তা ওদেরও তো ইচ্ছে হয়। ভয় ডর না কাটলে বড়ো হবে কি করে!
কাকা বললেন, তা অবশ্য ঠিক।
নিরাময়দা বলল, ঠিক আছে যাবে। হাত লাগাও।
হাত লাগাও বলতে, মাছ শিকারের নানাবিধ কৌশলের কথা বললেন।
এই নাও বানা। পাট করে বেঁধে ফেল। নিরাময়দার সহকারী সুধন্য এবারে যেতে পারছে না। ম্যালেরিয়ায় ভুগছে। ঠিক ছিল সতীশ কর সঙ্গে যাবে। তারও যাবার সখ অনেকদিন থেকে। চন্দ্রকিরণ চাই—অর্থাৎ পুর্ণিমা না হলে ‘জো’ হয় না। রুপালি মাছেরা চন্দ্রকিরণে আচ্ছন্ন হয়ে থাকে। হাতেই ধরা যায়। রোজ এসে খবর নিয়ে গেছে সতীশ কর—কি কবে যাবে ঠিক করলে! ‘জো’ শুরু কবে?
আমরা যাচ্ছি যখন সতীশ করের দরকার নেই। সকাল বেলাতে আমাদের উঠোনে সতীশ কর আসতেই নিরাময়দা বলল, যাওয়া হবে না। আকাশ মেঘলা দেখছেন না! এবারে বোধ হয় ‘জো পড়বে না। শিকারে গেলেই মাছ পাওয়া যাবে কথা নেই। ভাগ্য প্রসন্ন না থাকলে খালি হাতেও ফিরতে হতে পারে। তবে ওস্তাদ মাছ শিকারিরা জানে, কবে কখন, যেমন নিরাময়দার কাছ থেকেই আমরা জেনেছি, শনি মঙ্গলবারে গলদা চিংড়ির জ্বর আসে। কথাটা যে বেঠিক না, জলা দেশে বড়ো না হয়ে উঠলে জানতে পারতাম না। জ্যৈষ্ঠের বৃষ্টি মাঠ ঘাট ভেসে যায়। নদী নালা ভেসে যায়। আষাঢ়ে বাড়ির ঘাটে জল। আমগাছ জামগাছের গোড়ায় জল। কচুর বনে জল। এ-বাড়ি ও-বাড়ি যেতে জল। ঠিক ভাদ্রে জল নামতে শুরু হয়। আর নিরাময়দার কেরামতিও শুরু তখন থেকে।
দেতো ভুলাখানা।
আমরা যাব।
কি করবে গিয়ে। এক ধমক।
নিরাময়দা বাড়ি থেকে বের হলে আমরাও তার পেছনে। পরনে গামছা। খালি হাতে কাঠাখানেক গলদা চিংড়ি তুলতে যাচ্ছেন। কী করে যে বোঝে! ঠিক রাজবাড়ির পেছনে জলে জঙ্গলে হেঁটে বেড়ান। খালের পাড়ে পাড়ে হেঁটে বেড়ান। সন্তর্পণে বকের মতো পা ফেলেন। আমরাও বকের মতো পা ফেলি। নিরাময়দা হাতের ইশারায় চলে যেতে বলেন, শুনি না।
দেখি, খপ–। খপ করে জলে ডাঙায় বড়ো গলদা চিংড়ির মাথা চেপে ধরেছেন। নীল রং। কী বাহার তার। কী করে যে বোঝেন। বড়ো বড়ো দাঁড়গুলি নাড়ে। আমরা ছুটে গেলে বিরাশি সিক্কার থাপ্পড়। কাছেও যেতে পারি না। অথচ অদম্য কৌতূহল। কী ভাবে নিরাময়দা এবার বেজায় প্রসন্ন হয়ে গেল, বলল চল, কী করে বুঝবি, দ্যাখ। জলে ডাঙায় কী করে মাছ ধরতে হয় শিখে রাখ।
খালের পাড়ে পাড়ে হাঁটছি।
হঠাৎ হাত তুলে দিলেন। আমরা থেমে পড়লাম। তারপর তিনি ইশারায় ডাকলেন। বকের মতো পা ফেলে জল ভাঙতেই বললেন, ওই দ্যাখ।
কিছু দেখতে পাচ্ছি না।
ফিস ফিস করে কথা বললেন, নিরাময়দা।
দেখতে পাচ্ছিস না!
জলে টান ধরেছে। জলে পচা গন্ধ। জলজ ঘাস পচছে, মাছেরা পালাচ্ছে—ওই দ্যাখ। পচা জলে মাছ থাকবে কেন? সত্যি, গোড়ালি জলে একটা নীল রঙের বিশাল চিংড়ি পড়ে আছে। বোঝা যায় না। ঘাসের রং জলের রং মাছের রং এক রকমের। নীল হলুদ সবুজ।
নিরাময়দা মাছের পোকা।
আমরা বলি মাছের রাজা। সবাই বলে, হরি বিশ্বাসের চেলা। ডাঙায় মাছ। লাফিয়ে ওঠে নিরাময়দাকে দেখলে।
সেই শিকারি মানুষ বললেন, ইশারায়, পারবি!
আমি ঘাড় কাত করে বললাম, পারব।
বড়দা আমাকে ঠেলে দিয়ে এগিয়ে গেছিল। আর ধরতে যেই না গেল, ঝপাং করে কোথায় ছিটকে গেল মাছটা। নিরাময়দা ক্ষেপে লাল। ‘হাত প্রমাণ সাইজের মাছটাকে তাড়ালি! তোদের দিয়ে কিছু হবে না। শনিবার মঙ্গলবার চিংড়ি মাছের জ্বর আসে জানিস! জলের কিনারায় এসে পড়ে থাকে। সূর্য উঠলে চিংড়ি মাছেরা জলের গভীরে নেমে যায়। তাদের আর দেখা পাওয়া যায় না। সেই থেকে জানি শনি মঙ্গলবারে মাছের জ্বর আসে। দাদা জানে। গুহ্য কথা বলে দিলে আমরাও জানলাম। আবার কিছুদূর হেঁটে গেল।
রাত থাকতেই বের হতে হয়। অন্তত সূর্যোদয়ের আগে জলার চারপাশটা ঘুরে দেখতে হবে। ভোররাতের অন্ধকারে দাদা টের যে পায় কী করে! গাছ পাতা জলে নড়ানড়ি করলেই নাকি টের পাওয়া যায়, তেনারা উঠে আসছেন। আবার ডাক। কাছে গেলাম।
আমাদের দেখালেন কী করে ধরতে হয়। খুব সন্তর্পণে উবু হয়ে বসলেন। মাথার উপর গাছের ছায়া। দূরে মশার শব্দ। হাতটা ধীরে ধীরে প্রসারিত করে দিচ্ছেন। হাতের থাবায় পাতলা গামছা। এক হাতে গামছার শেষ প্রান্ত ঝুলিয়ে রেখেছেন। হাত ফসকালেও রেহাই নেই। জালি গামছায় বাছাধন আটকা পড়ে যাবে। কিন্তু আশ্চর্য খপ করে মাছের মাথাটি চেপে ঠিক ধরে ফেলেছেন। আমরা সবাই ঝুঁকে পড়েছি।
দেখলি! কত বড়ো দেখলি!
তা ঠিক, মুগুরের মতো মাথা। নিরাময়দাকে দেখলেই প্রতিবেশীরা বকত, নেশা বটে, এত রাতে বানা পেতে বসে আছিস! কিছু পেলি! সাপখোপের ভয় নেই!
হেসে বলেন, না। কারণ তিনি জানতে দেন না, কোথায় কী মাছ মিলতে পারে। বড়ো ডুলায়, বড়ো বড়ো পাবদা মাছ তুলছেন আর ডুলায় করে ফেলছেন টের পেলেই ভিড় জমে যাবে। বানা পেতে তারাও চেষ্টা করবে আরও মাছ ধরার। নিরাময়দা স্বীকারই করে না, মাছ তার বঁড়শি কিংবা বানায় আটকে যাচ্ছে। মাছের ডুলাখানাও আড়ালে রেখে দেন। দেখলে মনে হবে মানুষটা কেবল বসে বসে প্রহর গুনছে মাছের আশায়। কেউ কেউ বলত, বেটা মাছই তোকে খাবে। সেই নিরাময়দা দামোদরদির হাট থেকে ফিরে কাকাকে বলেছিলেন, কর্তা পূর্ণিমার ‘জো’ পড়বে। ধানের জমিতে মাছের আওয়াজ পেলাম। দেখা যাক কী মাছ? মনে হয় বিলে আটকা পড়েছে। নেমে যাবার পথ পাচ্ছে না। কাকা বলেছিলেন, গতবারে তো কিছুই পেলি না, সারা রাত মশার আর জোঁকের কামড় খেলি।
