মাশুল
সম্পর্কে জোটন বিবি আবেদালীর দিদি হয়। কিছুদিন পূর্বে পর্যন্ত জোটন বিবি ছিল, এখন বেওয়া হয়েছে। জোটনের সব সমেত তিনবার নিকাহ। তালাক অথবা স্বামীর মৃত্যুর পর জোটন প্রতিবার আবেদালীর কাছে চলে আসে। আবেদালী তখন লতা এবং খড়ের সাহায্যে উত্তর দুয়ারী ছোট্ট খুপরি ঘরটা তুলে দেয়-এই পর্যন্ত আবেদালীর সঙ্গে সম্পর্ক। তারপর কিছুদিন ধরে জোটনের জীবন-সংগ্রাম, ধান ভেনে দেওয়া, চিড়া কুটে দেওয়া পাড়াপ্রতিবেশীদের এবং যখন বর্ষাকাল শেষ হয়, যখন হিন্দু গৃহস্থ ঘরে পূজা-পার্বণ শেষ, তখন জোটন গ্রামের অনেক দুঃখী ইমানদারদের সঙ্গে ভাতের হাঁড়িটা ধুয়ে-পাকলে জলে নেমে পড়ে, এবং সকল পাটখেত চষে বেড়াতে থাকে শালুকের জন্য। শালুক শেষ হলে আবেদালীর কাছে নালিশ—দ্যাশে কি পুরুষমানুষ নাইরে আবেদালী?
সেই জোটন সোলার ছোট্ট ঝাঁপটা টেনে ঘর থেকে মুখ বার করল। এখনো ভোর হয়নি, সারারাত জোটনের চোখে ঘুম নেই। মসজিদে সামুর বাপ আজান দিচ্ছে, জোটন ঘরে বসে অন্ধকারে ছেড়া হোগলা এবং ছেড়া কাঁথাটা ভাঁজ করে এক পাশে রেখে দিল। অন্ধকার কাটছে না, সুতরাং ঘরের আসবাবপত্র অস্পষ্ট শিকাতে দুটো হাঁড়ি, দুটো সরা—দুদিন থেকে জোটনের ভাত নেই, দুদিন ধরে জোটন শালুক সিদ্ধ করে খাচ্ছে। জোটন সরা তুলে হাত দিল এবং অনুভব করতে পারল কিছু শালুক সিদ্ধ এখনো হাঁড়িতে আছে। সে অন্ধকারে বসেই শালুকগুলো খেতে থাকল। শুকনো বলে গলায় আটকাচ্ছে—একটু জল খেল জোটন। আবার দরজা ফাঁক করে যখন আকাশ দেখল—আকাশ পরিষ্কার, মোরগেরাও ডাকছে জোটন দরজা খুলে বাইরে এসে দাঁড়াল।
মসজিদের ওপাশটায় সূর্য উঠছে। আবেদালী বদনা হাতে মাঠ থেকে উঠে এল। আবেদালীর বিবি জ্বালালী পাতা দিয়ে উঠোনের এক কোণায় ভাত রান্না করছে। আবেদালীকে দাওয়ায় বসতে দেখে জোটন বলল, কীরে, মানুষটা ত কাইলয় আইল না।
-না আইলে আমি কি করমু! আবেদালী জোটনের এই ইচ্ছায় বিরক্ত। তিন তিনবারের পর ফের নিকাহের শখ।
দুদিন না খেয়ে জোটনও ভয়ানক হয়ে উঠেছে। সে আবেদালীকে উদ্দেশ্য করে বলল, দন্দি যাওনের সময় মানুষটার খোঁজ কৈরা যাবি। মানুষটা বাইচা আছে না মরছে, কবি আইয়া।
-কমু গ কমু! আবেদালী দেখল জোটনের মুখ ভয়ানক শুকনো। দুদিন না খেতে পেয়ে জোটনের চোখ কোটরাগত।–তুই দুফরে আমার ঘরে খাইস। আবেদালী এবার জ্বালালীর মুখটা দেখল। সূর্য উঠছে বলে রোদের রং জ্বালালীর খড়খড়ে মুখটা আরও খড়খড়ে করে দিচ্ছে এবং আবেদালীর এমত কথায় জ্বালালীর মুখটা ফোটকা মাছের মতো ফুলতে থাকল।–আরে আরে করতাছস কী! তর গাল যে ফাইট্টা যাইব।
জোটন বুঝতে পেরে বলল, নারে থাউক। আমার খাওনের লাগে কি আছে।
আবেদালী বুঝল জোটন খাবে না। সে দেখল, জোটন উঠোন থেকে নেমে যাচ্ছে। জোটন রাস্তায় নেমে গেল এবং সড়ক ধরে হাঁটল না। যেখানে এখনো ধানখেতে জল আছে অথবা খেতের আল জাগছে সেইসব পথ ধরে কি যেন খুঁজতে খুঁজতে চলছে।
জোটন এইসব নরম মাটির আশ্রয়ে কচ্ছপের ডিম খুঁজছে। এই সময়ে কচ্ছপেরা ডিম পাড়বে মাটির আলে। জোটন এ-সময়ে এসব মাটির আশ্রয় থেকে ডিম বের করে পশ্চিমপাড়ায় উঠে যাবে ভাবল এবং ডিমগুলি দিয়ে বলবে, আমারে এক টুকরি চাইল দিয়েন। সে এক দু করে বিলেন জমির অনেক আল ভাঙতে থাকল। সূর্য বিশ্বাসপাড়ার ফাঁক দিয়ে অনেক উপরে উঠে যাচ্ছে। ধানগাছের শিশির, ঘাসের শিশির, কলাই খেতের শিশির সব বিন্দুবৎ হয়ে পড়ছে এবং ইতস্তত রোদের সঙ্গে মিশে যাচ্ছে। মানুষটা গতকাল এল না, সে পুঁটলি বেঁধে বসে ছিল, মৌলভি সাবকে বলা ছিল, সাক্ষী ঠিক ছিল—অথচ মানুষটা এল না। মুশকিলাশান নিয়ে মানুষটা উঠোনে ডেকেছিল একদিন, এটা আবেদালীর বাড়ি না? আবেদালী, জ্বালালী এবং সকলে ফোঁটা নিয়েছিল—জোটও উঠেছিল, ফোঁটা নিয়েছিল—পীরের দরগায় লোকটা থাকে, উঁচু, লম্বা, গোটা গোটা চোখ-নাভির নীচে সাদা দাড়ি নেমে গেছে, গায়ে শতছিন্ন, মাথায় ফেট্টি এবং গলায় বিচিত্র রকমের মালা-তাবিজ। জোটন ফকির মানুষটার মহববতের জন্য প্রথম দর্শনে বিস্মিত এবং শীতের নরম রোদ যেন তাকে গভীর রাত পর্যন্ত আচ্ছন্ন করে রেখেছিল সেদিন।
জোটন আলের ধারে ধারে তীক্ষ্ণ নজর রেখে হাঁটছে। কচ্ছপের ডিম এখানে নেই, সে হাঁটতে থাকল। সে ইতস্তত তাকাল এবং কয়েক গুচ্ছ ধানের ছড়া কাপড়ের নীচে লুকিয়ে ফেলল। ওর পাশ দিয়ে কামলারা অন্য জমিতে উঠে যাচ্ছে–জোটন বসে পড়ল—যেন সে যথার্থই কচ্ছপের ডিম সংগ্রহ করছে। সে উঠছে। কামলারা অন্য জমিতে এখন ধান কাটছে। জোটন ধান কাটছে না। হাতের ধারালো শামুকটা সে পেটের নীচে এঁজে রেখেছে। জোটন অন্য জমিতে কামলাগুলোকে দেখার জন্য গোড়ালিতে ভর করে উঁকি দিল—জমিটা কার স্থির করার ইচ্ছায়। দূরের গাইগুলোকে জলে নেমে যেতে দেখল—মানুষটা এল না, সেই মুশকিলাশানের মানুষটা। তেরোটি সন্তানের জননী জোটন আবার মা হবার জন্য এই আলে দাঁড়িয়ে কেমন ছটফট করতে থাকল। চল্লিশ বছরের রমণী জোটন খোদাকে যেন এই ধানের জমিতে খুঁজছে—খোদার মাশুল উঠছে না গতর থেকে, এমতভাব এখন।
দুদিন পেটে ভাত নেই—আফশোস। দুদিন হাজারদির বিলে গ্রামের অন্য অনেক দুঃখী ইমানদারদের সঙ্গে শালুক তুলেছে, দুঃখী হলেই ইমানদার হবে, খোদাকে স্মরণ করবে—এমনও একটা বিশ্বাস আছে জোটনের। এই যে এখন জোটন শামুকের ধারালো মুখটা দিয়ে কট করে আর একটা ধানের ছড়া কাটল এবং কোঁচড়ে লুকিয়ে ফেলল—যেন পেটের খিদে ভয়ানক দুঃসহ, খোদার কাছে নিজের গোনাগারের জন্য জোটন মোনাজাত করল—হায়রে খোদা, পেটের জ্বালায়, গতরের জ্বালায় সব হয়। সুতরাং জমির মালিককে যেন বলার ইচ্ছা, ভয় করবার কিছু নেই, আর কিছু না হোক জোটনের ইমান আছে। তোমার শক্ত ধানের ছড়া কাটছি না, আলের উপর যেসব ছড়া নুয়ে আছে শামুকের ধারালো মুখে তাই আশ্রয় পাচ্ছে। হাসিমের বাপ নয়াপাড়ার নিমগাছ অতিক্রম করলে জোটন কট করে আরো একটা ধানের ছড়া কেটে কোঁচড়ে লুকাল। এবং এ-সময় মালতির কথা মনে হল। নরেন দাসের ছোটোবোন মালতি বিধবা হয়ে ঘরে ফিরেছে। মালতির দুঃখবোধে জোটন পুবের বাড়ির বোন্নাগাছটার ফাঁক দিয়ে নরেন দাসের তাঁতঘর দেখল। তাঁতের শব্দ শুনতে পাচ্ছে-মাকুর শব্দ এবং চরকার শব্দ। জোটন কট করে অন্য একটা ধানের ছড়া কাটতেই পিছন থেকে কে যেন চীৎকার করে উঠল—এই জুটি, মাথার খুলি ভাইঙ্গা দিনু।
