সেই জোড়ামন্দিরের নস্করবাড়ির বস্তি থেকে রওনা হওয়া গেল। পয়সার তখন খুব দাম। এক আনা দু-আনা হলে অনেকটা রাস্তা যাওয়া যায়। কিন্তু হাঁটার অভ্যাস থাকলে এক আনা দু-আনাও খরচ করতে খারাপ লাগে তার। বলতে গেলে কপদ শূন্য সে জোড়ামন্দির থেকে রতনবাবু রোড হেঁটেই মেরে দেবে ভাবল।
যে কটা আনি, দু-আনি পকেটে আছে থাক। কত যত্ন, আনি, দু-আনি না আবার হারায়। জোড়ামন্দির থেকে বরানগর পর্যন্ত রাস্তাটা তার চেনা। শিয়ালদহ, শ্যামবাজার হয়ে– এতটা হেঁটে ক্লান্ত লাগছিল খুব। খিদেও পেয়েছে। বাজারের পেছনের দিকের রাস্তাটা খোঁজা দরকার। বাজার পার হয়ে বাঁদিকে কাচা সরু গলিতে ঢুকে সে হতবাক। বাড়ির কোনো নম্বর নেই। নালা নর্দমা আর দুর্গন্ধ চারপাশে। মাটির দেয়াল, টালি না হয় খাপড়ার চাল। মশা-মাছিতে ভন ভন করছে। পথ চলতি মানুষজনের বিশেষ সাড়া পাওয়া যাচ্ছে না। এই দুপুরের রোদে বস্তির মধ্যে কোনো আই. এ. পাস যুবা ঢুকে গেলে অস্বস্তিরই কথা। কী না কি মতলবে ঘুরছে।
কাকে চাই?
গোপাল চক্রবর্তী।
গাঁজালু গোপাল, না নাড়গোপাল।
আজ্ঞে ল্যাংড়া গোপাল।
গোপাল কে হয় তোমার? এখন আর সে শুধু ল্যাংড়া না। গাঁজা ভাঙও খায়। হাফ সাধু।
আজ্ঞে মাতুল।
কেমন মাতুল।
মায়ের সহোদর ভাই।
সোজা চলে যাও। সামনে গঙ্গা পাবে। শ্মশান পাবে। তার পরেই স্যাঁতলা ধরা বেওয়ারিশ মন্দির। গোপাল ওটা জবরদখল করে আছে। আর গ্যাঁজা যুক্ত আলু হয়ে আছে। গ্যাঁজালো গোপাল বলেই লোকে তাকে চেনে।
শ্মশান!
শ্মশান সংলগ্ন মন্দির।
সে খুবই ঘাবড়ে গেল। গ্যাঁজা যুক্ত আলু বিষয়টা যে কী তাও বুঝল না। তার পর কি না শ্মশান সংলগ্ন মন্দির। যত দূর চোখ যায় সার সার বস্তি তার পর আমবাগান, তার পর নদীর জল, তার পর মানুষপোড়া গন্ধ। খালি পেটে তার কেমন ওক উঠে আসছিল।
২.
নদীর পাড়ে বাড়ি।
শ্মশান লংলগ্ন বাড়ি তো নয়ই, বরং আমবাগানের এক কোনায় মন্দির এবং বাড়ি।
ঠিক বাড়িও বলা যায় না, কারণ বাড়িটার একাংশে মন্দিরের ত্রিশূল পোঁতা আছে।
চার পাশে পাঁচিল। কিছু জবাফুলের গাছ। পাঁচিলের পাশ দিয়ে নদীর পাড়ে পাড়ে রাস্তা। রাস্তাটা ধরে হেঁটে গেলে আলমবাজার জুট মিল।
সবে দেশ ভাগ হয়েছে। রিফিউজি বলে খালি জমিতে বসে পড়লেই হল। তবে গোপাল মামা দেশ ভাগের আগেই এ দেশে চলে আসে। দাদুর জমিজমা মেলা। পুত্রের প্রতি বিরাগভাজনের হেতু মাঝে মাঝেই দাদুর সিন্দুক থেকে টাকা চুরি করে উধাও হয়ে যেত। নাবালিকা স্ত্রীকে ফেলে শহরে গঞ্জে ঘুরে বেড়াবার স্বভাব ছিল মামার। সাধুসঙ্গ থেকে জুয়ার ঠেক এবং সব বিষয়ে কেমন বিপরীত ধর্ম।
কলকাতায় চানু মামিকে নিয়ে আসবে বলে একবার দেশে যায়। এবং মামিকে শেষে কোথায় নিয়ে তুলবে এই আতঙ্কে দাদু এবং আত্মীয়স্বজনেরা বাধা সৃষ্টি করলে–গোপাল তার সহধর্মিণীকে নিয়ে রাতে পালায়। চার ক্রোশ রাস্তা হেঁটে বারদির স্টিমারঘাট, তার পর নারাণগ’, তার পর গোয়ালন্দ-সারা রাস্তায় চানুকে এই বলে ভজিয়েছে—তোর ভাবনা কী। ডাইক্লিনিং খুলেছি। সে বাপের টাকা নষ্ট করেনি, বরং চানুর কথা ভেবেই রাতে তার ঘুম হয় না, দশ টাকা ভাড়ার এক কামরা ঘরও ঠিক হয়ে আছে, সুতরাং অতঙ্গের কোনো কারণ থাকতে পারে না।
কলকাতায় এসে মামার থিতু হতে যে দু-চার বছর কেটেছে, সে খবরও তপার কানে উঠেছে। কারণ তপা বাড়ি গেলেই মা কপালে করাঘাত করে মামার সব কুকর্মের কথা সহজেই বলত।
সব আত্মীয়স্বজনের কাছেই মামার জন্য দাদু যে খাটো হয়ে আছে, আরে চক্রবর্তী দাদা, আপনার বড়ো পুত্র নাকি বউ নিয়ে রাতে পালিয়ে গেছে।
তা গেছে, গেলে কী করব!
মা বলত, তোর দাদুর মুখে চুনকালি। কড়া পাহারা, তুমি যাও ঠিক আছে, চানু যাবে না। কোথায় নিয়ে কোন ঘাটে ফেলবে কে জানে। নিজেরই ঠাঁই নেই তার আবার কলকাতায় বউ নিয়ে থাকার বাসনা। এবং মামা সব রকমের অপকর্মে ওস্তাদ লোক।
পুত্রবধূর কপালে শেষে কী লেখা আছে কে জানে।
দাদু বিষয়ী লোক, তার বড়ো পুত্র শেষে এতটা উচ্ছন্নে যাবে, অভাব তো ছিল, জমিজমা, কালীবাড়ির বিষয়-আশয় দাদর পক্ষে একা সামলানোও কঠিন। নিত্যপূজা, শনিবার, মঙ্গলবার মানতের শেষ ছিল না—পাঁঠাবলি, কিংবা কেউ কালীবাড়ির মাঠে পাঁঠাও ছেড়ে দিয়ে যেত, এত সব থাকতেও পুত্রটির দুর্মতিতে কাহিল দাদু, দেশভাগ হয়ে গেলেও এত বিষয়-আশয় ফেলে এ দেশে তার পক্ষে আসা সম্ভব নয়, ছোট পুত্র নেপালও এক সকালে জানিয়ে দিল দাদা চিঠি দিয়েছে, উইমকো ফ্যাক্টরিতে তার কাজ ঠিক হয়েছে। সে চিঠি পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে রওনা হয়। থাকার এক কামরার বাসায় এসে উঠলে দু-ভাই আর চানু মিলে ঠিক সংসার চালিয়ে নিতে পারবে, গাঁয়ে পড়ে থাকলে পচে মরতে হবে–কে চায় গাঁয়ে থেকে পচে মরতে।
অবশ্য এই সময়ের মধ্যে ডাইক্লিনিং লাটে উঠেছে। বরানগরের বাজারে তরকারি বিক্রির কারবারে লেগে গিয়েও সুরাহা করতে না পারায়, চানুমামিই সাহস জুগিয়ে গেছে।
গানশেলে লোক নিচ্ছে।
কে বলল?
সমর কাকা।
বীরেনবাবু।
উনি তো গানশেলের মনিব। উনি বললেই হয়ে যাবে।
আরে ঠিক হয়ে যাবে। আমাকে বলেছে-বউদি গোপালকে পাঠিয়ে দেবেন। দাদাকে রহমান সাহেব চেনেন।
