আহা সে বেঁচে যাচ্ছে। সামনে থানার কাঁটাতারের বেড়া। দুটো একটা প্রজাপতি উড়ছে লতায় পাতায়। এখন শীতের আকাশ নয়। বসন্তের আকাশ। রাস্তার শুকনো পাতা উড়ছে। সে বেঁচে যাচ্ছে—কী সুস্বাদু জীবন। সে জিভ চেটে চেটে জীবন কত সুস্বাদু তার আস্বাদন নিতে নিতে দেখল, সিপাই মানুষটি লক-আপের তালা খুলছে।
সে বলতে চাইল, আহা এটা কী করছেন? ওদের চিৎকার শুনতে পাচ্ছেন না? ওরা এলেই সোজা ঢুকে যাবে থানায়? বলবে, কুত্তার বাচ্চাকে বের করে দিন। ওকে মারব। একটা কাঁচা প্রাণকে এইমাত্র চেপটে দিয়ে এসেছে। বড়ো হারামি আছে।
সিপাই মানুষটি একঘটি জল রেখে দিল ভিতরে। তার জলতেষ্টা পেয়েছে, সে ঢক ঢক করে জল খেল। সে মনে মনে হাত জোড় করে বলল দয়া করে এই গরাদ আর টানবেন না। তালা খুলবেন না। আজ রাতটা কাটাতে দিন। কাল সকালে আমার মালিক এলে পুলিশ পাহারায় শহরে চলে যাব। আমি আবার নদীর পারে হেঁটে যাব। গাছের নীচে বসে থাকব। দরকার হলে খিস্তি খেউড় এবং সুবি নামে মেয়েটার সঙ্গে যালা দেব।
সিপাই চলে গেলে সে নিজেই ফের লক-আপ টেনে টেনে দেখল। না খুব কঠিন জায়গা। ভেঙে কেউ ভিতরে ঢুকে যেতে পারবে না। এ-সময় দারোগাবাবুর রসিকতা শোনা যাচ্ছিল। পুলিশের বুটের শব্দ কানে আসছে এবং ব্যারাক বাড়িতে দুজন সিপাই ঢোল বাজাচ্ছে। সে শুনতে পেল কোথাও গুম গুম আওয়াজ উঠছে। সে কি ভয়ে তাহলে মরে যাচ্ছে। চারপাশে অনবরত বিশ্রী শব্দ, ওর বুকটা মাঝে মাঝে ধড়ফড় করে উঠছে–সে কেন জানি স্থির থাকতে পারছে না। সে সারারাত চেষ্টা করেও বুঝি একটু নিদ্রা যেতে পারবে না। কারণ ওরা এলে ওকে কুত্তার বাচ্চা, হারামির বাচ্চা এইসব বলে গাল পাড়তে পারে। সে এই গাল পাড়তে পারে ভেবে যেন সটান হয়ে শুল না। পাশ ফিরে শুয়ে একটা কান খাড়া করে রাখল, কুত্তার বাচ্চা শব্দটা শুনলেই সে জোড় হাত করে ক্ষমার ভঙ্গিতে দাঁড়িয়ে থাকবে। আমার অপরাধ নেবেন না বাবুসকল। আমি না জেনে ওকে হত্যা করেছি। আমার বিশ বছরের ড্রাইভারি জীবনে এমন কোনোদিন হয়নি। আমি ভালো স্টিয়ারিং ধরতে জানি। হালে সহসা পানি না পেলে মানুষের এমন হয়। কিন্তু আমার হালে পানি না পাওয়ার কিছু ছিল না। কারণ আমি আমার অধীনে ছিলাম। গাড়ি আমার থেমে ছিল। আদৌ দেখিইনি ওরা দুজন কি তিনজন হবে উবু হয়ে গাড়ির চাকা দেখছে, চাকাটা ঘুরছে কী করে, কোন জাদুবলে এত বড়ো অতিকায় দানবটা মাঠ পার হয়ে নদী পার হয়ে চলে যায়। সব সময় ওদের ভিতর এই গঞ্জের মতো জায়গায় এত বড়ো গাড়িটার এক রহস্য ছিল। আমার গাড়ি, আমি এবং কোনো কোনোদিন আমার কথাবার্তা শুনে ওরা হাসত। হাসতে হাসতে বলত, ড্রাইভার সাব অমাগ তুমি পদ্মার পারে নিয়া যাইবা?
যামু। কবে রওনা দিবা কও। সে ওদের মতো করে কথার জবাব দিত।
তুমি ড্রাইভার সাব কবে যাইবা। গাড়িতে চইড়া পদ্মাপারে যাইতে বড়ো শখ যায়।
দিমুনে একবার একটা পাড়ি দিয়া।
ড্রাইভার সাহেব মানিকলের তখন মনে হত শোভার কথা। সেও বলেছিল, এডারে বুঝি দ্যাশ কয়। আছিল একখানা দ্যাশ আমার পদ্মার পারে। তুমি ত যাও নাই। গ্যালে তোমারে দ্যাখাইতে পারতাম দ্যাশ একখান কারে কয়।
আমি শোভা তোমার দেশে যেতে পারিনি। আমি এখন এই লক-আপে আছি। শুধু এখন এটুকু মনে করতে পারি তুমি আমাকে কোনোদিন ভালোবাসোনি। মানিকলাল কেমন ঢোক গিলে সুর ধরে বলতে থাকল—তোমার মনে ছিল কত আশা আমি তোমারে ঘর দিমু চান্দের মতো মুখখানাতে চুমা দিমু, কিন্তু পারি নাই। সে কেন জানি জায়গায় জায়গায় আজ শোভার মতো ভাবনাচিন্তায় ডুবে যাচ্ছিল। চুমা দিমু যখন কই, তখন দ্যাখি তুমি মুখটারে ঘুরাইয়া রাখছ।–মুখে তোমার মানিক অষুধের গন্ধ ক্যান?
ওষুধ না খাইলে শোভা গাড়ি চালানো যায় না।
মিছা কথা।
হাচা কথাই কই।
কয়ডা লোখ হাচা কথা কয় কও!
ক্যান কয়না?
তোমার মতো মাইনসে দ্যাশটা ছাইয়া গ্যাছে মানিক। একবার লইয়া যাইতে পারতাম। পদ্মাপারে, নদীর জল, ইলিশ মাছ, দেখাইতে পারতাম তবে দ্যাখতাম তোমার রোগড়া থাকে কোনখানে?
মানিকলাল বলত, তোমার দ্যাশে বুঝি কোনো রোগ নাই?
থাকব না ক্যান! তোমার রোগে মানুষ ভোগে না মানিক। মাঠেঘাটে বেড়াইলে, নদী-নালা দ্যাখলে, পদ্মার জলে মাছ ধরলে এই রোগডা মইরা যায়। নদীর জলে ডুইবা গেলে মনটা তোমার ভইরা যায়। অষুধ খাওনের আর কাম লাগে না।
লম্ফটা নিয়ে কেউ চলে গেল। আবার অন্ধকারে ডুবে গেল মানিকলাল। চারপাশের ঘন অন্ধকারে সে কিছু দেখতে পাচ্ছে না। বাইরের চাতালে অনেকগুলো মানুষের চিৎকার চেঁচামেচি-ওরা বুঝি এসে গেছে। সে অন্ধকারের ভেতর ঘাপটি মেরে বসে আছে। কেউ টের পাবে না এখন মানিকলাল কোথায়। আর তখনই মনে হল পেছন থেকে ওর মাথায় কে টর্চের আলো ফেলছে। পিছনে দেয়াল, কে আলোটা ফেলছে—সে ভয়ে ছুটবে ভাবল। ওরা ওকে নিতে আসছে বোধ হয়। আজকাল যা দিন পড়েছে ওকে ফিরিয়ে না দিলে থানা-পুলিশ উড়িয়ে দিতে পারে। সে ভয়ে ভয়ে পেছনের দিকে মুখ ফেরাতেই দেখল, উঁচু জানালা থেকে জ্যোৎস্নার আলো এসে এই ঘরে পড়েছে। কোথাও চাঁদ উঠেছে। মাঠ আছে হয়ত পিছনে। সাদা মাঠ, তারপর কোনো অশ্বথ গাছ। গাছের মাথায় চাঁদটা মরা মানুষের চোখের মতো ঝুলছে। সে এবার আশ্বস্ত হল। আর সেই মুহূর্তে সেই অন্ধকার গলি পথটায়, ওর লক-আপের সামনে কারা দল বেঁধে আসছে। একটা আলো ক্রমে দীর্ঘ থেকে দীর্ঘতর হচ্ছে। সে টের পেল ওটা বড়ো টর্চের আলো। স্টিমারের আলোর মতো ওর চারপাশটা একেবারে সাদা হয়ে গেছে। সাদা কাপড়ে মোড়া রক্তাক্ত একটা জীবকে ধরাধরি করে কারা এদিকটায় নিয়ে আসছে। ওরা লক-আপের সামনে ভিড় করে দাঁড়িয়ে আছে। আহত বাঘের মতো ওরা ড্রাইভারকে দেখছে। টর্চের আলোটা নিভে গেল সহসা। অন্ধকার চারপাশে, শুধু সেই এক ফালি জ্যোৎস্না, মরা মেয়েটাকে রাখার জন্য দারোগাবাবু আবার হয়ত লম্ফটা এদিকে ঝুলিয়ে দেবার অনুমতি দিয়েছেন—সেই লক্ষের আলো ফলে অস্পষ্ট অন্ধকারে মানিকলালের চোখ দপদপ করে জ্বলছিল। এবং দূরে কোথাও মাংসের গন্ধ, দারোগাবাবু বিকালে নদীর চর থেকে তিতির মেরে এনেছেন—তিতিরের মাংস রান্না হচ্ছে। লোকগুলো পাশের লক-আপে সেই সাদা চাদরে মোড়া বনবাসী দেবীর মতো ছোট্ট এক বালিকাকে রেখে গেল। লম্ফটা নিয়ে চলে গেলে, শুধু থাকল অন্ধকার, মরা চাঁদের আলো আর বনবাসী দেবী চিৎপাত হয়ে পুঁটলির ভিতর শুয়ে আছে।
