মনে হল এই অন্ধকারে কেউ ফিস ফিস করে কথা বলছে। সে কান খাড়া করে রাখল। দেয়ালের পিছনে কি কোনো গাছ আছে, এই ফুলটুলের গাছ। গাছে পাখির বাসা। পাখিরা নড়ছে। সে খচখচ শব্দ শুনে দেয়ালে কান পেতে রাখল। কেউ যেন বলছে, নদীর চর, বালিহাঁস, কুমিরের চোখ ড্রাইভারসাব এনে দিতে পার? মা আমার বালিহাঁসের ডিম কুড়াতে যাচ্ছে বলে বনের ভেতর ঢুকে যেত। আর ফিরতে চাইত না। সেই বন পার হলে বাংলাদেশের সীমানা। মা সেখানে গিয়ে বসে থাকত, মা কেন যে এত কাঁদত ড্রাইভারসাব!
তোমার মা কোথায়?
জানি না। বালিহাঁসের ডিম আনবে বলে সেই যে বনে ঢুকে গেল একবার আর এল না। অনেকদিন ওর বলার ইচ্ছা হয়েছে—তোর মায়ের মুখ কি আমার বউয়ের মতো দেখতে ছিল!
মেয়েটা যেন বলতে চাইত, সংসারে কি এক রকমের মুখ থাকতে নেই।
সে তখন চুপচাপ কি ভাবত। বাসে প্যাসেঞ্জার উঠবে এই প্রতীক্ষায় সে বাস থামিয়ে গঞ্জের মতো জায়গাটায় বসে থাকত। ওদের সঙ্গে সে গল্পে মেতে উঠত— তা তোরা পথেঘাটে থাকিস, রাতে রাতে বড়ো হয়ে যাবি। আমি যেমন শোভাকে ট্রাকে তুলে নিয়ে এসেছিলাম, তোদেরও কেউ না কেউ তুলে নিয়ে যাবে।
হ্যাঁ বয়ে গেছে মানুষের।
মানিকাল স্পষ্ট এমন কথা শুনল। ও-পাশের লক-আপে মেয়েটা যেন নাকে নথ পরে ঘোমটা টেনে বসে আছে। পাল্কি এলেই উঠে পড়বে। সে বসে বসে মানিকলালের সঙ্গে মশকরা করছে।
আমার সঙ্গে যাবি তুই?
ড্রাইভারসাব কি যে বলে!
তোকে বালিহাঁস, কুমিরের চোখ এনে দেব। তুই পাখি ওড়াতে গিয়ে একদিন দেখবি বড়ো হয়ে গেছিস। তোর তখন নদী সাঁতরে ওপারে যেতে ইচ্ছা হবে।
ও মাঃ ও কিরে! তোর পছন্দ নয় আমাকে। আমার দুটো-একটা চুল দাড়ি পেকে গেছে। তুই বড় হলে আরও পাকবে। তাতে কি আছে। কঠিন হাতে নরম মাছ বেছে খাব। একটু থেমে ঢোক গিলে মালিকলাল এমন বলল।
কোনো জবাব পাচ্ছে না ও-পাশের লক-আপ থেকে। মেয়েটা আবার মাংসের পিণ্ড হয়ে গেছে বুঝি। সে বলল, (কথা শুনলে যদি আবার জেগে গিয়ে বউ সেজে নাকে নোলক পরে বসে থাকে) জরুর নেবে। ফসলের খেতে বড়ো হতে হতে তোরা একদিন নদীর পারে হারিয়ে যাবি।
সহসা মনে হল মেয়েটা হা হা করে হাসছে। ওর কথা শুনে হাসছে। তারপর বিকট একটা শব্দ। বাসের চাকাটা পেটে উঠে গেছে। পেটটা ফেটে গেল। অথবা বাসের চাকা মাথায় উঠে গেছে-ফট করে শব্দ। কী যে শব্দ হয়েছিল, চাকাটা পেটে মাথায় উঠে গেলে মানিকলাল ধরতে পারেনি। সে আন্দাজে শব্দের তারতম্য ধরার চেষ্টা করছে।
ভয়ে মানিকলাল আবোল তাবোল বকছিল। অথবা অদ্ভুত সরল দৃশ্য ভেসে উঠতে দেখল অন্ধকারে। রাত গভীর হচ্ছে টের পাওয়া যাচ্ছে। থালাবাসনের শব্দ আসছিল। কেউ হয়ত খেয়ে বাসন মাজছে। সে নানাভাবে নিজেকে অন্যমনস্ক রাখতে গিয়েও পারছে না। ক্রমে ও-পাশের লক-আপে দুটো হাত লম্বা হচ্ছে। লম্বা হতে হতে সাপের মতো দুলে দুলে দেয়ালে বেয়ে উঠে আসছে ওকে ধরার জন্য। এখন হাত দুটো মাথার উপর নুয়ে পড়েছে। সাপের ফণার মতো দুলছে। ওকে সুড়সুড়ি দেবে বলে আঙুলগুলো ফাঁক করছে। আঙুলে সে ফোঁটা ফোঁটা রক্তের দাগ স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছে। সে ভয়ে চোখ বুজে আছে। অন্ধকারে চোখ খুললেই যেন দেখতে পাবে সেই সরু হাত, ছোটো ছোটো আঙুল ভীষণ লম্বা হয়ে ওর সামনে কৃমির মতো কিলবিল করছে। হাতটা কঙ্কালসদৃশ। এবং কাচের চুড়িগুলি, নীলরঙের কাচের চুড়ি ঝুমঝুম করে কানের কাছে বাজছে। সে ভয় থেকে পালাবার জন্য গরাদের শিক ফাঁক করতে গিয়ে দেখল, একটা আলো। স্টিমারের বাতির মতো আলোটা সরু লম্বা হয়ে এদিকে নেমে আসছে। সেই বড়ে টর্চ জ্বালিয়ে কেউ হয়ত আসছে এদিকে।
মানিকলাল গেটের মুখে গিয়ে দাঁড়াল। কারণ সামান্য আলো এসে পড়েছে গেটের মুখে। সেই আলোই এখন ওর প্রাণরক্ষার নিমিত্ত বরাভয় হয়ে আছে। সে এবার চিৎকার করে উঠল, কে? কে?
একজন সিপাই, অন্যজন বামুনঠাকুর। দারোগাসাহেব কৃপাপরবশে খাবার পাঠিয়েছে। সে দেখল এক থালা খাবার এবং তিতিরের মাংস। লম্ফটা জ্বেলে দিল সিপাই। সে নেড়েচেড়ে তিতিরের মাংস এবং ভাত দেখল। ও-পাশের একটা অবলা জীবের মাংসপিণ্ড থেকে তাজা মাংসের গন্ধ উঠে আসছে। সে চুপচাপ বসে থাকল সামনে খাবারের থালা নিয়ে। খেতে পারছে না। ভাত মাংস এবং জলের ঘটি-এনামেলের থালা বাসন, ও-পাশে রক্তের চাপ চাপ মাংস, কাঁচা এবং ফেসে গেছে—সে ভাত নাড়তে নাড়তে ওক দিচ্ছিল।
কী হল!
মানিকলাল ফ্যালফ্যাল করে তাকাল। পুলিশের লোকগুলি দেখল একেবারে মৃত চোখ কোনো আশা-আকাঙক্ষা নেই। ঝড়ে মরে পড়ে থাকা পাখির মতো চোখ। বাসি, বাদামি রঙের। চোখে যেন দুটো আস্ত পিঁপড়া হাঁটছে। ওরা বলল, বমি পাচ্ছে কেন? জল খাও। গলা শুকনো থাকলে বমি পায়।
চোখে যার পিঁপড়া হাঁটছে—সে খাবে কী? ওরা যেমন এসেছিল—তেমনি চলে
গেল। ওরা যেতে যেতে লম্ফটা ফুঁ দিয়ে নিভিয়ে দিল।
মানিকলাল শুনতে পেল ঝুমঝুম করে কী যেন বাজছে ও-পাশের লক-আপে। কাচের চুড়ি নীল রঙের। মেয়েটার হাত এখন সাপের মতো চার দেয়ালের অন্ধকারে যেন ঘোরাফেরা করছে। ইচ্ছা করলেই হাতটা মাথার ছাদ ফুটো করে উপরে উঠে যেতে পারে। এবং যা কিছু সুন্দর এই পৃথিবীর অথবা সৌরলোকের, তাবৎ সংসার, এই যেমন গ্রহ-নক্ষত্র সব বিনষ্ট করে দিতে পারে। হাত দুটো লম্বা হতে হতে অনেক যোজন দূর উঠে যেতে পারে এবং ফুল ফল তোলার মতো গ্রহ নক্ষত্র তুলে আনতে পারে। অন্ধকারে নীল রঙের চুড়ি আর তাতে জলতরঙ্গের শব্দ। মানিকলাল এসেছিল নিজের প্রাণরক্ষার্থে। কিন্তু এই অন্ধকার, পাশে মৃতদেহ এবং তার থেকে নানারকমের ভয় ওকে পাগলপ্রায় বানিয়ে রেখেছে। সে যেন নিজের এই ভয়কে জয় করার জন্য এই রাস্তায় কবে কখন প্রথম মেয়েটাকে দেখেছিল মনে করার চেষ্টায় আছে।
