জোটন উঠে পড়ল। মেয়েটা শোকে কাঁদছে, কাঁদুক। ওর তিন নম্বর খসমের কথা স্মরণ করতে গিয়ে গলা বেয়ে একটা শোকের ছায়া উঠে আসতে থাকল। বেলা বাড়ছে। পেটে ভয়ানক খিদে। যে চাল আছে জোটনের দু-ওক্ত হয়ে যাবে। সে হাঁটবার সময় গোপাট থেকে কিছু গিমা শাক সংগ্রহ করল। তারপর আবেদালীর ঘর অতিক্রম করে উঠোনে উঠেই তাজ্জব বনে গেল—যে মানুষটা কাল রাতে আসেনি, যে মানুষটার জন্য সে প্রায় সমস্ত রাত জেগে বসেছিল, সেই মানুষটা ছেড়া মাদরে নামাজের ভঙ্গিতে বসে তফন সেলাই করছে। নীল কাঁথার মতো ঝোলা, মুসকিলাশানের লক্ষ, ভিন্ন ভিন্ন সব তাবিজের মালা, কুঁচ ফলের মালা এবং পুঁতির হাড় এইসব বিচিত্র বস্তুর সমন্বয়ে এখন ফকিরসাব যেন ঘোড় দৌড়ের পীরের মতো।
জোটন ফকিরসাবকে উদ্দেশ্য করে বলল, সালেমালেকুম!
ফকিরসাব এতক্ষণে জোটনকে দেখতে পেল এবং বলল, ওয়ালেকুম সেলাম।
জ্বালালী ঘরের কোণে ঘোমটা টেনে বসে আছে। জোটনেরও ইচ্ছা হল এ সময় বড়ো ঘোমটা টেনে ছোটো ঘরটায় বসে থাকে। কিন্তু খিদমতের অসুবিধা হবে ভেবেই যেন সরমের জন্য দিল খুলে দিতে পারল না। সে জ্বালালীর ঘরে ঢুকে বলল, মানুষটা খাইব, কী যে খাওয়ামু!
জোটনের এই গোপনীয় কথা ফকিরসাব শুনতে পেলেন। আমার জন্য ভাইবেন না। দুইডা শাক ভাত কৈরা দ্যান। দেখেন নিশ্চিন্তে ক্যামনে খাইয়া উডি।
জোটন বলল, জ্বালালী দুইডা পুডির শুঁটকী দ্যা।
জোটন রান্নার জন্য সোলার-পারা থেকে এক আঁটি সোলা নামিয়ে আনল। ঘরের পিছনে সোলাগুলোকে মড়মড় করে ভাঙল এবং ভাঁজ করে ঢুকতে গিয়ে দেখল-ফকিরসাব এখনো তফনে তালি মারছেন বসে, বেড়ার ফাঁক দিয়ে জোটন ফকিরসাবের প্রশস্ত বুক এবং কবজি দেখে-গতরে খোদার মাশুল উশুল হতে বেশি সময় নেবে না—সুতরাং, সুখী মনে জোটন রান্না করতে বসল। দু-সাল হল গতর বেশরমভাবে প্রায় রাতে বেইমানী করতে চাইছে। রাতে যতবার এমন হত জোটন ছেঁড়া মাদুরে বসে আল্লাকে স্মরণ করে গতরের এইসব বেওয়ারিশ ইচ্ছাকে তাড়াতে চাইত। দু-দুবার তালাক পেয়ে জোটন যেন বুঝতে শিখেছে ওর শরীরের খাক মেটাবার শক্তি পুরুষদুটোর ছিল না—সুতরাং তালাক দিল— বলল, ইবলিশের গতর কেবল খাই-খাই। সে ফের উনুনে কিছু সোলা গুঁজে দিল এবং ফকিরসাবের শরীর দেখল বেড়ার ফাঁক দিয়ে। সমস্ত চালটাই সে রান্না করছে। দুজনের মতো ভাত। সে শুটকি মাছ দুটোকে আগুনে পুড়িয়ে নিচ্ছে, সে অনেকগুলো লাল চাঁটগাই লঙ্কা বেটে নিচ্ছে পাথরে, বড়ো বড়ো দুটো পেঁয়াজ কেটে শুটকি দুটোকে মড়মড় করে সানকির এক পাশে গুঁড়ো করে রাখল তারপর লঙ্কা, পেঁয়াজ, নুন এবং শুটকির ভর্তা বানাতে গিয়ে জিভে জল এল। এখন সে ইচ্ছা করলে দুজনের ভাত যেন একা খেয়ে নিতে পারে। কিন্তু বাড়িতে মেহমান—সে তার ক্ষুধাকে নিবৃত্ত করল কিছুক্ষণের জন্য। ভাতের ফ্যানা টগবগ করে ফুটছে। সোঁদা সোঁদা গন্ধ ভাতের। সে ফ্যানটা গেলে একটা সানকিতে যত্ন করে রাখল, নুন মেশাল—সবটা ফ্যান পিছন ফিরে চুকচুক করে গিলতে থাকল–আহাঃ। এতক্ষণে যেন চোখ তার দৃশ্যমান বস্তুগুলোকে স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছে, ফকিরসাবকে পিরের মতো মনে হল দরগার পির এই ফকির সাহেব। জোটন নিজের শরীরের দিকে নজর দিয়ে বুঝল, এ শরীরও ভয়ানক শক্ত সমর্থ। ফকিরসাবকে কাবু করতে খুব একটা আদা নুন লাগবে না। জোটন মনে মনে হাসল। বেড়ার ফাঁক দিয়ে ডাকল, ফকিরসাব সান করতে যান। আমার খানা পাকান হৈয়া গ্যাছে।
ফকিরসাব সব তল্পিতল্পা সঙ্গে নিয়েই ঘাটে গেল, এমনকি মুশকিলাশানের আধারটাও। জোটন এই ঘরে বসে কাকের শব্দ পেল, আকাশে রোদ, গাছে এবং শাখা-প্রশাখায় রোদ। জাফরি রঙের ছায়া ঘরের পিছনে। বেত ঝোপে বোলতার চাক—নীচে বোন্নাগাছের ঘন জঙ্গল, ফকিরসাব হাসিমদের পুকুরে স্নান করতে গেছে। জোটনবিবি গাজির গীত ধরল গুনগুন করে। জোটনবিবির স্বপ্ন জাগছে চোখে, বেত ঝোপে বেথুনের মতো এই স্বপ্ন কবে টস-টস করে পাকবে… জোটন রঙের ছবি ভাবতে পারছে না—স্বপ্নটা গাজির গীতে গায়ানদারের হাতের ছড়ি যেন, চাঁদের মতো মুখ করে চ্যাপটা নাকে চোখে জোটনের সকল সুখকে দ্যাখছে।
জোটন তাড়াতাড়ি পাশের একটা গর্ত থেকে ডুব দিয়ে এল। চুলের জল ঝেড়ে ডুরে শাড়ি পরে ভাঙা আয়নায় নিজের সুন্দর মুখটি দেখল, উজ্জ্বল দাঁতের পাটি দেখে রাতে পিরের দরগার সুখের হীরামন পাখির কথা মনে করে কেমন বিহ্বল হতে থাকল। ফকিরসাহেব ছেড়া মাদুরে বেশ পরিপাটি করে খেতে বসলেন। ভিজে লুঙ্গি সিম লতার মাচানে শুকোচ্ছে। তিনি খেতে বসে দুবার আল্লা উচ্চারণ করে আকাশ দেখলেন—আকাশ পরিষ্কার, বড় তকতকে এই উঠোনে ঝকঝকে আকাশের নীচে বসে গবগ খেতে পারলেন না। যেমন পরিপাটি করে বসছেন তেমনি ধীরে-সুস্থে এক সানকি মোটা ভাত শুটকির ভর্তা দিয়ে কিঞ্চিৎ মেখে মেখে বেশ তারিয়ে তারিয়ে খেতে থাকলেন। নীচে দুটো-একটা ভাত পড়ছে— তিনি আঙুলের ডগায় তুলে সন্তর্পণে মুখে ঢুকিয়ে দিচ্ছেন, যেন এই মোটা ভাত ফুরিয়ে গেলে আর পাওয়া যাবে না—আল্লার বড়ো অমূল্য ধন। সানকির ভাতটা শেষ, করতেই দেখলেন, জোটন আর এক সানকি ভাত এনে সামনে রেখেছে। তিনি সে ভাতটাও পরিপাটি করে শেষ করলেন। এবং ভাতের অপেক্ষায় ফের বসে থাকলেন। সহসা আবিষ্কারের ভঙ্গিতে তিনি মাদুরের এবং সানকির সংলগ্ন ভাতটিও আঙুলের চাপে তুলে মুখে দিয়ে বসে থাকলেন। নামাজের ভঙ্গিতে এই বসে থাকা ভাবটুকু ফকিরসাবের বড়ো আরামদায়ক। এইসব জোটন ঘরের ভিতর থেকে লক্ষ করে সরমে মরে যাচ্ছে। সে হাঁড়ির ভিতর হাত দিল। শেষ দুমুঠো ভাত সানকিতে তুলে শেষ ভর্তাটুকু তার কিনারে রেখে মাদুরের উপর রেখে দিল। ফকিরসাব বললেন, বস হৈব। ইবারে আপনে গিয়া খান।
