মণিমালা
তপোময়ের লেখালিখি মাথায় উঠেছে। কিছুই লিখতে পারছেন না। কিছুটা হতাশাও। বয়স হয়ে গেলে এমনই বুঝি হয়। গত তিন-চার মাসে তিনি একটা লাইনও লেখেননি। লেখার কোনো প্রেরণা পাচ্ছেন না— প্রেক্ষিতবিহীন এক শূন্যতার মধ্যে তিনি ডুবে যাচ্ছেন। তিনি চুপচাপ বসে থাকেন জানালায়। স্ত্রী মণিমালা সব টের পায়। আবার সেই অর্থহীন দৃষ্টি। মানুষটা তার জানালায় চুপচাপ কী দেখছে। সেই এক শূন্যতার শিকার তপোময়। মণিমালার ভয় হয়।
কোথাও থেকে ঘুরে এস না!
কোথায় সেটা।
কোনো পাহাড়ে, কিংবা নদীর ধারে।
ঘুরে কী হবে! লিখতে বসলে যে শব্দই খুঁজে পায় না, শব্দরা কেমন হারিয়ে যাচ্ছে। গদ্যের প্রয়োজনে যথার্থ শব্দটি কুয়াশায় কেমন ঢেকে যায, তুমি ঠিক বুঝবে না মণি— এই ব্যর্থতা যে কী নিঃসঙ্গতা সৃষ্টি করে! বড়ো কষ্ট হয়।
বাজে কথা রাখো তো। আসলে দিন দিন কুড়ে হয়ে যাচ্ছ। যশ প্রতিপত্তি সবই অর্থহীন মনে হলে এটা হয়।
মণি, লেখার চাপ বাড়লে আমার মাথা ঠিক থাকে না।
না লিখলেই পারো। কিছুদিন বিশ্রাম নাও। অনেক তো লিখলে, লেখার চাপে মাথা খারাপ করে বসে থাকলে শরীরের ক্ষতি, বোঝ না।
তপোময়ের মুখে কিঞ্চিৎ হাসির রেখা—এই চারপাশ, এই মানুষজন, এবং এই জীবনের কুহেলিকা তাকে কত কিছু লিখিয়েছে। নাম যশও কম হয়নি। আর কেন যে এ সময়ই এক ভীতি গ্রাস করছে তাঁকে, লেখা যদি নিম্নমানের হয়ে যায় তার গদ্যের ভাঙচুরে যে আশ্চর্য মোহ আছে যদি তার প্রকাশ আর ঠিকঠাক না হয়! এই শব্দসমূহ যদি চরিত্রের প্রাণ সৃষ্টি করতে না পারে! তাজা এবং জীবনের ঐশ্বর্য যদি চরিত্রে ধরা না যায় তাঁর জীবনপ্রণালী থেকে জন্মানো শব্দকণার যাবতীয় সৌন্দর্যকে তিনি যদি দক্ষ স্বর্ণকারের মতো গেঁথে দিতে না পারেন যাতে চরিত্রটি জীবন্ত এবং শ্রীহীনতায় শ্রীময় হয়ে উঠতে পারে কোনো এক সমালোচক যে তাঁর গল্প সম্পর্কে আরও লিখেছেন—তিনি গল্পের ছাঁচ মানেন না, ক্রাফটের ব্যাকরণেরও ধার ধারেন না— এক আশ্চর্য রোমান্টিক বোহেমিয়ানিজম কাজ করে যায় তাঁর বিবৃতিতে, মাঝে মাঝে বিবৃতির ছলনায় উড়িয়ে দেন জীবনের সব নির্ধারিত সত্যকে। বোধ হয় আঙ্গিক হিসাবে ছোটো গল্পের নিজের দেহেই রয়েছে এক অপরিমেয়তা। কোনো সংজ্ঞায়ই একে ঠিকমতো সংজ্ঞায়িত করা যায় না। এর ব্যাপ্তি বিপুল, সম্ভাবন অসীম, বৈচিত্র্যে অনন্ত। অথবা নক্ষত্রের মতো দূরাতীত রহস্যে ঘেরা এই সব গল্প সেই অনন্তকে স্পর্শ করতে চায়।
আসলে এটাই তাঁর আতঙ্ক যদি গল্পের চরিত্র সেই অনন্তকে স্পর্শ করতে না পারে। শব্দের এত আকাল, সে যে কী করে!
এই সময় সহসা একটা মুখ জানালায় ভেসে উঠল। একজন খোঁড়া মানুষ লাঠিতে ভর করে দাঁড়িয়ে আছেন। মুখ যেন খুবই চেনা। ঠিক চিনতে পারেছেন, গোপাল মামা। স্মৃতিতে গোপাল মামা হাজির হলে তার সব মনে পড়ে। তখন তো তিনি আই. এ. পাস করেছেন সবে। কলকাতায় ভেসে বেড়াচ্ছেন। আত্মীয়স্বজনের বাসায় কখনো দু-বেলা আহার জুটে যেত। চিনি কাকা, টুক্তি পিসি, ভালো কাকা, নেপাল মামা এই সব ছিল তার ঠিকানা। আত্মীয় ঠিক, তবে তাদেরও কিছুটা দারিদ্র্য আছে। একবেলা দু-বেলা থাকার পর তারই সঙ্কোচ হত। বেকার যুবকের যা হয়ে থাকে। গোপাল মামা, নেপাল মামা তার মায়ের দুই ছোটো ভাই। বরানগরের রতনবাবু রোডে, দু-জনই আলাদা থাকে–মামিরা দেখতে খুবই সুন্দরী। নেপাল মামার শিফট ডিউটি। গোপাল মামার নাইট ডিউটি, কাশীপুর গানশেলের ঝালাই-এর কাজ করে। সপ্তাহে মাইনে। ফুরনে কাজ। পঁচিশ-ত্রিশ টাকা হপ্তায়। প্রবল নেশাভাঙের অভ্যাসও আছে। কোনো সন্তান নেই।
দেশ থেকে চিনিকাকার ঠিকানায় বাবার চিঠি এল।
খোকা, তোমার গোপাল মামার চিঠি এসেছে। তুমি কোথায় থাক কলতাতায়, কী করছ, কোথাও চাকরি জোটাতে পারলে কি না, আই. এ. পাস করে বসে থাকা অন্যায়, তোমার বাবাও যে বেকার, এই সব কারণে গোপাল খুবই চিন্তিত। দিদি যে ভালো নেই, অভাবে অনটনে দুবেলা ভাত জোটানো দায়, তার আই. এ. পাস ছেলে কলকাতায় বেকার, সে বিশ্বাসই করতে পারছে না। আই. এ. পাস সোজা কথা! ফ্যাক্টরির বাবুরা আই. এ. পাস তো দুরের কথা, কেউ কেউ কোনও পাসই না। তাদের কী রোয়াব। শেষে তোমার গোপাল মামা লিখেছেন, তপাকে আমার বাসায় আসতে বলবে। আমার সঙ্গে যেন দেখা করে। আমি ফ্যাক্টরিতে চলে গেলে চানু একা থাকে। পাশের বাড়ির রতন বুড়ি অবশ্য রাতে শোয়। এখানে এলে চেষ্টা চরিত্র করে গানশেলে ঠিক ঢুকিয়ে দিতে পারব। বাবুদের বললে তারা ঠিকই একটা ব্যবস্থা করবে।
ধীরে ধীরে কলকাতায় তাঁর আত্মীয় পরিজনের সংখ্যা বাড়ছে। এই করে গোপাল মামা নেপাল মামারও খোঁজ পাওয়া গেল। এক সকালে পিসিই তাঁকে ঠেলে পাঠালেন, যা একবার তোর মামার বাসায়। তোর পিসেমশাই সুরজমল নাগরমল অফিসে চেষ্টা তো করছে। কথাও দিচ্ছে, কিন্তু কাজ হচ্ছে না। কী করা। দ্যাখ তোর মামারা যদি কিছু করতে পারে।
ঠেলা না খেলে সে পিসির বাসা ছাড়ছে না এমন ভেবেই হয়তো সকালবেলায় ঠেলে প্রায় বাসা থেকে বের করে দিলেন পিসি।
চিনিকাকা আর ভালোকাকা ছাড়া তার আত্মীয় স্বজনরা সবাই যে বস্তিবাসী সে জানে এবং ভেবেছিল গোপাল মামা কিছুটা সচ্ছল, তাঁর বাসাবাড়িতে দালান কোঠা থাকতে পারে।
