সুতরাং মানিকলালের কী যে এখন করণীয়—সে তার কিছুই বুঝতে পারছে না! সে ঘেমে গেছে ভীষণ। ওর শ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছে। এই অন্ধকারে মেয়েটা অযথা ভয় দেখাতে শুরু করল। এখানে পালিয়ে এসেও নিস্তার নেই। সে আবার কথা আরম্ভ করে দিল।তুই আরতি মরে গিয়ে ভয় দেখাচ্ছিস কেন। সকালটা হতে দে। আমার মালিক রাতে রাতে খবর পেয়ে যাবে। মালিক এলে তুই আমি এক সঙ্গে কাল সকালে শহরে চলে যাব।
কোনো জবাব পেল না বলে বলল, তুই তো বলেছিলি একজন পুলিশের বাবু আসত তোর মার কাছে। বর্ডার পার করে দেব বলত।
এমন বীভৎস অবস্থায়ও ওর মুখ থেকে সব খিস্তি শব্দ বের হয়ে যাচ্ছে। সে নিজের ওপর রাগ করে বসে থাকল। এখন আর যেন মেয়েটা জ্বালাচ্ছে না। বেশ চুপচাপ আছে। সুতরাং আবার সেই অনর্থক ছবি চোখের উপর। সেদিন মানিকলাল কী কারণে অসময়ে বাড়ি ফিরেছিল। ঘরে শোভা নেই। নদীর পারে শোভা চুপচাপ বসে আছে। মনে হচ্ছিল দূরে কে যেন বালির চরে হেঁটে যাচ্ছে। এবং ও-পারের ইস্টিশানে বাজনা বাজছে। সে বলল তুই এখানে!
আমি ঘরে যামু না।
তোর এমন হয় কেন। মাঝে মাঝে তুই নদীর পাড়ে এসে বসে থাকিস কেন?
শোভার চোখে জল পড়ত। বাবা-মা তাকে বনবাসে রেখে চলে গেছে। সুন্দর এক যুবক, বয়স তখন তার বিশ-বাইশ হবে-কলেজে পড়ত আলম, খুব ধীরে ধীরে কথা বলত, বড়ো বড়ো চোখে কলেজে যাবার পথে ওদের আমলকি গাছটার নীচে এলেই খুঁজত শোভাকে, শোভা আতাবেড়ার পাশ থেকে বলত, আলম আমি আমলকি গাছের নীচে নাই। ঘরে আছি। জানালায় বইসা আছি। ওর মুখ মনে হলেই শোভা বড়ো আকুল হত। আলমের সঙ্গে একটা ভালোবাসার ঘটনা ঘটে যাচ্ছে—ভয়ে মা-বাবা শোভাকে এ-পারে এসে রেখে গেল। আত্মীয় মানুষটির মজা লুটে খাবার লোভ বড়ো বেশি। তাকে লুটে খেতে এলেই সে তার বাবা-মাকে চিঠি দিত। কিন্তু চিঠির কোনো জবাব আসত না। সেদিন শোভার কি যে হয়েছিল—সে জীবনের সব কথা চিৎকার করে বলতে গিয়ে হাউ হাউ করে কেঁদেছিল—আর শালা সে ত ড্রাইভার, কোথায় সে শোভাকে ভালোবাসায় জয় করবে, তা না, সে পাছায় লাথি মেরে চিৎকার করে উঠল, মাগি তুই এত বজ্জাত রাস্তায় পড়ে থাকতিস ঘরে নিয়ে এলাম। একটা বাচ্চা বিয়োতে পারলি না!
সে রাতেই শোভা পালিয়েছিল। বর্ডার পার হলেই পদ্মার পার, নদীর জল, ইলিশ মাছ, শালুক ফুল। সুখ, সুখ, অন্তহীন সুখ। তার বউটা বাংলাদেশের সীমানা পার হবার জন্য পাগলের মতো নিরুদ্দেশে চলে গেল।
মানিকালের কিছুই ভালো লাগছিল না। সে দেয়াল বেয়ে কেন জানি উপরের দিকে উঠে যাচ্ছে। কোথায় যেন মানিকলাল টের পেয়েছে বেঁচে থাকার মানে নেই। নাকি মানিকলের কাছে এই ভয়াবহ রাতের চেয়ে মৃত্যু বেশি কাম্য। সে ক্রমে দেয়াল ধরে উপরে উঠে যাচ্ছে। সে যেন তার এই লক-আপে পালানো বউকে খুঁজছে এখন।
আরতির মুখে এখন দুটো মশা বসেছে। থেঁতলানো মুখ থেকে রক্ত শুষে খাবে বলে হুল ফোঁটাচ্ছে। সাদা কাপড়ে বাঁধা তবু দু-বার পাছা উঁচু করে ঠোঁট থেকে রস চুষতে গিয়ে দেখল—একেবারে ঠাণ্ডা। শক্ত। মশা দুটো উড়ে মাঠে নেমে গেল। সাদা জ্যোৎস্না মাঠ। মশা দুটো সাদা জ্যোৎস্নায় উড়ে বেড়াতে থাকল।
আরতি তার রক্ত-মাংসের ভিতরই পড়ে আছে। দেখলে মনে হয় সাদা কাপড়ের একটা পুঁটলি। সকাল হলে মানিকলালের সঙ্গে মর্গে যাবে। কারণ মানিকলাল রাতের আঁধারে নানারকমের ভয়ংকর সব ছবি ফুটে উঠতে দেখেছিল, চারপাশের নানারকমের কিম্ভুতকিমাকার আলোর মায়াজাল, মনে হয়েছিল তার সবই অলৌকিক, জীবনযাপনে কোনো আর মানে খুঁজে পাওয়া যায় না—ঠিক শালা হিন্দি ছবির মতো, মাথামুণ্ডু যার কিছু ঠিক নেই, প্রেম, ভালোবাসা, রাহাজানি, খুনের দৃশ্য, মোটর রেস এবং নীল পতাকা নিয়ে ঘোড়া যাচ্ছে। একজন সুন্দর মতো মেয়ে পাশে পাশে গান গেয়ে চলেছে। মানিকলাল কখনো ঘোড়সোয়ারী পুরুষ, আবার কখনও ঘোড়ার পায়ে ওর ঠ্যাং রঞ্জুতে বাঁধা। ঘোড়াটা মাঠের উপর দিয়ে ছুটছে। অথবা যুবতীরা ওর চারপাশে নাচছিল—কত হাজার লক্ষ যুবতী, যাদের কোনো স্পষ্ট মুখ নেই, অবয়ব নেই—গাজির গিদের চাঁদপাতার মতো চ্যাপটা নাক, চোখ মুখ সমতল, হাত পা শরীর কাগজের মতো ফিনফিনে পাতলা–তারা ওর চারপাশে নাচছিল—যেন তারা প্রত্যেকেই এক একজন শোভা। আর কেন জানি মনে হল তার ফসলের খেতে তখন পাখি উড়ছে। বর্ডার পার হবে বলে শোভা বসে আছে। কারা নিয়ে এল সেই যুবতীকে বর্ডার পার করে দেবে বলে। অথচ ফুসলে তাকে এপারেই রেখে দিল—কোথায় আর যাবি? বর্ডার পার হলে পদ্মার পাড়, ইলিশের ঝাঁক আর খুঁজে পাবি না। এই ত আছিস বেশ। ক্যাম্পের ভাত বেঁধে দিবি, মুরকি খাবি। মাঝে মাঝে ঠ্যাং তুলে চিৎপাত হয়ে শুয়ে থাকবি। আমরা পুলিশের বাবুরা তোকে পদ্মার পার, ইলিশের ঝাঁক, নদীর জল সময় হলেই দেখিয়ে আনব।
মানিকলাল এইসব দৃশ্য দেখতে দেখতে কেমন পাগল হয়ে গেছে। সারাক্ষণ। গারদের ভিতর সে পাগলের মতো অন্ধকারে ছুটোছুটি করেছে। বনবাসী দেবী তাকে হাত ধরে একসময় কোথায় যেন তুলে নিয়ে এল। একটা ডালে সজীব নীল রঙের লতা—সেই লতার পোশাক তাকে পরতে বলল। এবারে তুই নীচে ঝাঁপ দিবি। দেখবি সাধের জীবন হরেক রকম বাঁশি বাজায়।
বনবাসী দেবীর কথামতো মানিকলাল নীল রঙের লতার পোশাক পরে বড়ো প্ল্যাটফরমে শেষ ট্রেন ছেড়ে দেবার বাঁশি বাজাল।
