ঠিক আছে, ওঠ, চানে যাও। বেলা কম হয়নি। আর এ বয়সে আমাকে নিয়ে এত না ভাবলেও চলবে। ঋতবানের চিঠি এসেছে, বউমার বাচ্চা হবে। তুমি দাদু হতে যাচ্ছ।
চিঠিতে কি তুমি জন্মেরও ঘ্রাণ পাও!
জানি না। বলে ঋতবানের পত্রটি তপোময়ের হাতে দিয়ে বলল, বংশে বাতি দিতে আসছে, তিনিই তো কত শব্দ নিয়ে আসছেন। গোপাল মামারও দেখা পেলে। শব্দ খুঁজে পাও না, শব্দের আকাল, বলে মিষ্টি হাসল মণিমালা। তার উদ্ভাসিত চোখেমুখে সেই কোমলাক্ষী যেন ফের জেগে উঠছে। তপোময় বলল, তোমাকে আদর করতে ইচ্ছে হচ্ছে।
ধুস, কী যে করে না, কে দেখে ফেলবে! বলে বালিকার মতো প্রায় ছুটে পালাতে চাইছিল, হাত ধরে তপোময় বলল, আস্তে। পড়ে গেলে আর এক কেলেঙ্কারি।
মানিকলের জীবনচরিত
এতক্ষণে সে নিশ্চিত হল। ঘাম দিয়ে ওর জ্বর সেরে গেল।
কিছুক্ষণ আগেও সে থরথর করে কাঁপছে। এখন কপালে তার বিন্দু বিন্দু ঘাম। যারা ওকে তাড়া করেছিল সে তাদের পিছনে ফেলে চলে এসেছে। সে বার বার পেছন ফিরে তাকিয়েছে—কপালে তার চোখ উঠে গেছে, ওরা ছুটে আসছে। ওরা ওকে ঘিরে ফেলবে। রাস্তার এই জনতা ওর গাড়ি ঘিরে ফেললে, গাড়িটা এবং সে মরে যাবে। অথবা সে এবং গাড়িটা পুড়ে যাবে। পুড়ে গেলে সে আকাশ দেখতে পাবে না, ফসলের মাঠ দেখতে পাবে না। খিস্তি খেউড়, জীবন যে মহান—সে চলার সময় আর কোনোদিন, তা টের পাবে না।
ওর কপালের বিন্দু বিন্দু ঘাম এখন শুকিয়ে যাচ্ছে। লক-আপের বড়ো তালাটা ঝুলিয়ে গোঁফ চাড়া দিচ্ছিল দফাদার। এত ভালো লাগল যে সে পয়সা থাকলে দু আনার তেলেভাজা অথবা আলুকাবলি কিনে দিত, শক্ত তালা দিয়ে সেপাই তাকে আগুনের হাত থেকে রক্ষা করে গেল। এত বড়ো তালা, লোহার গরাদ এবং শক্ত দেয়াল ভেদ করে ওদের সড়কি অথবা আগুনের উত্তাপ তার গায়ে লাগবে না। ওর কেমন কষ্ট হচ্ছিল ভিতরে। সিপাই চলে যেতেই মনে হল ওর জলতেষ্টা পেয়েছে। গলা শুকনো, মুখে থুথু পর্যন্ত উঠছে না। জিভ দিয়ে ঠোঁট চেটে সে জলতেষ্টা নিবারণের চেষ্টা করল। কেউ কাছে নেই দেখে সে দু-হাতে গরাদ ধরে ঝাঁকি দিল—কতটা শক্ত, ক-টা মানুষের ঠেলাঠেলি সহ্য করতে পারবে দেখার সময় মনে হল, চারপাশে তার অন্ধকার নামছে। পেছনের দিকে যে জানালাটা আছে সেখানে এখনই একটা কি দুটা নক্ষত্র উঁকি মারবে। আকাশে নক্ষত্র উঠে এলেই সে পাশের বেঞ্চে শুয়ে ঘুম দেবার চেষ্টা করবে। যেন সে কতকাল না ঘুমিয়ে আছে। মনে হয় মাস কাল বৎসর কেটে গেছে সে না ঘুমিয়ে আছে। আহা জীবন কী সুস্বাদু। সে কিছুক্ষণ আগেও ভেবেছিল মরে যাবে—সকলে তাকে পিটিয়ে কিংবা পুড়িয়ে মেরে ফেলবে।
ঘটনাটা ঘটে যাবার সঙ্গে সঙ্গে মানুষের চিৎকারে তার হুঁশ ফিরে এসেছিল। চাকার নীচে সেই মুখ—করুণ মুখখানি। দু-হাত রাস্তার উপর দেবীর মতো ছড়িয়ে দিয়েছে। চাকাটা পেটের উপর উঠে গেছে। শালা আমি এক নম্বরের হারামি। সে নিজেকে গাল দিল। টের পেলাম না, চাকার নীচে তিনটে বাচ্চা হামাগুড়ি দিয়ে নদী পারাপারের খেলা খেলছে।
সে লক-আপের ও-পাশে নিবুনিবু আলোটার দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থাকল। দেখল হাতে নাগাল পাওয়া যায় কি না লম্ফটা। সে ফুঁ দিয়ে লম্ফটা নিভিয়ে দেবার চেষ্টা করল। ওরা যদি এতক্ষণে এতদূর পর্যন্ত ছুটে আসে, শালা কুত্তার বাচ্চা থানায় দ্যাখো কেমন চুপচাপ লক-আপে বসে আছে, দে, ছুঁড়ে দে, লম্ফটা ভিতরে, কুত্তার বাচ্চা আগুনে পুড়ে মরুক—লম্ফটা নিভিয়ে দেবার জন্য সে প্রাণপণ গরাদের ফাঁকে মুখ রেখে ফুঁ দিতে থাকল। লম্ফটা ছুঁড়ে দিলে ভেতরে তেলের সঙ্গে আগুন মিশে অগ্নিকাণ্ড ঘটাতে পারে। লক্ষটা নাগাল পেলে সে যে করে হোক নিভিয়ে দিতে পারত—যা কিছুর ভিতর মৃত্যুভয় লুকিয়ে আছে সে দু-হাতে দূরে সরিয়ে দিতে পারলে যেন বাঁচে এখন।
সে বেঞ্চটা টেনে অন্য দিকের দেয়ালে নিয়ে গেল। যেন গরাদের ফাঁকে হাত ঢুকিয়ে অথবা বর্শা মেরে কেউ খোঁচা না দিতে পারে। সে যতটা পারল বেঞ্চটাকে পিছনের দিকে ঠেলে দিল। কারণ সে যত দ্রুত গাড়িটা নিয়ে থানায় ভিতর ঢুকে পড়েছে তত দ্রুত রাস্তার জনতা এখানে ঢুকে যেতে পারবে না। ওকে ধরার জন্য চারজন লোক সাইকেল চালিয়ে আসছিল। ওরা গাড়ির পেছনে বেগে ধেয়ে আসছে। সে কিছুতেই ধরা পড়বে না। ওরা যদি লাফ দিয়ে বাসটার ভিতর ঢুকে যায় তবুও না। কারণ সে তার সবরকমের কৌশল খাঁটিয়ে মা জননীরা, মাসিমারা আপনারা নামুন গাড়ি থেকে, গাড়ির চাকার নীচে তাজা প্রাণ, এবার আমাকে দ্রুত পালাতে হবে, এত মানুষজনের যখন ভিড়, যখন আমাকে আপনারা সকলে পুড়িয়ে মারবেন স্থির করেছেন, তখন সবটা শুনুন, গাড়িটাকে সাইড করতে দিন, এই সাইড করার নাম করে সে খালি গাড়ি নিয়ে একেবারে সোজা থানায়—কারণ সে কিছুতেই জনতার হাতে ধরা পড়বে না, ওরা লাফ দিয়ে যদি ভিতরে ঢুকে যায় তবু না। সে কেবল তার সামনের আয়নাটা দেখছিল। চারটা মানুষ যেন সাইকেলে আসছে না, পাখি হয়ে বাতাসে উড়ছে। আয়নার ভিতর ওরা উড়ে উড়ে কেমন বড়ো মাঠে এক সময় অদৃশ্য হয়ে গেল। সে বুঝতে পারল ওরা ওর কাছে হেরে গেছে। সে এবার বেঁচে যাচ্ছে, সে বেঁচে যাচ্ছে। সে স্টিয়ারিঙে শক্ত হয়ে বসেছিল। হাওয়ার আগে গাড়ি ছুটিয়ে সে লোকগুলোকে বেমালুম বোকা বানিয়ে দিয়েছে। রাস্তা শেষ হলেই থানা। সে থানায় গেলে আজ হোক কাল হোক ওরা ওকে শহরে পৌঁছে দেবে।
