জোটন ঘরের এক কোণায় বসে থাকল। ওর মাথাটা ঘুরছে। সে খুঁটিতে হেলান দিল। কোমর থেকে ডুরে শাড়িটা খসে পড়ছে। আবেদালি নেই, জববর নেই, থাকতে বলত—আমার ঘরটা বন্ধক রাইখ্যা এক প্যাট ভাত দ্যা। সে ক্ষুধার যন্ত্রণায় থাকতে না পেরে গিমা শাকগুলো সিদ্ধ করল এবং খেল। সে কিছু অকালপক্ক বেথুন এনে খেল। এ সময় উঠোনে গাছের ছায়া দীর্ঘতর হচ্ছে। কাক শালিকেরা প্রায় সকলে ডালে, ঝোপ-জঙ্গলে যেন ঝিমোচ্ছে। ফকিরসাব ছেড়া মাদুরে পড়ে ঘুমোচ্ছেন। জোটন আর বসে থাকতে পারল না। শরীরের জড়তায় সে ডুরে শাড়ির আঁচল পেতে মেঝের উপর পেট রেখে ঘুমিয়ে পড়ল।
বিকেলবেলাতে যখন উঠোনের উপর দিয়ে পাখিরা ডেকে গেল, যখন সাত ভাই-চম্পা পাখিরা লাউ মাচানের নীচে কিচকিচ করল অথবা ধানের আঁটি নিয়ে কামলারা সড়কের উপর কদম দিচ্ছে তখন জোটন ক্লান্ত এবং উদ্বিগ্ন শরীরটাকে টেনে টেনে তুলল। ফকিরসাহেব হুকা খাচ্ছেন বসে। সব পোটলা-পুঁটলি যত্ন করে বাঁধা, যেন তিনি এখন উঠবেন, শুধু হুকা খাওয়াটা বাকি। জোটন এবার থাকতে পারল না। ঘর থেকেই বলল, ফকিরসাব আমারে লৈয়া যাইবেন না।
ফকিরসাব ঝোলাঝুলি কাঁধে নিতে নিতে বললেন, আইজ না। অন্যদিন হৈব। কোরবান শেখের সিন্নিতে যামু। কবে ফিরমু ঠিক নাই। উঠোন থেকে নেমে যাওয়ার সময় দরজার ফাঁকে জোটনের শীর্ণ মুখে দুঃসই ব্যথার চিহ্ন ধরতে পেরে উচ্চারণ করলেন—আল্লা রসুল, আহা এই ইচ্ছায় সংসারে আমরা কতদূর যাব, আর কতদূর যেতে পারি; ফকিরসাহেব ওইমতো চিন্তা করলেন। তিনি হাঁটতে হাঁটতে ধরতে পারলেন, জোটনের চোখদুটো এখনো ওকে অনুসরণ করছে অথবা যেন জোটন দেখল হাঁসের পালক মালতির শরীরে—ইচ্ছার জল সব গড়িয়ে গড়িয়ে পড়ছে অথবা পিরের শরীর গাজির গীতের গায়ানদারের লাঠি য্যান… হাঁটতাছে…হাঁটতাছে, চাঁদের মতো মুখ করে চ্যাপটা চ্যাপটা নাকে চোখে জোটনের সকল দুঃখকে দ্যাখতাছে। জোটন এবার ডুকরে কেঁদে উঠল—আল্লারে, তর দুনিয়ায় আমার লাইগ্যা কেয় বুজি নাইরে।
মীন রহস্য
নিরাময়দাকে কিছুতেই রাজি করাতে পারছিলাম না। তাঁর এক কথা, না। তোমাদের সঙ্গে নিয়ে মরি। ছোটো কর্তার মেজাজ খারাপ। সকাল থেকে শুরু হয়ে গেছে। খবরদার নিরাময় ওদের নিবি না। জ্বর জ্বালা হলে কে দেখবে। জায়গাটাও ভালো না। তোর যে কী মতিভ্রম হয় বুঝি না। ঋতুটাই বিশ্বাসঘাতক।
হেমন্তের মাঝামাঝি সময়। শীত পড়ে গেছে। রাতে কুয়াশা পড়ে। তিনুডাঙার মাঠে এখন ঝানু মাছ শিকারীরা ঘুরে বেড়ায়। আসলে মাঠ না বলে বিল বলাই ভালো। নদীর পাড়ে পঞ্চবটীর শ্মশান। বিল থেকে খাল নেমে গেছে শীতলক্ষ্যায়। এ-সময়টায় বর্ষার জল নেবে যেতে থাকে। মাঠ ঘাট শুকনো হয়ে ওঠে। বিলে যতদূর দেখা যায় শুধু ধানের জমি। ধানগাছের পোকামাকড় খেতে বর্ষার নদী থেকে উঠে আসে নানা কিসিমের মাছ। ধানগাছ যত বড়ো হয়, জল যত বাড়ে তত তারাও বাড়ে। বর্ষার মাছ শিকার, কচ্ছপ শিকার এক নেশা। শরতেই জলে টান ধরে। গ্রাম মাঠ থেকে জল নেমে যেতে থাকে। নালা খাল বিলের জল নেমে যায় নদীতে। ছোটো কর্তা রাজি না।
তা ছোটো কর্তারও দোষ দেওয়া যায় না তার না হয় তন্ত্র মন্ত্র ভরসা, এদের কী ভারসা! ছোটো কর্তা রাজি হবেন না। তা ছাড়া গত সালে হরি বিশ্বাস মাছ শিকার করতে গিয়ে গায়েব হয়ে গেল। ভূত প্রেতের কাণ্ড। সুযোগ বুঝে এত বড়ো ওঝারও হয়তো ঘাড় মটকে দিয়েছে। কিন্তু আমরা সকাল থেকেই বায়না করছি, নিরাময়দা তুমি একা যাবে কেন, আমরাও যাব। আমাদের বুঝি ইচ্ছে হয়—আমরা দুষ্টুমি করব না। যা বলবে শুনব। ‘ওই তো মুসকিল! হরি বিশ্বাস গায়েব হয়ে গেল। ‘জানের মায়া নেই তোদের। ‘বারে তুমি থাকলে আমাদের ভয় করবে কেন। তুমিতো কত কিছু জান। ভূত উড়ানি মন্তর জান, গন্ধ শুঁকে টের পাও সাপখোপের উপদ্রব আছে কি না, তুমি পার। তুমি বললে কাকা রাজি হবে। গেল বারে যে বললে, এবারে নিয়ে যাবে। বললে কেন বল! বড়দা ক্ষেপে আছে জান। তার এক কথা, আমাদের না নিয়ে গেলে, নিরাময়দাকেও যেতে দেব না। কি করে যায় দেখব।
বড়দাকে নিরাময়দা সামলাতে পারে না। হেন আকাম কুকাম নেই বড়দা করতে পারে না। যাবে, যাও। দেখবে ফিরে, কি হয়!
কি আর হবে! বড়দা গোয়ালের গোরুবাছুর ছেড়ে দেবে। তখন নিরাময়দার মাথায় হাত। লেজ তুলে গোরু বাছুর ছুটবে। বাড়ি, ঘর, উঠোন পার হয়ে একেবারে মাঠে। কোন মাঠে, কার খেতে মুখ দেবে—তারপর এই নিয়ে কথা কাটাকাটি। কে করেছে! কেউ জবাব দেবে না। নিরাময়দা ফাঁপরে পড়ে যায়। তার জামা নেই, লুঙ্গি নেই। মাদুর হাপিজ। তার ঘরে কে ঢুকল! কিছু নেই।
আমরা সবাই চুপ।
নিরাময়দা জানে, বড়দার কাজ। বড়দা তখন কি ভালোমানুষ। তোমার ঘরে আমরা ঢুকিই না। তোমার গামছা লুঙ্গি কোথায় আমরা কি জানি? তা ছাড়া কথা দিলে কেন। এ-সালে নিয়ে যাবে বললে কেন! কথা দিলে কথা রাখতে হয়।
অগত্যা নিরাময়দা ছোটো কাকার কাছে আরজি জানাল—যেতে চাইছে। যখন….. নিরাময়দার দাপট আছে। বিশ্বাসী মানুষ। এ-ছাড়া আমাদের দ্বিতীয় মনিব। নানা আকাম কুকাম ঠিক নিরাময়দা ধরে ফেলে। কান ধরে হিড়হিড় করে টেনে আনে বাড়িতে।
কাকা বললেন, বলছিস তুই।
