এবং তারপরই যে কালীপদ এবং তার দুই পুত্র তাঁকে চরম শাস্তি–তার পিতৃভূমি কেড়ে নিল। তখন পাড়ায় ফোন এসে গেছে, মোবাইলও হয়ে গেছে। ফোনেই কালীপদ জানাল, সামনে মোট আঠারো কাঠা জমি সে দখল করে আছে। সেই দখলনামাই বন্টননামা। বাকি জমি আর ভাইবোনেরা যা খুশি করুক। তার জমিতে কেউ ঢুকলে খুন হয়ে যাবে।
এই সেদিনও বাবু, তার স্ত্রী দময়ন্তীর জেলা পরিষদে কাজ হবে বলে টাকা নিয়ে গেছে। ঘুষ দিতে হবে সত্তর হাজার। দিলেই কাজ হয়ে যাবে। তিনবার এস এস সি পরীক্ষা দিয়েও শিক্ষকতার কাজ পায়নি। অর্ধেক টাকা আগাম দিতে হবে। আটজনের চাকরি, ঘুষ কত টাকা! বাবুর সেই এক হিপনোটাইজ, টাকাটা বাগিয়ে চলে গেল। তিনি ঘুষ এবং পণ এই দুই বিষয়কেই ঘৃণা করতেন। বংশের গৌরব রক্ষা করতে গিয়ে সব বিসর্জন।
সার।
আপনি কাঁদছেন!
না তো!
চোখ জলে ভেসে যাচ্ছে।
গাড়ি বাড়িতে ঢুকবে?
না।
কোথায়।
হোটেলে।
হোটেল থেকেই ফোন, দেবীপদ তোর বউমার চাকরি হয়েছে?
নারে দাদা, কোথায় চাকরি!
টাকা নিয়ে এল, জেলাপরিষদে চাকরি।
সব মিছে কথা। আমার সব শেষ। তুই কোথায় উঠেছিস। তুই আসবি বলে তোর বউমা রান্না করে বসে আছে।
বাবুটা এত মিছে কথা বলতে পারে। দময়ন্তীর চাকরি যদি হয়ে যায়, সেই ভেবে টাকাটা দিলাম। এখনকার বাজারে চাকরি পেতে হলে ঘুষ দিতে হয় জানি। কিন্তু জেলাপরিষদে কোনও লোকই নেওয়া হবে না, সে ঘুষটা দেবে কাকে।
তুই আয়, আমি তোকে আনতে যাচ্ছি। গাড়ি এনেছিস। তোকে আর আসতে হবে না দেবীপদ, আমি যাচ্ছি। এবং তিনি চানটান করে ফ্রেশ হয়ে বাড়ি গেলেন ঠিক, তবে সীমানায় ঢুকলেন না। দেবীপদকে ডেকে পাঠালেন নেপাল করের বাড়িতে। এই একজনই পরিচিত কাছের মানুষ তার দেশের, গেলে এখনও বাইরে ছুটে আসে। জড়িয়ে ধরে।
ফোনেই বলল, বড়দা সে গ্রাম আর নেই, সেই মানুষও নেই। হাওয়া পালটে গেছে। আগে পার্বণে উৎসবে আমাদের মেলামেশায় কোনও বাধা ছিল না–এখন অন্যরকম। যে যত ফন্দিবাজ, ফুটানিবাজ, তারাই আদর্শের বুলি কপচায়। আপনার বাবু তো জুয়া খেলে সব উড়িয়ে দিয়েছে। পঞ্চায়েত ভোটে দাঁড়িয়েছিল।
ও নাকি ছাপ্পা ফোট দেওয়ায় মারধর খেয়েছে।
দেবীপদ জোরজার করেই তাঁকে বাড়ি নিয়ে গেল। সবাই দেখা করে গেলেও, দেবীপদর পুত্রটির পাত্তা নেই। কোথায় গেল!
দেবীপদ বলল, ক’দিন থেকে বের হচ্ছে সাইকেলে। কোথাও গেছে। পার্টি করলে বসে থাকার উপায় থাকে না দাদা। স্টুডিওটা বিক্রি করে দিল। কী করে খাবে বল। আমারও তো বয়েস হয়েছে। পেনশনের টাকা আর কতদিন বল!
তিনি দেবীপকে বললেন, একটাই জীবন, সবাই আমরা একজীবনের। অধিকারী। তার বাইরে কিছু নেই। আগেও নেই পেছনেও নেই। তোর পুত্রের মুখে জাদু আছে। কথা বেচে সে ঠিকই খাবে। এখনও যা পরিস্থিতি, নষ্ট না হয়ে গেলে টিকে থাকা কঠিন। শুনছি তো পঞ্চায়েতে তার দল জিতবে, সে জিতবে। তারপর দেখা যাবে আরও বড়ো জায়গায় চলে গেছে। ছাপ্পা ভোট দিতে গিয়ে মার খেয়েছে, এখন তো কোনও প্রমাণই পাওয়া গেল না। সবাই ওর তো গুণগানই করছে।
দেবীপদ দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল, দাদা যে সময়ে যা মানায়।
ভাগু
চিরুনিটা আর খুঁজে পাওয়া গেল না।
মুখ ব্যাজার নীতির। মানস দোতলায় গুম মেরে বসে আছে। মাথা আর আঁচড়াবে না। রেগে গিয়ে বলেছে, মাথা ন্যাড়া করে ফেলব। জন্মে যেন আর চিরুনি কিনতে না হয়।
নীতি বলেছে, কোথাও আছে। খুঁজে দেখব। আমারটা নাও। মানস বলেছে, তার মানে? কোথায় যায়? এই তো সকালে চুল আঁচড়ে গেলাম। আমার চিরুনি কে ধরে! এ কি রে বাবা, একটা জিনিস ঠিক জায়গায় থাকে না।
বাড়িতে তিনজন মানুষ, দুজন কাজের লোক। অফিস থেকে ফিরে হাত মুখ ধুয়ে মানস আয়নার সামনে চিরুনিটা খুঁজতে গিয়ে দেখছিল, নেই। নেই তো নেই। শুধু এই একবার না এই নিয়ে তিনবার এ-বাড়িতে চিরুনি উধাও হয়ে গেছে এক বছরের মধ্যে। নীতির কিছু ঠিক থাকে না। তারটা দু-বার গেছে। তৃতীয়বার তার চিরুনিতে হাত। কার কাজ, এটাও সে অনুমান করতে পারে। প্রথমেই সেই
সন্দেহভাজন মেয়েটিকে ডেকে বলেছিল, তুই নিয়েছিস।
মেয়েটি মুখ নীচু করে দাঁড়িয়েছিল। রোগা। মাগুর মাছের মতো গায়ের রং। অন্ধকারে দাঁড়ালে একেবারে অদৃশ্য হয়ে যায়। চোখ দুটোই সার। ডাগর চোখ এবং নাক মুখ মিলে কি যেন একটা বুনো সৌন্দর্য মেয়েটার মধ্যে আছে, খুব চেঁচামেচির পর নিজেরই কেমন খারাপ লাগে। মানস বলেছিল, তোর কাজ তুই নিয়েছিস। তোর চিরুনি সেদিন কিনে দিলাম।
আমি নিইনি।
তুই নিসনি তো যাবে কোথায় চিরুনিটা। আমারটা আর কে ধরবে! তারপর মনে হয়েছিল মুম্বাই ধরতে পারে। কিন্তু সে তো আগে কলেজে বের হয়ে গেছে। এখনও ফেরেনি। তেমনি সামনে মাথা নীচু করে রেখেছে ভাগু। মাথা তুলে তার দিকে তাকাচ্ছে না। মাথার চুল পরিপাটি করে বাঁধা। খোঁপায় গোঁজা বড়ো জবাফুল।
মেয়েটার এক মাথা কোঁকড়ানো চুল। ঘন এবং গভীর। সচরাচর এত ঘন এবং গভীর চুল মেয়েদের মাথায় আজকাল দেখা যায় না। ভাগুর সঙ্গে চুলেরও কেমন একটা গভীর সম্পর্ক আছে। চুল কোঁকড়ানো বলে জট থাকে খুব। এজন্য তাকে বেশ শক্ত দেখে চিরুনি কিনে দিয়েছে নীতি। মাস তিনেকও হয়নি।
মেয়েটির কোনো কিছু চাইবার স্বভাব নেই। কোনো কাজে না করে না। সারাদিন ঘরবাড়ি পরিষ্কার রাখার জন্য উপর নীচ করে বেড়ায়। তার এই একটিই কাজ। বাড়িতে যে তার বাবার নামে মানস টাকা পাঠায়, তাও একবার জিজ্ঞেস করে জানতে চায় না—সত্যি পাঠিয়েছে কি না! কেউ তাকে চিঠি লেখে না। ভাগুর বাবা-মার সঙ্গেও মানসের পরিচয় নেই।
