জোটন মুখ ঘুরিয়ে দেখল ঈসম আসছে। সে কাঁচুমাচু হয়ে বলল, না ঈসম ভাই, আমি এহানে কিছু করতাছি না।
-তুমি আসমান দ্যাখতাছ। যা বাড়ি যা। কথা বাড়াইস না।
সুতরাং বাড়ি উঠে যাওয়ার মতো করেই জোটন হাঁটতে থাকল, কিন্তু যেই ঈসম মসজিদের কুয়াতে জল ভোলার জন্য বালতি নামাল–জোটন টুক করে আলের পরে বসে ধানগাছের ছায়ায় নিজেকে ঢেকে ফেলল, তারপর হামাগুড়ি দিয়ে যেতে যেতে দেখল এক জায়গায় হাত লেগে মাটি সরে গেছে এবং সাদা গোল গোল ডিম বের হয়ে পড়ল। মুখ উজ্জ্বল করে জোটন এবার উঠে দাঁড়াল। ইমান এবং মুশকিলাশানের লম্ফটাকে উষ্ণ করছে। দূরে দূরে সব ধান কাটা হচ্ছে। ধানের আঁটি বাঁধছে মুনিষেরা, ওরা গাজির গীত গাইছে। দূরে দূরে গানের স্বর তরঙ্গ, নরেন দাসের বিধবা বোন মালতি এবং গত রাতের নিস্ফল প্রতীক্ষা জোটনকে নিদারুণ তীব্র তীক্ষ্ণ যন্ত্রণায় কাতর করছে। মালতির বিয়ে হবে না, বাকি জীবন গতরের কোনো মাশুল দেবে না—আল্লা নারাজ হবে—এই গতর মাটির মতে, পতিত ফেলে রাখলে গুনাহ। জোটন এইজন্যই মালতির জীবনকে, ধর্মকে না-হক কাফেরের মতো ভাববার ইচ্ছায় শরীরের জড়তা কাটাতে গিয়ে দেখল, বোন্নাগাছের নীচে মালতি দাঁড়িয়ে আছে—চুপ এবং নিঃসঙ্গ। ওর শরীরের সাদা থান ভোরের হাওয়ায় উড়ছে। জোটন মালতিকে দেখে তাড়াতাড়ি সব কটা ডিম ভিজা জামার ভিতর থেকে তুলে আঁচলে বেঁধে ফেলল।
অন্যদিন হলে জোটন মালতির সঙ্গে অন্তত কিছু কথা বলত। কিন্তু আজ মালতির এই নিঃসঙ্গতা যথার্থই ওকে পীড়িত করছে। একটা অহেতুক অপরাধ বোধে মালতির সঙ্গে যে কোনো কথাই বলতে পারল না। জোটন এই পথ ধরেই গেল—অপরিচিতের মতো তামুকের খেতে উঠে গেল। দেখল, মালতি বোন্নাগাছ পার হয়ে লটকনগাছের নীচ দিয়ে পুকুরপাড়ে দাঁড়াল এবং হাঁসগুলোকে জলে সাঁতার কাটতে দেখে কেমন আনমনা হয়ে গেল। জোটন আর দাঁড়াল না। এখানে দাঁড়ালে কষ্টটা বাড়বে। তারপর শালুক খেয়ে শরীরে শক্তি পাচ্ছে না। সে তাড়াতাড়ি নরেন দাসের বাড়ি পার হয়ে গ্রামের রাস্তায় হাঁটতে থাকল। বকুলগাছটা অতিক্রম করে ঠাকুরবাড়ির সুপারি বাগান। সে সন্তর্পণে বাগানে ঢুকে গাছতলায় সুপারি খুঁজতে থাকল। জোটন সুপারিকে গুয়া বলে। সে খুঁজে খুঁজে কোথাও যখন একটাও সুপারি পেল না, সে গাছের মাথার দিকে তাকাল এবং প্রার্থনার ভঙ্গিতে বলল, আল্লা একটা গুয়া দ্যা। সব গাছগুলোর মাথায় সুপারি ঘন। এবং হলুদ রঙের। হলুদ রঙের এই সুপারির খোসা ছাড়িয়ে একটা শাঁস মুখে দেবার বড়ো শখ জোটনের। সে দেখল একটা কাঠঠোকরা পাখি এ-গা, ও-গাছ। করছে। আহারে আল্লারে একটা দ্য না রে। তখনই বুড়ো ঠাকুরুনের গলা শুনতে পেল সে। জোটন চুপচাপ বাগানের পাশে ঘন চড়ইগাছের জঙ্গলে নিজেকে লুকিয়ে ফেলল। জোটন অনেকক্ষণ এই ঝোপের ভিতর পাখিটার বদান্যতার জন্য বসে থাকল। পাখিটা উড়ছে, জোটন ঝোপের ফাঁক দিয়ে দেখতে দেখতে উত্তেজিত হতে থাকল। পাখিটা সুপারির উপর এবার ঘন হয়ে বসল, দুটো ঠোকর মারল এবং সঙ্গে সঙ্গে তিন-চারটে সুপারি গাছের গোড়ায় ছড়িয়ে পড়ল—য্যান মাণিক্য। যেন জোটনের সমস্ত দিনের ইচ্ছা এখন এই গাছটার ছায়ায় রূপ পাচ্ছে। জোটন চারপাশটা ভালো করে দেখল। পুকুরঘাটে বুড়ো ঠাকুরুন স্নান করছে। সে সব দেখছে, অথচ তাকে কেউ দেখতে পেল না। সে তাড়াতাড়ি গাছটার নীচে ছুটে গেল। সুপারি তিনটে আঁচলে বেঁধে সে হাঁটছে। সে বৈঠকখানা পার হয়ে ঠাকুরবাড়ির ভিতরে ঢুকে গেল। ডাক দিল-বড়মামি আছেন নাকি? বলতে বলতে সে পাছ দুয়ারে ঢুকে অসুজঘরের সামনে দাঁড়াল। বলল, ধনমামি—একবার মাণিক রে দ্যাখান। মাণিকের লাইগ্যা কাসিমের ডিম আনছি। বড়মামিকে দেখে বলল, কাসিমের ডিম রাইখ্যা এক টুকরা চাইল দ্যান। চাল পেলে বলল, দুইডা পান নিমু বড়মামি।
—নে গা। গাছতলায় মেলা পান পৈড়া আছে।
জোটন জালগুলো আঁচলে বাঁধল। এবং বড়োঘরের পিছনে ঢুকে আলকুশি লতার কাঁটাঝোপ পার হয়ে একটা শ্যাওড়া গাছের নীচে দাঁড়াল। পানের লতা গাছটাকে জড়িয়ে আছে, সে দু-হাতে যতটা পারল পান কুড়িয়ে নিল, ছিঁড়ে নিল। সে বাড়ির উপর দিয়ে গেল না। সে আলকুশি লতার ঝোপ ভেঙে মাঠে নেমে গেল। জল-কাদা ভেঙে ফের পূবের বাড়ির পুকুরপাড় ধরে ধানখেতের আলে উঠে যাবার সময় দেখল মালতি আকাশ দেখছে। জোটন এবার মালতিকে ফেলে চলে যেতে পারল না। সে একটু হেঁটে এসে মালতির পাশে চুপ করে বসল। ডাকল— মালতি।
মালতি কথা বলল না। মালতি কাঁদল। জোটন মালতির মুখ দেখতে পাচ্ছে না অথচ বুঝল মালতি চোখের জল ফেলছে। জোটন ফের ডাকল, মালতি কান্দিস না। কাইন্দা কী করবি! সব নসিব রে মালতি।
মালতির শরীরে ব্লাউজ নেই। মালতির সন্তান নেই। যে সালে বিলের জলে কুমির আটকা পড়ল সে সালেই মালতির বিয়ে হল। নরেন দাস বিয়েতে খরচ পত্তর করেছিল। সুতরাং চার সাল হবে মালতি গ্রাম ছেড়ে শহরে গিয়েছিল। ফুটফুটে রাজপুত্রের মতো বর, ছোটোখাট মানুষের চোখদুটো যেন জোটন ইচ্ছা করলে এখনো স্মরণ করতে পারে। বিয়েতে জোটন তিনদিন ধরে গলা পর্যন্ত খেয়েছিল, ঢেকুর তুললে এখনো যেন সে-গন্ধ উঠে আসবে। নরেন দাস নর্সিন্দি থেকে চারটে ডেলাইট এনে ঘরে-বাইরে সকল স্থানে জ্বেলে আলোয় আলোময় করে, নরেন দাস চোখের জল ফেলতে ফেলতে বলেছিল বরের হাত ধরে, মালতির মা নাই, বাপ নাই, তুমি অর সব। নরেন দাস অনেকক্ষণ চৌকিতে পড়ে কেঁদেছিল। সকলে চলে গেল, বাড়ি ফাঁকা ফাঁকা ঠেকল—তবু নরেন দাস দুদিন তক্তপোশ থেকে উঠল না। ছোটো বোনটা এ বাড়িতে যেন প্রজাপতির মতো ছিল। তবু সারাদিন উড়ত, উড়ত। গাছের ছায়ায়, পুকুরের পাড়ে পাড়ে, লটকন গাছের ডালে ডালে মেয়েটা যেন নীলকণ্ঠ পাখি খুঁজে বেড়াত।
