কী বড়ো রাস্তা! দু-পাশে ফসলের মাঠ। সে বাস-ড্রাইভার। তার বউর নাম শোভা। শোভা তার ঘর ছেড়ে চলে গেছে সেই কবে। কেবল কথায় কথায় সে বলত তুমি দ্যাখছনি, পদ্মার পার, নদীর জল, ইলিশ মাছ! শোভার কিছু ভালো লাগত না। মানিকলাল নেশা করে ঘরে ফিরত এবং সুবি নামে মেয়েটার সঙ্গে যালা দিত। আর ঘরে তার বউ, উদবাস্তু যুবতী নদীর পারে স্বামী এখনও ফিরছে বলে নেমে যেত, হিজলের ফুল, শালুক পাতা এবং জোয়ারের জল অন্বেষণ করত, উঁচু টিলায় দাঁড়িয়ে বাসটা বড়ো রাস্তার মোড়ে দাঁড়িয়ে আছে কি না উঁকি দিয়ে দেখত। বাসটা দাঁড়িয়ে আছে, অথচ মানুষটা এখনও ফিরছে না। বাস থেকে নেমে সে যে কোথায় যায়। তখন ড্রাইভারসাহেব নেশার ঘোরে বউকে নদীর পাড়ে দেখলে, বকত। তুই কি ছুঁড়ে বেড়াস আমি সব জানি।
আমি কি ছুঁড়ে মরি!
তুই নদীর জল, ইলিশ মাছ, পদ্মার পাড় ছুঁড়ে মরিস। আমি তোর সব বুঝি। তুই আমাকে ভালোবাসিস না।
শোভা কিছু বলত না। ড্রাইভারসাব বড়ো রাস্তায় নেমে গেলে সে একটা কদমগাছের নীচে দাঁড়িয়ে থাকত। এবং যতক্ষণ না বাসটা চোখের ওপর থেকে সরে যেত ততক্ষণ সে নড়তে পারত না।
শোভার কথা মনে এলেই এসব কথা মনে হয়। পদ্মার পাড়, নদীর জল, ইলিশ মাছ, সূর্যের আলো এসব ছবি মনের ভিতর উঁকি মারতে থাকে। এখন দারোগাসাবের বউ পানের পিক ফেলে মাংসের গন্ধ শুকছে। লম্বা ব্যারাক বাড়ির শেষ মাথায় দারোগাসাবের কোয়ার্টার। ড্রাইভার মানিকলাল অন্ধকারে তা টের পাচ্ছে। বুটের শব্দ আসছে এখনো, কেউ বন্দুকের নলে পৃথিবী পাহারা দিচ্ছে। এবং মানিকলালকে দেখলে টের পাওয়া যাবে ওর চুল খাড়া; চোখ লাল এবং শরীরে ঘামের গন্ধ। ওর গলা শুকনো। তেলানো একটা মাংসের জীব পাশের ঘরে শুয়ে আছে। চোখ নাক মুখ সমতল। সে স্থান কাল পাত্র পরিবর্তন করে গাজির গীতের চাঁদ পাতার মতো চ্যাপটা। সে নাক টানল। রক্ত-মাংসের আঁশটে গন্ধটা ও-পাশের লক-আপ থেকে আসছে কি না দেখার সময় মনে হল দারোগাসাবের বউ তিতিরের মাংস চেটে চেটে সুসিদ্ধ মাংসের স্বাদ নিচ্ছে। এবার ওর গলা থেকে একটা ওক ওঠে এল। রান্না করা মাংসের গন্ধ তাজা মাংসের গন্ধকে সুরুয়ার মতো গিলে ফেলছে।
আলোটা জ্বালা হোক এবার। লম্ফটা না জ্বেলে দিলে ভয়টা বাড়বে। চারপাশটা নিঝুম। বড়ো মাঠের ভিতর এইখানে জানালায় জ্যোৎস্না দেখে মনে হয় এই পৃথিবীর একাংশে সে এবং আট-নয় বছরের ফসলের মাঠ থেকে উঠে আসা বনদেবী চুপচাপ বসে রাত কাটাবার আশায় আছে। সকাল হলে সে যাবে শহরে। মেয়েটা যাবে মর্গে। এখন এমন অন্ধকারে গোটা লক-আপটা প্রায় মানিকলের কাছে মর্গের মতো। যেন এবার ফসলের মাঠ থেকে উঠে-আসা বনদেবী ওকে ভয় দেখাতে শুরু করবে। সে ভয় থেকে নিষ্কৃতি পাবার জন্য ডাকল ও মেয়ে আরতি, তুমি জেগে আছ না কি! তারপর যেন সে কেমন কাতর গলায় বলল, আহা তুমি যুবতী হলে না, যুবতী হলে তোমার শরীরে কত রকমের ইচ্ছা খেলা করে বেড়াত। ও মেয়ে জেগে আছ না কি? আমি মানিকলাল, বউ আমার পলাতক। পদ্মার পাড়, নদীর জল, ইলিশ মাছ সে খুব ভালোবাসত। আমি ড্রাইভার মানুষ ওর মন খারাপ হলেই বুঝতে পারতাম, সে কোথাও যেতে চায়।
বস্তুত মানিকলের ভয়ে ধরেছে। চোখের উপর দৃশ্যটা ভাসছে। চোখ মুখ নাক গলে গিয়ে সমতল, পেট ফেটে হাঁ করে আছে। সে ভয় থেকে নিষ্কৃতি পাবার জন্য ইনিয়েবিনিয়ে কবিতার মতো করে নাকিসুরে কথা বলছে। একাকী নির্জন রাতে ভয় ধরলে মানিকলাল উচ্চস্বরে গান গাইত। এখন সে ভয়ে কবিতার মতো করে কথা বলছে—অ মেয়ে, সে বড়ো ভালোবাসে বৃষ্টিতে ভিজতে, নদীর পাড়ে হাঁটতে, জ্যোৎস্না রাতে বালির ঢলে চুপচাপ বসে থাকতে। আমাকে নিয়ে শোভা এসব করতে চাইত। আমি মানিকলাল সারাদিন নেশার ভিতর ডুবে থাকি, একবার গাড়ি নিয়ে বের হলে ফেরার নাম করি না। সে কেন আমার আশায় বসে থাকবে বল।
মানিকলাল এবার বলল, বারে বা আমি কার সঙ্গে কথা বলছি তবে। আমাকে ভূতে পেয়েছে তবু লোমকূপে শক্ত দানদার সব হিজিবিজি দাগ কাটা, কে যেন সারা শরীরে হাজার হাজার দাগ কেটে চলেছে। ওর ভিতরটা ভয়ে ফুলে উঠছে এবং শরীরের সব লোমকূপ শক্ত হয়ে উঠছে। আর তখনই মনে হল কেউ যেন ডাকছে তাকে। অনেক দূরে ফসলের মাঠ থেকে কে ডাকতে ডাকতে উঠে আসছে। বেশ মজা দারোগাসাবের। লম্ফ নিভিয়ে দিয়ে তেল বাঁচাচ্ছেন। সে যে অন্ধকারে ভয়ে মরছে এবং এ ভয়টা যে আরও ভয়াবহ এটা কেউ টের পাচ্ছে না। সে নিজেও বুঝতে পারেনি মাটির ঢেলার মতো মাংসপিণ্ডটা ওকে এমন ভয় দেখাতে পারে। সে যেন এতদূর অনর্থক বাঁচার জন্য ছুটে এসেছে। পাশে মৃতদেহ বালিকার—সে যাবে শহরে, মেয়েটা যাবে মর্গে—মেয়ের চোখ দুটো ডাগর ছিল, একটা নীল রঙের ডুরে শাড়ি কোমরে প্যাঁচ দিয়ে পরত। হাত-পা শীর্ণ। নরম মুখ। সে গঞ্জের কাছে বাস থামালেই তার জানালায় লাফিয়ে উঠে আসত মেয়েটি, কার মেয়ে কোথাকার মেয়ে—এই গ্রামেগঞ্জে কে তার খবর রাখে। দুটো পয়সা দেবা ড্রাইভারসাব। মুরকি খাব।
ছোটো থাকতে তার পালিয়ে যাওয়া বউটার মুখ হয়ত এমন ছিল। এ অঞ্চলে ধান হয়, যব গম হয়। ফসলের মাঠ থেকে নানারকমের পাখি উড়ে আসে। মেয়েটার বুঝি কাজ ছিল ফসলের খেতে বসে ঢং ঢং করে টিন বাজানো। বসন্তে অথবা গ্রীষ্মেও ওদের কোনো কাজ থাকে না। তখন রাস্তার এসে দুটো পয়সা ভিক্ষা। গঞ্জের মতো জায়গাটায় হরেকরকমের চাষবাস, মনিহারি দোকান, পাটের আড়ত এবং চাল ডাল মুসুরির গুদাম নিয়ে বেশ আর্থিক সচ্ছলতা। এখান থেকে পদ্মার পার বেশি দূর নয়। দু-ক্রোশ পথ হেঁটে গেলেই নদী, বালির চর, ইলিশের ঝাঁক এবং নানাবিধ গাছপালা যা বাংলাদেশের সীমানা মানে না। মনে সন্দেহ ছিল মানিকলের, বাঁজা বউ শোভারাণী নদী পার হবার জন্য পালিয়ে এ অঞ্চলে চলে এসেছিল। সে এবার ভয় থেকে মুক্তি পাবার জন্য বলল, ও মেয়ে আমি যে আমার পালানো বউয়ের খোঁজে এই রুটে শেষে কাজ নিয়ে চলে এলাম। এসব কথা তোকে আমি কতবার বলেছি।
