মানসকে তার এক মাসিমা দেশের বাড়ি থেকে ভাগুকে এনে দিয়েছিল। ছেড়া ফ্রক, এক মাথা উসকো-খুসকো চুল। কতকাল চিরুনি এবং তেল না পড়লে এমন অবস্থা হয় মানস সেটা বোঝে। বোঝে বলেই নীতিকে প্রথম দিন বলে দিয়েছিল, কী সুন্দর চুল দেখ। কী অবস্থা করে রেখেছে। একটা শক্ত দেখে চিরুনি কিনে দিও। যা চুল গোরুর খোঁটা পর্যন্ত ভেঙে যেতে পারে।
নীতি বলেছিল, ওর বয়সে আমারও কম ছিল না।
মানস দোতলায় ব্যালকনিতে গুম মেরে বসে আছে। বিকালের জলখাবারও খায়নি। তার মনে হয় নীতির জন্যই সংসারটা এত অগোছালো। জায়গারটা জায়গায় পাওয়া যায় না। স্কুলে কাজ করে বলে কি, সংসার ঠিক থাকবে না! আজকাল মধ্যবিত্ত পরিবারে দুজনে কাজ না করলে চলে!
নীতি পাশে দাঁড়িয়ে বলল, নাও না! বলছি তো এবার ঠিক চোখ রাখব।
দু-দুবার গেল, অথচ তুমি একবারও খুঁজে দেখলে না, কে নিয়েছে!
কে নেবে ভাগুরই কাজ।
সেবারে অবশ্য ভাগুর পক্ষ হয়ে মানস লড়ে গেছে। ভাগুর কখনো সাহস হবে তোমার চিরুনি ধরার। অযথা একটি নির্বিরোধ অসহায় মেয়েকে দায়ী করছ, কোথায় রেখেছ দ্যাখ। বরং মানসের রাগই হয়েছিল ভাগুর নামে অভিযোগ করার।
ভাগুরই কাজ। কথাটা শুনেও কোনো জবাব সে দেয়নি। ভাগু সংসারে সব অপমান মাথা পেতে সহ্য করতে এসেছে, এমন মনে হয়েছিল তার। ওর বাবা মার উপরে রাগ হয়েছিল। কী রে বাবা, খেতে দিতে পারবি না, জেনেও জন্ম দিয়ে বসে থাকলি! তারপরই মনে মনে হেসেছিল, সংসারে সবাই কি অঙ্ক কষে সব কিছু করে। সেও কি অঙ্ক কষে, এতটা এগিয়ে এসেছে।
তার মাথায়ও ঘন চুল। কোঁকড়ানো। খুব শক্ত হাড়ের চিরুনি না হলে তারও চলে না। সপ্তাহে একবার শ্যাম্পু না করলে জট বেঁধে যায়। চুলের প্রতি সেও এক সময় খুব যত্ন নিয়েছে। এখন আর তেমন ঘন নেই, পাতলা হয়ে আসছে মাথা। তবু মজবুত চিরুনি না হলে তার চলে না। বেশ দাম দিয়েই নীতি সবসময় তার চিরুনি কেনে। এ-ব্যাপারে তার পছন্দ-অপছন্দ নিয়ে নীতি সবসময় মাথা ঘামায়। সোনালি বর্ডার দেওয়া এবং বেশ উজ্জ্বল রঙের চিরুনিটা দেখে সে নীতিকে বসেছিল, বা বেশ তো দেখতে। কোথা থেকে কিনলে। নীতি বলেছিল, শ্যামবাজারের মোড় থেকে এটা কিনেছে। খুব বড়ো দোকান। কত ভ্যারাইটি। আট-দশ দিনও হয়নি। নতুন চিরুনিটা উধাও।
মানস বলল, রাখ তোমার চিরুনি, আমারটা ঠিক খুঁজে বের করব। বলে সে উঠে গেল। নীচে সিঁড়ির ঘরে জল তোলার পাম্প যেখানটায়, সেখানটায় খুঁজল। সিঁড়ির ঘরে ভাগু আর বাসন্তীর বিছানা, ফ্রক-প্যান্ট থাকে। বাসন্তী রান্নাঘরে নীতির এটা ওটা এগিয়ে দেয়। নীতি স্কুলে চলে গেলে রান্নার বাকি কাজগুলো সেরে রাখে। ভাগু, বাসন্তী প্রায় সমবয়সি। বাসন্তী কিছু বোধহয় ছোটোই হবে। বছরখানেক হল এখানে এসে উঠেছে। একতলার একটা ঘরে একই বিছানায় শুত। পরে বাসন্তী একদিন বলেছিল, আমি আর শোব না ভাগুর সঙ্গে।
কেন কী হল!
ওর মাথার উকুন আমার মাথায় এসেছে।
বাসন্তীর পাতলা চুল। ঘাড় পর্যন্ত। সে মাথা চুলকে বলেছিল, ইস ঘা হয়ে না যায়! কী চুলকায়।
উকুনের ব্যাপারে নীতির ভারি এলার্জি। বলিস কী! সঙ্গে সঙ্গে মাথা চুলকে বলেছিল, তাই আমার মাথা এমন করছে। এমনটা কী বুঝতে কষ্ট হয়নি মানসের। নীতি সঙ্গে সঙ্গে সরু চিরুনি নিয়ে বসেছিল—এবং দুটো বেশ বড়ো উকুন পেয়েও গেল।–অ মা কি হবে বলে সেদিন তার কী চিৎকার! এবং সঙ্গে সঙ্গে চেঁচামেচি—তাই বলি, হঠাৎ হঠাৎ চিরুনিটা হাওয়া হয়ে যায় কেন। ঠিক ভাগুর কাজ। ওই সরায়।
মানস জানে, সে যতটা ভাগুকে নিরীহ ভাবে, ভাগু বোধহয় সত্যি ততটা নিরীহ নয়। কারণ ভাগু সবসময় আড়ালে-আবডালে থাকতে ভালোবাসে। এমনকী রাতে ভাগুকে ডাকাডাকি না করলে খুঁজে পাওয়া যায় না। কেন এই আড়াল-আবডাল সেদিন মানস এবং নীতির কাছে পরিষ্কার হয়ে গেছিল। আসলে, সবার সামনে সে মাথা চুলকায় না। মনেই হবে না ভাগুর মাথায় উকুন আছে। মেয়েদের মাথায় উকুন থাকলে মানস ভিড়ের বাসেও টের পায়। আলতো করে চুলের মধ্যে আঙুল চালালে, যত সুন্দরী নারীই হোক না সে বোঝে সুন্দরীর মাথায় উকুন বাসা বেঁধেছে। কী আশ্চর্য ভাণ্ডও এ-বাড়িতে এসে টের পেয়েছে। না আগেই, কে জানে।
উকুন আবিষ্কারের পর নীতি তার চিরুনি লুকিয়ে রাখত। কিন্তু সবসময় তো আর পারা যায় না।
মানস বলেছিল, অত সাহস হবে না।
সাহস হবে না মানে? আমার মাথায় তবে উকুন আসে কী করে! এবং সঙ্গে সঙ্গে ভাগুর তলব। এই দেখি মাথা।
ভাগু তার মাথা দেখাল।
সত্যি উকুনের বাসা যাকে বলে। প্রতিটি চুলের গোড়ায় মরা উকুনের বাচ্চা। হঠাৎ ওক উঠে এসেছিল নীতির। মানসকে বলেছিল, কালই উপেনকে ডেকে দুটোরই মাথা ন্যাড়া করে দেবে।
বিষয়টা যে সত্যি এত গুরুত্ব পেয়েছে নীতির কাছে মানস টের পায়নি। পরদিনই নীতি বলেছিল—কি বলেছিলে!
কি বলব।
নাপিতকে আসতে বলবে।
মানস রেগে গিয়ে বসেছিল, আমি পারব না। উকুন মারার ওষুধ এনে দেব, তাই দিয়ে দিও। তুমি মাথা ন্যাড়া করে দিতে চাইলেই ওরা রাজি হবে কেন!
বাসন্তী বলেছে, মাথা ন্যাড়া করবে।
ভাগু?
ওকি কোনো কথার জবাব দেয়। একটাই তো কথা জানে। কিছু বললেই ‘বেশ। বেশ’ ছাড়া আর কোন কথা জানে!
