুমিরের কম্ম নয় হরি বিশ্বাসকে গিলে খায়। হরি বিশ্বাসকে খেলে কুমির নিজেই হজম হয়ে যাবে।
তা কে বলেছে, হরি বিশ্বাস! লাস শনাক্ত হয়েছিল।
লাস শনাক্ত করবেটা কে শুনি। ওর আর কে আছে নিয়ে গেল লাস। আমি তো দেখিনি। কে আর দেখতে যায়। চাউর হয়ে গেল হরি বিশ্বাস। আমারও ধারণা, হরি বিশ্বাস। তা মনে করলে, দোষের কী আছে! যার যেমন বিশ্বাস। ভূতের খবরদারি করলে শেষে এই হয়! তুমি বুঝি চাও না, হরি বিশ্বাস বেঁচে থাকুক।
কে চায়। প্রতিপক্ষ বাঁচুক কে চায় রে! বেটার তো হদিশ নাই। হদিশ না পেলে লাস হয়ে যাবে না! লাস হয়ে গেলে শনাক্ত করে কচু হবে!
পঞ্চবটি বনে নতুন সাধুর খবর রাখ! কে বলছে!
বারে দু-সাল ধরে নতুন এক সাধুর আমদানি হয়েছে জান না।
এত বড়ো গুহ্য কথা, সেই তো। বলে নিরাময়দা কেমন ফ্যাকাসে মুখ করে বসে থাকল।
রাত বাড়ছে। জোনাকি পোকা জ্বলছে। বড়দা মেজদা নৌকায় চলে গেছে। আমি নিরাময়দাকে ফেলে যেতে সাহস পাচ্ছি না। হাজার হোক গুনিন সে। তুকতাক জানে। কুমির অজগরের চেয়ে পঞ্চবটি জায়গাটা যে বেশি খারাপ এটা ঠিক মাথায় আছে।
হঠাৎ কে যেন কথা কয়ে উঠল। আরে নিরাময় না! তা খালে এতরাতে লণ্ঠন জেলে আর বসে থাকতে সাহস পাবে। তাই হাঁটা দিলাম। পড়েছে কিছু। নিরাময়দা বলল, আমি তো চিনতে পারছি না।
তা পারবি কি করে! চুলে জটা। মুখে দাড়ি-গায়ে গেরুয়া—বুঝবি কী করে। নদীর পারে শ্মশানে গিয়ে শেষে হাজির। তা পড়ল কিছু!
আশা করছি। শ্মশানে কেন!
নিরাপদ জায়গা। ভয়ে ডরে কেউ আসে না। গাজা ভাং-এর বড় অভাব। মাছ শিকার করে কুলাতে পারছিলাম না। তাই শেষমেশ শ্মশানে।
নিরাময়দা বললেন, বস তবে। বিড়ি খাবা। দে, খাই। বলে বিড়িখানা ঠিক নিল। কিন্তু হারিকেন থেকে আগুন জ্বালার সময় দেখা গেল—সব ফুস ফাস। কেউ নেই। আগুনের কাছে ভূত জব্দ।
নিরাময়দা হঠাৎ লাফিয়ে উঠল। দাঁড়াল। ছুটতে থাকল। কার পেছনে ছুটছে। বুঝতে পারলাম না। ডাকছে, ও হরিদা, পালাচ্ছ কেন! তুমি কি জান ওটা কী মাছ। তুমিতো মাছের রাজা ছিলে!
কোনো সাড়া নেই।
আর তখনই বানা কেঁপে উঠল।
আমার গলা শুকিয়ে গেছে। হাত-পা অবশ। কী করব বুঝে উঠতে পারছি না। কুমির অজগর হলেও এত ভয় পেতাম না। বোধ হয় সংজ্ঞা হারাতাম—তখনই নিরাময়দা বলল, বুঝলি, বাপেরও বাপ আছে। ভয় পাস না। ও টসকে গেল।
আমি ভয় পাই। বেটা কী ধান্দায় আছে বুঝতে পারছি না। দেখি কী হয়!
আর কী হয়! বললাম, আমি নৌকার যাব। দিয়ে এস।
কেন যে আসিস, বলে বিরক্ত মুখে বানার দিকে তাকাতেই দেখলাম, বেশ প্রসন্ন মনে হচ্ছে। ঠোঁটে আঙুল রেখে বললেন, এসে গেছে।
তারপর বানা তোলপাড় করে উঠলে, মারলেন জোরে চেঁটাখানা। আর মনে হল, সেই চাঁদনী রাতে জল রক্তে লাল হয়ে উঠেছে। আমার কেমন মাথা ঘুরতে থাকল। টেঁটাখানা চেপে ধরে আছেন নিরাময়দা। চোখ জ্বলছে। যেন কতকালের প্রতিশোধ নিচ্ছে—অথবা মীনের চলাফেরায় খুঁজে পেয়েছে অন্য এক প্রতিপক্ষকে–একজন পালাল, অন্যজন জলের তলায় বুড়বুড়ি কাটছে।
টেঁটার ডগা আমার হাতে দিয়ে বলল, শক্ত করে ধর। জলে নেমে যাচ্ছি। এত বড়ো ওজনের মাছ সামলাতে পারব না। নিরাময়দা জলে ঝাঁপিয়ে পড়লেন, আর যা দেখলাম, সেই এক লম্বা শিথিল লেজ তুলে মেঘের রং তার এবং গভীর জলের কোনো অতিকায় জন্তু না অজগর, না কুমির বোঝা গেল না। বানা ভেঙে চুরমার হয়ে গেল। গড়িয়ে গড়িয়ে নেমে যাচ্ছে। কীসে যেন পেঁচিয়ে ধরেছে নিরাময়দাকে। জলের গভীরে লাল রক্তের সঙ্গে নিরাময়দা ভেসে চলে যাচ্ছে। একবারই দেখেছিলাম, তার দুখানা পা জলের উপর ভেসে উঠেছে।
আমি আর পারলাম না। নদীর কাছে নৌকায় এসে হুমড়ি খেয়ে পড়লাম। আমার আর কোনো হুঁস ছিল না। শৈশবকালের অভিজ্ঞতা এটা আমার। এখনো মনে হয়, সব কিছুর মধ্যে কোনো গোলমাল আছে। কাহিনির মাথামুণ্ডু ঠিক যেন নেই। লোকটা কি সত্যি হরি বিশ্বাস। টেঁটায় গেঁথে গেছিল মাছ, না কুমির, না অজগর। জ্যোৎস্নায় চরাচর কেমন এক অলৌকিক রহস্য সৃষ্টি করে ফেলেছিল। বোধ হয় আমার মাথাও ঠিক ছিল না। তবে সপ্তাহখানেক বাদে ক্ষতবিক্ষত অবস্থায় নিরাময়দা ফিরে এসেছিলেন। জলে ডুবে যাননি। ভাসিয়েও নেয়নি। মুখে শুধু রা ছিল না। কার কাজ জানি না। ভাবলে সব ব্যাপারটাই আমার কাছে এখনও ভূতুড়ে মনে হয়।
