সাহেব হঠাৎ উঠে বসল, বলল, তালে দ্যাশ থেকে ময়নাকে নিয়ে এলেই হয়। যত মেয়েছেলে, তত তীর্থের মাহাত্ম। চুল্লি জ্বলছে কাঠ তো লাগবেই। তুমি না। পারলে আর কেউ সাপ্লাই দেবে।
৩.
সেই থেকে গোপালের মাথায় ক্যাড়া উঠে গেছে। ভৈরবীদের আখড়া বানালে গাঁজা, ভাঙ, মদ, কীর্তনের দল, বলতে গেলে এক বিশাল গ্যানজাম, তার পর পাপীতকী দ্বাদশী ব্রত, বীরাষ্টমী ব্রত, শিবরাত্রি ব্রত, এবং শিবলিঙ্গে আকন্দ ফুল ধুতুরা ফুল এবং বিল্বপত্র দিতে পারলে জমে যাবে জায়গাটা। আর শ্মশানঘাট যখন অনতিদূরে অবস্থিত।
কিন্তু চানুকে কিছুই বলতে সাহস পাচ্ছে না। হেতু চাই। তপাকে দিলে বলালে হয়। তপা নবীন যুবক, মাথার কোঁকড়ানো কেশ ঘাড়ের কাছে নেবে এলেই গৌরাঙ্গ প্রভু হয়ে যেতে পারে। সুশ্রী যুবককে যদি ভজিয়ে এই ত্রিনাথের মেলায় ভিড়িয়ে দেওয়া যায়। তপার দিকে তাকালেই গোপাল ভাবে, যদি মগ্নভাবে শিবস্তোত্র পাঠ করে তপা, তবে আর দেখতে হবে না। রমণীরা তার মগ্ন স্বভাবে ভগ্ন না হয়ে পারে না।
চানু সকালে উঠেই গঙ্গাস্নান সেরে আসে, তার পর করবীফুল ধুতুরা ফুল এবং অন্য সব ফুল সংগ্রহের আগে গাছে গাছে জল দেয়। কখনো পাও সকালে গঙ্গাস্নানে যায়, তপা চানুর ন্যাওটা হয়ে গেছে। লম্বা উঁচু হারমাদ চেহারা নারী মাত্রেই পছন্দ করে। চাকরি দেবার নামে তুলে এনেছে। তপা রোজই আশা করে, ঠিক একদিন মামা তার শুভ সংবাদটি নিয়ে আসবে, কে এক পাগলা সাহেব, বলেছেন, আরে তোমার ভাগ্না রত্নবিশেষ। তার কখনো চাকরির অভাব হয়!
মামা, তোমার পাগলা সাহেব আর কিছু বলল! পাগলা সাহেব নারে, মদন সাহেব। খুব পরিষ্কার মাথা, তোকে নিয়ে আমি এক জায়গায় যাব।
কোথায়?
চল, গেলেই দেখতে পারবি।
তপা যে কী করে। এবং সে না যাওয়ায় পাগলা সাহেব নিজেই হাজির। তার পর তিনি কেন যে বললেন, বিবাহযোগ্য চরিত্রবান পাত্র পাওয়া দুষ্কর।
তপা বুঝল না, কাকে কথাটা তিনি বলছেন।
চানুমামি একটি গৈরিক রঙের শাড়ি পরে বারন্দায় হাজির। মেদবহুল মানুষটি ভাঙা চেয়ারে বসে আছে। গোপাল মামা ফাঁক বুঝে ছিলিম বানাচ্ছে–মামার এই সব অপকর্মের কথা তপা আগেই জানে। এই পরিবেশে ধাতস্থ হতে তার সময় লাগেনি। কাজেই মামা যখন জানালেন, সাহেবের কন্যেটি তোকে দেখতে আসবে, মদন সাহেব নিজেই নিয়ে আসবেন। আরে তুই তো রাজা রে তপা। সাহেবের একমাত্র কন্যে। কথা বলতে লজ্জা করবি না। বিবাহটাও একটা কাজ। মেয়ের দৌলতে তোর ভাগ্য ফিরে যেতে পারে। তোর মামিকে যে রাজি করাতে পারছি না। তা এলে পরে কি আর তাড়িয়ে দিতে পারবে!
সে কোনো উত্তর দিল না।
কীরে কথা বলছিস না কেন?
তপা শুধু নদীর দিকে তাকিয়ে আছে। পাখিদের ওড়াউড়ি দেখছে। আমবাগানের ছায়ায় দাঁড়িয়ে থানের মাহাত্ম্য বোঝার চেষ্টা করছে। নদীতে কত জল, মাঝে মাঝে দখিনা বাতাসে মানুষ পোড়ার গন্ধ আসছে। মানুষ মরে গেলে তাকে পুড়িয়ে দেওয়া একটি পুণ্য কাজ। এসবই মামার বচন। জন্মালেই মরিতে হয়, অমর কে কোথা হয়। ভয়ের কোনো কারণই থাকতে পারে না। যৌবন জ্বালায় নারীপুরুষের সংসার। সেও এক অগ্নিকুণ্ড। তোর মামি তার জ্যান্ত উদাহরণ। রাতে কাজে যেতে হয়—তোর মামি তখন স্বাধীন। সুদাম খুবই বেইমান জানিস। আমি বাড়ি নেই জানতে পারলেই থানের সিঁড়িতে এসে বসে থাকে। কাহাতক সহ্য হয়। নেশার ঘোরে মামার কোনো কথা বলতে আটকায় না। মাত্রাজ্ঞান হারিয়ে মামির বিরুদ্ধে কুৎসিত গালিগালাজও শুরু করে দেয়।
চানুমামি খেপে যায়।
অনেক ঢ্যামনা দেখেছি বাপু, তোর মামার মতো ঢ্যামনা কোথাও একটা খুঁজে পাবি না, একদণ্ড দেখতে না পেলেই মাথা খারাপ। ঢ্যামনামি আর কত সহ্য করা যায়।
তপা শুধু শোনে। সে কোনো মন্তব্য করে না। কারণ সুদাম মামার গাঁজার আচ্ছায় না এলে তাকেই পাঠায় খোঁজ করতে। এই সব নেশাভাঙের আসরে সুদামের যথেষ্ট কদর আছে। সে যথেষ্ট উচ্চস্তরের ছিলিম প্রস্তুতকারক। সেই সুদামের সঙ্গে আবার মামিকে নিয়ে তার সংশয়বাতিক–তপা কেমন বিব্রত বোধ করে। সে কখনো থান ছেড়ে নদীর পাড় ধরে হাঁটা দেয়। কখনো কোনো নৌকায় গিয়ে বসে থাকে। বাবা-মা-ভাই-বোনেরা যে সবাই অপেক্ষা করে আছে।
মামা একটা লুঙ্গি পরে ফের মন্দিরের চাতালে ল্যাংচাতে ল্যাংচাতে নেমে আসছে। কারণ মামার কথায় সে কোনো জবাব দেয়নি।
মদন সাহেবের একমাত্র কন্যে। গাড়িবাড়ি সব তোরই হবে। মেয়েটি দীর্ঘাঙ্গী। কমলাক্ষী মেয়ে। খুবই সুন্দরী। খুব ধীর স্থির। দেখতে দোষ কী! প্রকৃতই সে মনোরমা।
তপা উচ্চাকাঙক্ষা। কত স্বপ্ন তার, একটা কাজ হয়ে গেলে, সে রাতের কলেজে ভর্তি হবে। আরও নানা স্বপ্ন। একজন বেকার যুবকের সঙ্গে মনোরমার বিবাহকে সে মামার একটা ফাঁদ ছাড়া কিছুই ভাবে না। সাহেব খুশি হয়ে তাকে একটা প্রমোশনও দিতে পারে। নাইট ডিউটি থেকে রেহাইও দিতে পারে।
তপা না বলে পারল না, মনোরমা-টনোরমা ছাড় তো। বাড়াবাড়ি করলে চলে যাব। নিজেরই কোনো সংস্থান নেই… কোথাও পেট ভরে খেতে পাই না বলে পড়ে আছি।
-রাগ করিস না। রাগ করলে ঘিলু গরম হয়। আখেরে লাভ হয় না। সেই জন্যই তো তোর হিল্লে করতে চাইছি। সাহেবের ক্ষমতা কত জানিস। বিয়ে করলেই চাকরির পাকা বন্দোবস্ত। সাহেবের খুব পছন্দ তোকে। দ্যাখ তপা, হাতের মোয়া রাস্তায় ফেলে যেতে নেই। চাকরি পেলে দিদি-জামাইবাবুকে কলকাতায় এনে রাখতে পারবি।
