চাকরি হবে!
কেন হবে না।
তিনি কি তোমাকে মামা কথা দিয়েছেন!
দিয়েছেন বলেই তো প্রস্তাবে রাজি হয়েছি। তোর মামাকে তো জানিস। তোর চানুমামির মতো দজ্জাল মেয়েছেলেকে সামলায়।
তপা বোঝে, চানুমামি আছে বলেই মামার সব দোষ খণ্ডন করে নিতে পারে। শনিবারের হপ্তা পেলে রেসের মাঠে না গেলেই যে মামার চলে না। এক রাতেই ফতুর। সকালে ফিরতেন টলতে টলতে। কখনো খোঁড়া পা নেশার বোধহয় অবশ হয়ে থাকত। কোনো রকমে পা টেনে, বারান্দায় উঠেই চানুমামির পা জড়িয়ে ধরত। এই নাক মলছি, কান মলছি, আর যাচ্ছি না। তুই চানু ক্ষমা করে দে।
ধুস! চানুমামি পা সরিয়ে নেয়।
চানু, মানুষের কপাল ঠিক একবার না একবার ফেরে। এবং এই করে রেসের ঘোড়ায় চড়ে দু-চারদিন বুদও হয়ে থাকত—যদি কপাল ফেরে তবে গেঞ্জির কারখানা, মামি ম্যানেজার। সব যুবতী মেয়েরা মামির আণ্ডারে কাজ করবে, পায়ের ওপর পা তুলে তার দিন চলে যাবে। এবং ইত্যাকার দিবাস্বপ্নে পুঁদ হয়ে থাকা মামা ইদানীং শিবমন্দির সংলগ্ন ভৈরবীদের আখড়া এবং এমন সব বিদঘুটে পরিকল্পনায় মেতে থাকার পর সহসা তার মাথায় মনোরমা বোধহয় হাজির।
মামিও তাকে বলল, বসেই তো আছিস। বিয়ের কাজটা সেরে রাখলে ক্ষতি কি। মনোরমাকে বিয়ে করলে যদি সাহেব তোকে গানশেলে ঢুকিয়ে দেয় মন্দটা কি আমি বুঝি না। পাল্টি ঘর। আই. এ. পাস, মদন সাহেব ঠিক ভালো পোস্টিং দিয়ে দেবে। আত্মীয়ের বাড়ি দু-মুঠো ভাতের জন্য আর ঘুরে মরতে হবে না। মনোরমাকে দেখলে তোর মাথা ঘুরে যাবে। সুকেশী, গায়ের রং দুধে আলতায়।
গ্যাঁজালু গোপাল অবশ্য অনেক রাত পর্যন্ত চানুর সঙ্গে পরামর্শ করল।
তপা সকালে উঠেই দেখল মামির গঙ্গাস্নান সারা। মামাও আজ মামির সঙ্গে গঙ্গাস্নান সেরে এসেছে। মামা-মামি দু-জনেই গাছে গাছে জল দিচ্ছে। রতন বুড়ি চাতাল ধুয়ে দিচ্ছে। আর প্যান প্যান করছে, হাড়মিনসে আমাকে ফেলে কোথায় যে পালাল!
সকাল থেকেই নানারকম সিধা আসে মন্দিরে। মনাঠাকুর যা পারেনি, গ্যাঁজালু গোপাল, শনি-মঙ্গলবার অহোরাত্র ত্রিনাথের কীর্তন এবং গরিব-দুঃখীদের খিচুড়ি প্রসাদ এবং এই সব সাধুকাজ নিমিত্ত গ্যাঁজালু গোপালের বিশ্বাসযোগ্যতা বেড়ে যাচ্ছে।
তপাকে ডেকে বলল, ওঠ, আর কত বেলা ঘুমাবি। চানটান করে মন্দিরে বোস। মানুষজন তো এমনি আসে না। তোর মুখে সাধুভাব আছে। লম্বা কোঁকড়ানো চুল আর গালের স্বল্প দাড়ি বুঝিস না নবীন সন্ন্যাসী তুই। আর মনোরমা যদি এখানে উঠে আসে তবে সোনায় সোহাগা। বিকেলে গোধুলি লগ্নে আমরা পাত্রী দেখতে যাচ্ছি। তোর যা স্বভাব, কোথাও আবার না পালাস। যদি জীবনে ভালো চাস, এ সুযোগ হেলায় হারাস না।
তপা ভাবল, তার তো হারাবার কিছু নেই। পাত্রী না হয় দেখে এসে ঠিক করবে বিয়েতে তার মত আছে কি নেই। তার বিয়ে হবে, বাবা-মা জানবে না। অরাজি হলে মামা যে তাকে এখান থেকে লাথি মেরে তাড়াবে। যাবেটা কোথায়, উঠবেই বা কোথায়, একবেলা, দুবেলা—বেশি হলে এক দু-রাত থাকতে দেবে। সুতরাং পাত্রী দেখতে যাওয়াই বাঞ্ছনীয়।
আর গোধুলি লগ্নে পাত্রী দেখে সে হতবাক। শুধু সুকেশী নয়, সহাসিনীও। সুকুমারীও বলা যায়। মদন সাহেব এবং তাদের আত্মীয়স্বজনরা একবাক্যে স্বীকার করল, একেবারে রাজযোটক। বিশাল হল ঘরে অবশ্য স্তিমিত আলো জ্বালা। ঘরের মেঝে জুড়ে নীল মোটা কার্পেট, একেবারে রাজসিক ব্যাপারস্যাপার। ঘরে আশ্চর্য সুঘ্রাণ। মনোরমা তার দিকে তাকিয়ে আছে। মনোরমার আঁখি পল্পবে মধুর গুনে তার চোখ ছানাবড়া।
কী, তোর পছন্দ!
তপা গাড় কাত করে দিল। অর্থাৎ সে রাজি।
মনোরমা দাঁড়িয়ে বলল, আপনি তপোময়, আপনার কোনো অপছন্দের কাজ আমি করব না, কথা দিতে পারি। তবে চোখে দেখি না। আপনার মুখ স্পর্শ করে টের পেতে চাই আপনি দেখতে কেমন। স্পর্শ গন্ধ এ-সবই আমার সম্বল। বলে তার সামনে এসে দাঁড়াল, কোনো জড়তা নেই। তপোময়ের নাক মুখ স্পর্শ করে বলল, তপোময় আপনি আমার স্বপ্নের মানুষ। আমার অপেক্ষা সার্থক।
তপোময় বিস্মিত। যথেষ্ট ক্রোধেরও সৃষ্টি হল। মামা-মামি ষড়যন্ত্র করে একজন অন্ধ মেয়েকে তার ঘাড়ে চাপিয়ে দিল।
অথচ হাঁটাচলায় মনোরমা একেবারে স্বাভাবিক। কোনো জড়তা নেই। দীর্ঘাঙ্গী মেয়েটির হাঁটাচলা এত সহজসাধ্য হয় কী করে! মনোরমা কী তঞ্চকতা করছে তার সঙ্গে, কিংবা পরীক্ষা। কিন্তু মুখ দেখে তো মনে হচ্ছে আশ্চর্য সুখানুভূতি সৃষ্টি হচ্ছে তার মধ্যে। ঘরে খুবই সুগম্ভীর পরিবেশ— কারণ সমবেত আত্মীয়স্বজন, এমনকী মদন সাহেবও আশা করতে পারেননি মনোরমা তার দৃষ্টিহীনতার কথা অকপটে স্বীকার করবে। উভয় পক্ষই মনোরমার দৃষ্টিহীনতা গোপন করে যেতে চেয়েছিল। কারণ তারা জানে মনোরমা খুবই অনুভূতিশীল–শব্দ, ঘ্রাণ এবং স্পর্শের সাহায্যে তার চলাফেরা নিজ পরিসরে অনায়াস সহজসাধ্য হয়ে যায়। তপার মতো বেল্লিক, পাত্রীটি যে অন্ধ টেরই করতে পারবে না—
তপোময়ের পাশে তখনও মণিমালা দাঁড়িয়ে আছে, আর এখন লিখতে হবে না। কী দেখছ?
গোপাল মামার কথা মনে আছে মণিমামা?
আছে। তিনি না থাকলে তোমাকে পেতাম কোথায়!
আমিও তাই ভাবি। কেউ তা জানে না— তুমি মনোরমা ছিলে। এখন মণিমালা। কেউ তো জানে না, তুমি জন্মান্ধ। চোখে কম দেখতে পাও এমন তারা জানে। বিধাতা তোমার দৃষ্টি কেড়ে নিয়েছিলেন। কিন্তু প্রকৃতি তার রূপ, রস, গন্ধ দিয়ে ভরিয়ে দিয়েছে তোমাকে। এক আশ্চর্য অনুভূতিশীল জগতের তুমি বাসিন্দা।
