এও ঠিক, ভাগু জবাবে একটা কথাই বলে।
এই ভাগু, সিঁড়িতে জল পড়ে আছে। মুছে দিয়ে আয়।
ভাগুর উত্তর, বেশ।
এই ভাগু, ধনেটা বেটে দে আগে।
বেশ।
এই ভাগু, ছাদ থেকে জামাকাপড় নিয়ে আয়।
বেশ। বলেই সিঁড়ি ধরে উপরে উঠে যাওয়ার শব্দ।
মানস তন্ন তন্ন করে খুঁজছে তখনো। ভাগু ঠিক পালিয়ে রেখেছে চিরুনিটা। চিরুনির উপর বোধহয় জন্মগত লোভ আছে ভাগুর। যেদিন এ-বাড়িতে ভাণ্ড আসে, চুল একেবারে তার যেন বাবুইর বাসা। কতকাল চুলে তেল না দিলে মাথা না আঁচড়ালে এমন হয় সে জানে না। মাথার চেয়ে খোঁপা বড়ো। নীতি ওর একটা পুরোনো চিরুনি দিয়েছিল, সাবান সোডা দিয়েছিল এবং নারকেল তেল দিলে আশ্চর্য হাসি ফুটে উঠেছিল মুখে। ভাগু নারকেল তেল নিয়ে ছাদে উঠে গেছিল। সারা বিকেল ওকে আর নীচে দেখা যায়নি। চুল পরিপাটি করে নেমে আসার পর মনে হয়েছিল, জীবনে তার আর কোনো দুঃখ নেই। তাকে সারাদিন খাটালেও সে আর ব্যাজার হবে না। একসঙ্গে এত জীবনে সে কোনোদিন বুঝি পায়নি।
মানস ফের ভাগুকে ডেকে বলল, কে নেবে! তুই না নিলে কে নেবে! কে ধরবে। তবু একবার বাসন্তীকে ডেকে বলল, তুই নিয়েছিস?
বাসন্তী অবাক হয়ে বলল।আমি আপনার চিরুনি দিয়ে কী করব!
সত্যি তো-বাসন্তীর চিরুনির দরকার নেই। মাস দু-এক আগে মাথা ন্যাড়া করার চুল খুবই ছোটো। সজারুর কাঁটার মতো চুল তার দাঁড়িয়ে থাকে। ছোটো হাত-চিরুনিই ওর যথেষ্ট। সে এত বড়ো চিরুনি দিয়ে কী করবে।
সহসা মনে হল, ভাগু সব পারে। যতই মেনি বিড়ালের মতো থাকুক, ভেতরে কূট বুদ্ধি খুব। নইলে মাথা ন্যাড়া করার দিন ভাগু মাথা ব্যথায় চিৎকার করবে কেন। কিছুতেই কলপাড়ে নিয়ে যেতে পারেনি নীতি। কত বুঝিয়েছে, তোর এমন সুন্দর চুল দেখবি ন্যাড়া করে দিলে আরও কত সুন্দর হবে। কতভাবে বুঝিয়েছে তারপর রেগে গিয়ে বলেছে, তোর হাতে আমার খেতে পর্যন্ত ঘেন্না করে। তুই তবু ফেলবি না।
ভাগুর মুখ দিয়ে সেদিন ‘বেশ’ কথাটি কিছুতেই বের করা যায়নি।
নীতি বলল, তুমি কি ক্ষেপে গেলে নাকি! সব ছুঁড়ে-ফুড়ে ফেলছ।
হ্যাঁ ক্ষেপেছি। একশোবার ক্ষেপব। কোথায় যায় চিরুনি আজ দেখব।
সব ঘরে আলো জ্বেলে দেওয়া হয়েছে। ভাগুর পাত্তা নেই। ঠিক ছাদে গিয়ে বসে আছে। ভাগুর সঙ্গে বাড়ির যে ঘরগুলির বেশি সম্পর্ক সেখানে খোঁজা হল। পাওয়া গেল না।
একটা চিরুনি নিয়ে মানুষটা এমন ক্ষেপে যেতে পারে নীতি ভাবতেই পারেনি। সে সিঁড়ি ভেঙে উপরে উঠে দেখল, অন্ধকারে একা দাঁড়িয়ে আছে ভাগু। আকাশ দেখছে মনে হয়। বকলেও ভাগুর মুখের রেখা পালটায় না। যেন এটা এমন কিছুই নয়। জন্মাবার পরেই জেনেছে বুঝি সংসারে সে বাড়তি মানুষ। নীতি কাছে গিয়ে বলল, এই তুই যদি নিয়ে থাকিস বল। পছন্দের চিরুনি কিনে দেব। বের করে দে। দেখছিস না কী করছে!
ভাগু কিছু বলল না। জ্যোৎস্না উঠেছে। ভাগুকে বিচলিত দেখাচ্ছে না। এটা সত্যি বাড়াবাড়ি মানুষটার। ভাগু নাও নিতে পারে। তবু এক বছরের মধ্যে তিনটে চিরুনি হাওয়া হয়ে গেল ভাবতে অবাক লাগে। মুম্বাই তো চিরুনি কখনো ঠিক জায়গায় রাখে না।
হঠাৎ নীচ থেকে মানস চিৎকার করে ডাকল, এই ভাগু, ভাগু।
নীতি বলল, শীগগির নীচে চল।
ভাগু নীচে নেমে সিঁড়ির অন্ধকারে গিয়ে দাঁড়াল—তোর চিরুনি কোথায়! তোরটা আগে বের করে দেখা।
ভাগু সিঁড়ির চাতালের দিকে উঠে যেতে থাকল ফের। পেছনে বাসন্তী, নীতি, মানস। ভাগু একটা পুরোনো মিটসেফ খুলল। বাতিল মিট-সেফ। বাতিল টিন, ভাঙা বোয়েম এবং ফ্লাস্ক এসবে ভরতি। সে নীচ থেকে টেনে কী বের করল একটা। মানস দেখল, ছোট্ট একটা আয়নার ভাঙা টুকরো। চিরুনি বের করে দেখাল।
নীতি সঙ্গে সঙ্গে চিৎকার করে উঠল, ও মা! এটা তো আমার সেই চিরুনিটা।
বাসন্তী ভাগুর দোষ ধরতে পারলে খুব খুশি। বাসন্তী বলল, আমি বলেছি না মাসিমা, ভাগুরই কাজ।
নীতি বলল, আসলটা বের কর। আজ যেটা নিয়েছিস।
ভাগু আবার কেমন হয়ে গেল। কথা নেই।
তোর এত সাহস ভাণ্ড! নীতি সমানে বকে যাচ্ছে।
মানস দেখছিল, দ্বিতীয়বারের চুরি যাওয়া চিরুনিটাতে একটা দুটো কাঠি লেগে আছে। গোরুর খোঁটার মতো শক্ত চিরুনি না হলে ভাগুর চুল সব হজম করে দেবে।
নীতি ফের বলল, সেদিন যে তোকে চিরুনিটা কিনে দিয়েছি, সেটা বের কর।
ভাগু ভিতর থেকে কী টেনে বের করতে গিয়ে একটা হরলিকসের খালি শিশি নীচে পড়ে গেল।
ভাঙলি তো।
ভাগু তখনও খুঁজছে।
মানস দেখছিল, ভাগুর খোঁপায় জবাফুল গোঁজা।
নীতি বলল, বের কর বলছি, তুই কি চিরুনি খাস! তুই কি রাক্ষস! বের কর!
এদিক ওদিক খুঁজে, ওটা বের করল। ডাড়ার একটা কাঠিও নেই।
নীতি এবার মানসের দিকে তাকাল।
মানস ধীরে ধীরে নীচে নেমে যাচ্ছে। একটা কথাও বলছে না।
নীতি চিৎকার করে বলল, কি, কিছু বলছ না যে। ওই নিয়েছে। বের কর বলছি। তুমি যাবে না। এত সাহস তোর মেলোমশাইর অমন সুন্দর চিরুনিটা লুকিয়ে ফেললি!
মানস বলল, সেই কখন থেকে কিছু খাইনি। এক কাপ চাও এ-বাড়িতে পাওয়া যায় না।
নীতি এবারে তরতর করে নেমে এল। কী ব্যাপার একটা কথা বললে না তুমি! তোমার জন্যই এরা আসকারা পায়। ভাগু ছাড়া কে নেবে!
মানস হেসে বলল, নিতে দাও। ও তো কিছু চাইতে শেখেনি। কাল আমার জন্য আর একটা না হয় কিনে এনো। তারপর ভাবল, ছাদে দাঁড়িয়ে ভাগু যখন চুল আঁচড়ায়, তখন কি সে মেঘবরণ রাজকন্যার কথা ভাবে!
