কী সূত্রে।
দেশের কালীবাড়ির সুত্রে!
রহমান সাবের বাড়ি কোথায়?
দুপতারায় বলল।
হাজি সাহেবের বাড়ির লোক।
অত সব জানি না। বড়দি, মেজদি, সেজদি-র কথাও বলল। সবাইকে চেনে। দেশের মানুষ ছ্যাঁচড়। কাজ করে বেড়াবে। রহমান সাহেবের নিজেরই যেন অপমান।
তার ক্ষমতা কত।
আরে তিনি ওয়েলফেয়ার অফিসার।
বীরেনবাবু তারও চেনা। আলু, পটল, কুমড়ো যখন যা দরকার বীরেনবাবু তার দোকান থেকেই নিতেন। তাজা সবজির সুনামও ছিল—ধার বাকিতে যে যা চেয়েছে দিয়েছেন, ব্যাবসা না বাড়ালে চলে না—যত বেশি বিক্রি তত বেশি লাভ। লাভের গুড়ি পিঁপড়েয় খায়, ধার দেনায় শেষে মাথা খারাপ—উপারে জোর কম, বাঁ পা সরু লিকলিকে, তার পর খাটো, হাঁটতে গেলে পা সোজা পড়ে না, ঘুরিয়ে পড়ে। তবে গোপাল ল্যাংড়া হলে কী হবে, তার বউ চানু খুবই সুন্দরী, বড়ো কষ্টে থাকে, কী আর করা, চানুর চোখের দিকে তাকালে বড়ো মায়া হয়। দুপতারায় যে গোপালের বাড়ি—ঢাকা জেলার লোক রহমান সাহেব, শ্বশুরের সম্পত্তি, পার্ক স্ট্রিটে বাড়ি, খুবই মেহমান আদমি, সেই সুবাদে বীরেনবাবু রহমান সাবকে বলেছিল, আপনার দেশের লোক তো নেশাভাঙ করে রাস্তায় পড়ে থাকে। আর লম্বাচওড়া বাত ঝাড়ে, আরে আমরা কি ভিখারির জাত, পড়ে আছি না মরে আছি বুঝি না, দুপতারার কালীবাড়ি চেনে না এমন কোন মানিষ্যি আছে। চাকরিটা শেষে হয়ে গেল দুপতারার সূত্রে।
প্রতিবন্ধী বলেও হতে পারে।
সে যাই হোক সরকারি চাকরি। সপ্তায় সপ্তায় মাইনে—মনাঠাকুর কেদার বদরি তীর্থ করতে যাবেন। দশ টাকার ভাড়াটে চানু আছে, গোপাল আছে, ত্রিনাথের মেলা আছে, মন্দিরের পূজা-অর্চনা অসুবিধে হবে না। মনাঠাকুর একা মানুষ। শিবলিঙ্গ পূজা করে নদীর পাড়ে সাধনায় মত্ত, চিনকে দেখলে তার মাথা ঠিক থাকে না—মেয়েটি বড়োই মিষ্টভাষী, সে তার জপতপে সাহায্যও করে। গোপাল গাঁজাভাঙ খায়, ভাল খোল বাজায়, ত্রিনাথের সেবার কাজে লাগবে। কী দিনকাল পড়ে গেল গাঁজাভাঙ খায় এমন লোকই ধরা যায় না। ঘাটের লোকজন এ দিকটায় বিশেষ মাড়ায় না, মনা মনে মনে স্যাঙাত খুঁজছিল। গোপাল সেন্ট পারসেন্ট ঠিক লোক। চানুকে রাতে পাহারা দেয়ার জন্য রতনবুড়িকে নিজেই ডেকে পাঠিয়েছিল। কারণ মতিভ্রম বড়োই মারাত্মক ব্যাধি। গোপাল রাতে ডিউটি করে। চানুর পক্ষে জটাজুটধারী মনাঠাকুরের সঙ্গে রাতে একা থাকলে কেলেঙ্কারি হতে কতক্ষণ। সাধন ভজনে বিঘ্ন ঘটে এমন কাজ না কখনো করে না।
সেই যাই হোক, বিশ্বযুদ্ধ শেষ। গানশেলে আর বন্দুক কামান তৈরীর ঝামেলা নেই–অর্ডার না এলে কর্তৃপক্ষেরও দায় নেই। তবু বসে থাকলে চলে না। প্রডাকশান চাই–বালতি, মগ, বন্দুকের নল, জোড়াতাপ্পির কাজ আর কি। হাজিরা দিলেই কর্তৃপক্ষ খুশি। সুপারভাইজার মদন সাহেব হা হুতাশ করেন—দেশের কী হাল হল রে। দেশটাকে খণ্ডবিখণ্ড করে বাবরা সব তালপাতার পাখায় হাওয়া খাচ্ছে। মিনি মাগনায় স্বাধীনতাযুদ্ধ নেই, বীরত্ব নেই। গান্ধী মহারাজকে খুন করে বীরত্ব ফলানো হচ্ছে। এ দেশের কখনো উন্নতি হয়!
গোপাল তখন মৌতাতে একেবারে ভিজে আছে। ছিলিম বানাচ্ছে। সেও খাবে সাহেবও টানবে।
তার বড়ো দুঃখ।
দীর্ঘশ্বাসও ওঠে।
বুঝলে সাহেব। সব কপাল। দেশ ভাগ না হলে শনি মঙ্গলবারে পাঁঠার মাথা খাওয়াতাম তোমাকে। নেশা করলে ভালোমন্দ খেতে হয়। দুধ, মাংস না খেলে শরীর ঠিক থাকে না। তার পর বড়ো লেদ মেশিনের আড়ালে দুজনে বসে ঝিম মেরে থাকে—কী গোপাল কী বুঝছ। চানুর জন্য চিন্তা হচ্ছে!
এই হল মুশকিল গোপালের। পেটে কথা রাখতে পারে না। চানুর সব কথাই মদন সাহেব জানে। চানুকে নিয়ে সংশয়ও কম না গোপালের।
আর চিন্তা। কী কয় জানেন, তার কোমলাঙ্গে হাত দিতেই দেয় না। বলে কি না আমার কোর হয়েছে। কোরণ্ড রোগটা কী সাব?
বীচিতে জল জমেছে। তুমি টের পাও না গোপাল।
খুব কঠিন অসুখ সাহেব?
না না। কবিরাজি দেখাও। সেরে যাবে।
সব তো বুঝি সাহেব। এ দিকে যে মনাঠাকুর ফিরছে না আর। চিঠিপত্রও নাই। কত দিন হয়ে গেল। সব ত্রিনাথের নামে জিম্মা দিয়ে গেছে। শনি, মঙ্গলবারে ত্রিনাথের কীর্তন, খিচুড়ি প্রসাদ, হেমার মাকে রেখে দিয়েছি। চানু একা করে উঠতে পারছে না। এ দিকে ভাগ্না হাজির। আই. এ. পাস। তবে চানু খুব খুশি। শত হলেও সমবয়সি তো। সাহেব এই আপনার পায়ে ধরে বলছি, চানুর জন্য শুধু প্রাণপাত করছি। চানু না থাকলে, আমি যে মরা লোক। তার পরই গোপাল কাঁদতে থাকল—ভাগ্নাটাকে নিয়ে বড় চিন্তায় আছি। কোথাও জুড়ে দিতে পারলে চানুর কাছে আমার মুখ থাকবে না। আপনি পারেন সাব, জুড়ে দিতে পারলে চানু বলেছে, তার কোমলাঙ্গে আর হাত দিতে দেবে না।
কথা শেষ হয় না—আমার মেলা পাপ সাহেব। পাপের ফলে কোর অসুখ। কী করেছি। দেশে হারান পালের বউ আমার জন্য কী করেছে। রাতে বিরাতের শয্যাসঙ্গিনী। মাগির বড়ো খাক ছিল—বাপ আমার সেবাইত, মন্দিরের টাকা-পয়সা লুট করে ময়নাকে দিতাম।
ময়নাটা কে আবার।
সাহেব, তোমাকে ভক্তি করি, তুমি দুর্গাস্তোত্র পাঠ করো। দুর্গাস্তোত্র পাঠ করলে অমৃত লাভ হয়। সেই শয্যাসঙ্গিনীর নাম ময়না।
সাহেব চোখ বুজে আছে। গোপাল অজস্র কথা বলে যাচ্ছে। গাঁজাভাঙ খেলে এক একজনের এক একরকম প্রতিক্রিয়া হয়। কেউ চুপ করে থাকে। কেউ কথা বলে। কেউ পায়ের কাছে হত্যে দিয়ে পড়ে থাকে।
