তা তোর নাম?
আমার নাম আরতি।
তোর মার নাম।
আরতি হাসত তখন। কিছুতেই সে মায়ের নাম বলত না। মায়ের নাম নিতে নেই। নিলে পাপ হয়। সে অন্য কথা বলত, দে ড্রাইভারসাব দুটো পয়সা দে।
কী করবি পয়সা দিয়ে?
মুরকি খাব।
আরতি দু-রকমের ভাষায়ই কথা বলত। সে যখন আর ড্রাইভারসাবের মন গলাতে পারত না, তখন বলত, আমারে নিয়া যাইবা পদ্মার পারে। ঠিক তখন মানিকলের শোভার কথা মনে হত। সে স্থির থাকতে পারত না। দুটো পয়সা দিয়ে বলত, মুরকি কিনে সবাই মিলে খাবি। আরতির সঙ্গে আরও তিন-চারটি রাস্তায় ঘুরে বেড়ানো, বাপে খেদানো, মায়ে তাড়ানো বাচ্চা ঘুরে বেড়াত। মানিকলাল না বললেও সে কোনোদিন একা কিছু কিনে খায় না। চেয়েচিন্তে যা পায় সকলে মিলে গাছের নীচে বসে মাঠের ফসল দেখতে দেখতে ওরা আহার করে।
ড্রাইভারসাব কথাটা শুনলেই মানিকলাল ভিতরে গর্ব অনুভব করত। সে তখন বলত, তোর মুখে আমার বউ-এর ছাপ আছে। মানিকলাল মনে মনে এই মেয়েকে তা দিয়ে বড়ো করার তালে ছিল।
আরতি এই ন-দশ বছরে বউ কথাটার মানে ধরে ফেলেছে।
মানিকলাল হাসতে হাসতে বলত কোনোদিন, তুই আমার বউ হবি। আমার বাড়ি নিয়ে যাব তোকে।
আরতি কৃত্রিম রাগে ওর চুল টেনে ধরত।
তবে আর পয়সা পাবি না।
রঙ্গ-রসিকতা এমন হত অনেক দিন। কেবল মেয়েটার কাছে মায়ের নাম জানতে পারেনি। বাপের নাম বলতে পারে না। জারজ সন্তান, বাপের নাম না জানলে পাপ নেই।
মানিকলাল বলত, বড়ো হলে তুই যা হবি না মাইরি!
আরতি লজ্জায় মুখ নীচু করে রাখত। তারপর ফিক করে হেসে দিত।-তুমি যে কি বল ড্রাইভারসাব!
আরতি এবং আরও দু-তিনজন বালক-বালিকা এ-গঞ্জে এ-ভাবে ভিক্ষা করে। কখনো জমিতে গোরু-বাছুর তাড়িয়ে বেড়ায়, কখনও গৃহস্থের ফসল পাহারা দিয়ে জীবন অতিবাহিত করে। আর মানিকলের বাসটা দূর থেকে দেখলেই মাঠের ওপর দিয়ে ছুটতে আরম্ভ করে। এই গঞ্জে যতক্ষণ মানিকলাল থাকবে ততক্ষণ নানারকম হাসি-মশকরাতে, অথবা দু-পয়সা চার-পয়সার মুড়ি-মুড়কিতে সময়টা কেটে যায় তাদের। গাড়ির জানালায় বসে থাকে কোনো কোনো দিন। গাড়িটা যে মানিকলের নয়। গাড়িটা আরতি এবং এই তিন বালক-বালিকার। ওরা এই গাড়ির উপরে নীচে লুকোচুরি খেলে বেড়ায়। মানিকলাল গতকাল বলেছিল এই তোরা গেছিস ত! যা যা। সে গাড়ির হর্ন বাজাল। তারপর চালাতে গিয়ে দেখল চাকাটা আরতির পেটে মাথায়। শালা এতদিন ওর দিকে তাকাবার কেউ ছিল না। পেটে চাকা উঠে যেতেই গঞ্জের সব লোকদের হুঁশ এসেছে—এক মহাপ্রাণ, এই বয়স আর কত, নয় দশ, কি তার চেয়ে এক দুই এদিক-ওদিক।
সে টপকে ও-পাশের ঘরটাতে যাবার জন্য ছটফট করতে থাকল। সে তো মৃত। হাত দিলে টের পাবে না। মেয়েটার মুখ দেখতে ওর পালিয়ে-যাওয়া বউয়ের মতো। সে বলত এই আরতি তোর মা আর সত্যি ফিরে এল না।
না ড্রাইভারসাব।
আরতি তারপর গল্প করত। কারণ বাসটা সেখানে থামত বিশ মিনিটের মতো। মানিকলালের কথা বলার লোকের অভাব। সে চা খেত একটা চালাঘরে—বিস্কুট কিনে দিত এবং এই করে সময়টা পার হয়ে যেত এবং একদিন সে বলেছিল, তোর মাকে আর বনের ভিতর খুঁজতে গেলি না?
আরতির চোখ মুখ বড়ো বিষণ্ণ দেখতে হত তখন। সে যেন কিছুই বলতে চায় না, বললে এমন শোনায়, সেই ফসলের মাঠ পার হয়ে গেলে বন, বনে কত রকমের লতাপাতা, ফুল ফল, পাখি এবং গাছপালা। বনের ভিতর সে একবার মায়ের সঙ্গে ঢুকে গিয়েছিল। মা বলত, সে তাদের নিয়ে যাবে পদ্মার পারে। সেখানে ওরা পেট ভরে খেতে পাবে। বনটা পার হলেই পুলিশের ক্যাম্প। তারপর সীমানা চলে গেছে। মা তাদের নিয়ে সীমানার কাঁটাতারের বেড়ার গায়ে বসে থাকত। কতদিন কত বিকেলে ওরা বসে বসে দেখত, ও-পার থেকে কত পাখি এ-পারে আসছে। কত লাল নীল রঙের পাখি ও-পারে চলে যাচ্ছে। মাকে দেখলেই মনে হত, মা যেন ও-পারে এসে কী ফেলে চলে এসেছে।
মানিকলের মনে হল, ও-পাশে মেয়েটা এখন প্রাণ পেয়ে গেছে। প্রাণ পেয়ে পাখি পুবে যায় পশ্চিমে যায় বলে ঘুরে ফিরে নাচছে। এবং কাচের চুড়িতে সেই ঝুমঝুম আওয়াজ। চোখ ভারী ভারী। যৌবনের ঢল নামছে। আরতি একেবারে শোভার মতো হয়ে গেছে। পদ্মার পারে ঘর। দেশের মা-বাবা এদেশের আত্মীয়স্বজনের কাছে শোভাকে রেখে গেল। আইবুড়ো মেয়েকে ক্যাম্পের জীবনে ঠেলে ফেলে দিয়ে চলে গেল। শোভা তার ধূর্ত আত্মীয়ের পাল্লায় পড়ে শেষ পর্যন্ত রাস্তায় নেমে এল। আর তখনই সে যেন দেখল ফুসফাস মেয়েটা মশা হয়ে ওর ঘরে উড়ে চলে এসেছে। তারপর সাদা কাপড়ে নিজেকে মুড়ে মর্গের মতো মমি হয়ে আছে পায়ের কাছে।
মানিকলাল দ্রুত পালাতে চাইল। সে গরাদের উপর হুমড়ি খেয়ে পড়ল। সাদা কাপড়ে মোড়া মাংসের ঢেলাটা থপ থপ করে হেঁটে গেল ওর পাশে। সে ছুটে গিয়ে দক্ষিণের দেয়ালে ঠেস দিয়ে দাঁড়াল। আবার আরতি থপ থপ করে হেঁটে আসছে। যেন আরতির মাথামুণ্ডু কিছু নেই, একটা বালির বস্তা হয়ে গেছে। মানিকলাল ভয়ে চিৎকার করে উঠবে এমন সময় মনে হল ওটা আবার মাছি হয়ে উড়ে ও-পাশে চলে গেছে।
মানিকলাল ভয়ে ক্রমে ঠাণ্ডা মেরে যাচ্ছে। তাকে খুব কাতর দেখাচ্ছিল। ওর ভীষণ জলতেষ্টা পাচ্ছে। সে অন্ধকারে ঘটিটা হাতড়াতে থাকল। জল নেই। ছুটোছুটিতে জলের ঘটিটা উলটে গেছে। সে ভাবল, জলের জন্য চিৎকার করবে, কিন্তু মনে হল ওর স্বর বসে গেছে। সে কেমন বোবার মতো অন্ধকারে একটা বাছুর হয়ে গেল।
