নিরাময়দা বললেন, মাছ হল গে আজব জীব কর্তা। তার সঙ্গে লড়ালড়ি। সে ধরা দেবে কেন সহজে। তবে জল নামছে।
ঘাপটি মেরে থাকবে কোথায়! পোদ্দারদের ঝিলে আর কত ধরতে জলের টানে নেমে আসবেই।
কাকা হাসেন, নিরাময় মাছের চলাফেরার হাল হদিশ একটু বেশিই জানে।
তুই কী বুঝলি! কাকার প্রশ্ন।
মনে হয় মন খানেক ওজনের ঢাইন মাছটাছ হবে। ধানগাছ উথালপাতাল। তা সাঁতার জলে নেমে যেতে সাহস পেলাম না। বিলের জল দু-লগি সমান নৌকা নিয়ে ঘোরাঘুরি করলাম। টের পেলাম না। কোথায় যে তলিয়ে গেল।
তা হেমন্তেও সেই বিশাল বিলে গভীর জল এবং পদ্মপাতায় ভরা। তবে খাল ধরে জল নেমে যেতে থাকলে, নদীর মাছ আর বিলে থাকে কী করে। নতুন বর্ষায় মাছের শরীর তাপে ভাপে জ্বলে না। আহা সেই সুমিষ্ট জলের স্বাদ পেতে আনন্দে তারা দিগবিদিক জ্ঞানশূন্য হয়ে লেজ নাড়তে নাড়তে ধানের জমিতে, বিলের জলে, খালের জলে ঢুকে যায়। আর পাখনা নাড়ায়। লেজ ওড়ে। বর্ষায় মাছের এই মজা।
কাকা বললেন, গজার মাছটাছ হবে। তা মনে হয় না। গজার মাছের গন্তব্যস্থল বিলের মধ্যে—এ-মাছ নদীতে নামার জন্য আঁকুপাঁকু করছে। পূর্ণিমা রাতে সে নেমে আসতে পারে। জোনাকি পোকা ধানগাছের মাথায় তখন ওড়াউড়ি করে না। পাতায় পাতায় বসে যায়। পোকামাকড়ের তল্লাসে, মাছেরও কম নেশা থাকে না। আমরা রওনা হবার সময় কাকা বললেন, নিয়ে তো যাচ্ছিস। কার বাপের সাধ্যি আছে এদের সামলাতে পারে।
আসলে নিরাময়দা চায়, তিনি কত বড়ো মাছ শিকারি তারা দেখুক।
যাবার সময় আর এক প্রস্থ হিসেব।
কোচ। পাল। বানা। দড়ি। হ্যারিকেন। বস্তা। চাটাই। দেশলাই।
সারারাত কাবার হয়ে যাবে। মুড়ি পাটালি গুড় সঙ্গে।
দুপুর নাগাদ এই করে গেল। খালে নৌকা। নৌকায় তোলা হল সব। এমনকী মুড়ি পাটালি গুড়ও। দরকারে দামোদরদির বাজার আছে। ঘোষের দোকান আছে। ঠাকুরবাড়ির নামে এক পাতিল দই চাইলেও মিলে যাবে।
আসলে কী মাছ তাই সংশয়।
কত বড়ো মাছ নিরাময় দা!
জলের তলায়, আমি কি মেপে দেখেছি।
কেমন করে দেখলে।
ধানের জমিতে জলের পাক। না দেখলে বিশ্বাস করতে পারবি না। সব ধানগাছ নুয়ে পড়েছে। জলের তলায় তাণ্ডব—কিন্তু বুঝি কী করে কা মাছ!
কুমির নয় তো!
তোরা কেন যে এলি! কুমির ডাঙায় উঠে বিলে পড়ে থাকবে!
না বলছিলাম, যা বলছ, তাতে হৃৎকম্প না শুরু হয়।
তোদের আসা ঠিক হয়নি। কুমির নদীতে ভেসে আসে! সেই কবে একবার এসেছিলো! বাবুরা কুমিরটাকে মারার কম চেষ্টা করেনি। পালের গোরু নিয়ে চড়ায় টানাটানি শুরু করে দিল শেষে। দোষতো দেওয়া যায় না। বেচারা খাবে কী! মানুষ জলে নামে না, ডাঙায় মানুষ লক্ষ নিয়ে পাহারা দেয়—খাবেটা কী।
তারপর কী হলো!
গুলি।
কে করলো!
বাবুরা। ধর্মনাশ বাবু। অবিনাশ বাবু। গুলি পিঠে। গেল পিছলে। কিন্তু জেদ বটে। গোরুর ঠ্যাং কামড়ে ধরে আছে। জলে নিয়ে নামাবে। নদীতে ডুবিয়ে, কুমিরের আস্তানায় তুলে নিয়ে যাবে। কুমিরও কামড় ছাড়ছে না বাবুরাও গুলি করে যাচ্ছে। ফুটছে। পিঠে গুলি লেগে পিছলে যাচ্ছে। বাবুরা সটাসট গুলি করে হয়রান। তাজ্জব হারাণ মিঞা। বলল, দ্যান দেখি বন্দুকখানা। ঠ্যাং কামড়ে আছে বলে কুমিরের চোখে গুলি করছেন না। ভগবতীর গায়ে না আবার গুলি লাগে। চোখে গুলি না করলে কুমির মরে!
ছোড়দা বলল, কুমিরের খুব শক্ত পিঠ না নিরাময় দা!
শক্ত মানে। কচ্ছপের দশগুণ। গুলি পিঠ ফসকে আগুনের গোলা হয়ে উড়ে যায়। কিন্তু গুলিবিদ্ধ করা যায় না। নৌকার পাল তুলে দেওয়া হয়েছে। পেরাব, পোনাব পার হয়ে মশাবর খাল। খালে খালে বিল। বিল পার হয়ে আবার খাল। খালে কোমর জল। নিরাময়দার হিসাব অনুযায়ী আজকের রাতটাই সেই কামাল করা মীনের শেষ রাত। যদি না নামে, তবে আর, নামা হবে না। বিলের জলে আটকা পড়ে পচবে নয় ধরা পড়বে। কার ভাগ্যে এত বড় শিকার আছে কে জানে!
বুক জলে নেমে বাঁশের বানা পুঁতে দিল নিরাময়দা। আমরা মুগুর এগিয়ে দিলাম। আমাদের নৌকা নদীর চড়ায় তোলা। সামনে তাকালেই নদী। শেষ জোয়ার এটা। খালে জল ঢুকছে। এই জোয়ারে যদি নেমে না যায়, আর এ-সালে খালে নদীর জল ঢুকবে না। বর্ষা না পড়লে নদীনালা ভেসে না গেলে অতিকায় মীনের প্রাণনাশ হবে। মাঠে মারা পড়বে—এটাই নিরাময়দার কষ্ট। নিরাময়দার হিসাবও তাই। জলের সঙ্গে মাছের, মানুষের হাড্ডাহাড্ডি লড়াই। বানা পুঁতে দিল খাল বরাবর। বড়দা বলল, মাছটা বানায় এসে গোত্তা মারবে। ভেঙে ফেলবে নাতো। খুব সোজা! কত শক্ত বাঁশ! দেখেছিস। মুগুরের ঘায়ে টসকাল না। সামান্য একটা মীন, তা দেড় দু-মনও হতে পারে—যাই হোক, আজ এসপার না হয় ওসপার হবে। হয় আমি থাকব নয় মীন থাকবে। মেজদা বলল, বানায় উপর দিয়ে টপকাবে।
তা কথার মতো কথা। দু-পাঁচ হাত উপর দিয়ে লাফ মারতে পারে। টেঁটাটা দেতো দেখি।
‘কী করবে?
টেঁটার তিনটে ফলা। লম্বা বাঁশের মাথার খাপকাটা খাঁজে ঠেসে দেওয়া। সঙ্গে হাত পঞ্চাশের লম্বা দড়ি।
টেঁটার ধার দেখে নিরাময়দা বলল, ঘচাং করে বিঁধে যাবে। লাফ মারলেই হল। টেঁটাখানা কার হাতে বুঝবি না! দূরে পঞ্চবটি শ্মশান। তার চালাঘর। ধোঁয়া উঠছে। আমার গা শির শির করতে থাকল ভয়ে। সবে সূর্যাস্ত হয়েছে। মাছেরাও দিনরাত বোঝে। পূর্ণিমা বোঝে। জোয়ার ভাটা বোঝে দিন দুই আগে বিলের সেই অতিকায় মীন দেখে গেছে নিরাময়দা। তা দুক্রোশের মতো বিলটার হয়ে জোয়ার ধরতে সময় লেগে যাবারই কথা। আর বিলের জল তো। কত মাছ, পাবদা, চাপিলা, পুঁটি, ট্যাংরা, কই, শিং, মাগুর—আহার পর্বটি খোশ মেজাজেই চালাচ্ছে। ঠিক করেছে, শেষ জোয়ারে নদীতে নেবে যাবে। জানবে কী করে একজন মনুষ্য টের পেয়ে গেছে, তার গতিবিধি। টের পেয়ে খালের জলে বানা পুঁতে দিয়েছে। যাবে তো যাও, বানা টপকে যাও। যাবে তো যাও টেঁটার কামড় ফসকে যাও। তা ওস্তাদ শিকারি। টেঁটাখানা এখনো হাতে নিচ্ছেন না। নদীর বুক থেকে ঝপাং করে চাঁদ লাফিয়ে উঠে গেলে, আমরা বস্তা পেতে বসে থাকলাম। বানা থেকে খানিকটা দূরে। ঘাসে কুয়াশা জমছে।
