ফোনটা প্রথম দিল্লি থেকেই এসেছিল।
কে?
আমি হীরক বলছি কাকা।
বল।
বাবু না কি তোমার কাছে আছে?
ছিল, এখন নেই।
চলে গেছে!
হীরক তাকে যে কিছু খবর দিতে চায়।
তিনি বললেন, বাবু কী করেছে আবার।
ও কিন্তু জুয়াড়ি! জুয়া খেলে। ওকে রেখ না। তুমি কাকা সতর্ক থাকবে।
আর সতর্ক থাকা! বংশের ছেলে ছেলে করেই তো চোখের উপর তিনি দেখলেন তার প্রতারণার ছবিগুলি।
বাবু মোবাইলে ফোন করে কার সঙ্গে কথা বলছে। ওর স্ত্রীর সঙ্গে কথা বলতে পারে। বাবু তো বিয়ে করার পরও নানা অজুহাতে এখানে এসে থাকত। এখানে থাকার সময় তাঁর সুত্রে অনেক বিখ্যাত লোকজনদের সঙ্গেও বাবুর পরিচয় হয়েছে। ছবির অনেক খুচরো কাজ তাকে দিতেই পারে। কিন্তু খুব তর্ক করছে ফোনে। মনে হয় কেউ তাকে হুমকি দিচ্ছে। তিনি একতলায় বসার ঘরে, বাবু। বারান্দায় শেষ করে দেব। বাবু চেঁচাচ্ছে।
কী শেষ করে দিবি।
আরে দেখ না জেঠু, বলছি সুদের টাকা আগামী মাসে দিয়ে দেব। মানছে না। আমাকে রাস্তায় দেখে নেবে বলছে।
সুদ! কীসের সুদ।
আর বল না। বাজারে কি কমপিটিশন। স্টুডিও থাকলেই হয় না। কমপিউটর রাখতে হয়। তুমি আর কত দেবে জেঠু। সুদে টাকা নিয়ে একটা কমপিউটার কিনেছি।
তিনি বিব্রত। চুপ করে আছেন। দেবীপদর পেনশনে সংসার চলে, দেবীপদ তাই বলেছে। বাবু তার বাবাকে এক পয়সাও দেয় না। উপার্জনের টাকা বাবু কী করে দেবীপদও জানে না। বিয়ে করেছে। একটা মেয়ে হয়েছে, সংসারে দায়িত্বশীল না হলে চলবে কেন?
তিনি বিরক্ত হয়ে বলেছিলেন, ফোনটা দে। আমি কথা বলি।
বাবু কী ভাবল, তারপর বলল, তোমার সঙ্গে কথা বলবে না বলছে।
কেন বলবে না।
কী করে বলবে। সাহস নেই তোমাকে বলে। তারপরই ফোন কেটে দিল।
কী বলছে!
বলছে, টাকা না দিলে রাস্তায় হামলা করবে।
বলিস কী। তোর বাবা জানে। আগে তো বলেছিলি, আমাদের এলাকায় কোনও স্টুডিও নেই। এখন বলছিস আরও দুটো ছবির দোকান হয়েছে।
সবারই কমপিউটার আছে। আমার নেই। বাজারে কী প্রতিযোগিতা তুমি বুঝবে না।
কত টাকা ধার করেছিস।
কী যে হয় তাঁর। বাবুর বিমর্ষ মুখ দেখলেই তিনি ঘাবড়ে যান। বংশের ছেলে রাস্তায় যদি খুনজখম হয়ে যায়—কেমন ভিতরে তিনি আতঙ্কে পড়ে গেলেন।
কত টাকা ধার?
তোর আয় কত মাসে?
ঠিক থাকে না। তোমাকে জেঠু কী বলব। যা রোজগার, সবই সুদ দিতে চলে যায়।
বাবুর মুখে তিনি খুবই হতাশার ছাপ ফুটে উঠছে দেখতে পান।
লেটা না শেষে বেঘোরে মারা পড়ে। তিনি একটা চেক লিখে দিয়ে বললেন, এটা ভাঙিয়ে নে। মনে হয় হয়ে যাবে। তারপর বললেন, কত সুদ দিস? তারপর বললেন, মাসে না বছরে?
মাসে চার পার্সেন্ট সুদ।
এটা তো বেআইনি। ওদের লাইসেন্স আছে?
জেঠু তোমার সময় আর নেই। এখন বে-আইনি আইনি বলে কিছু নেই। ওদের দল আছে। থানা পুলিশ হাতে। সরকারও মনে করে, বেকার যুবক সব, খুনজখম করে পয়সা উপার্জন হলেই হল। খেয়ে বাঁচতে হবে তো। বেকারি দূর করতে সরকার এখন সব মেনে নিচ্ছে। দালালি করুক, প্রমোটারি করুক, মস্তানি করুক শুধু কেউ খুনজখম না হলেই হল!
তিনি বললেন, ঠিক আছে, আমাকে না জানিয়ে আর সুদে টাকা নিবি না।
না না। আর নিই, যা শিক্ষা হল।
শিক্ষা কথাটাতে তাঁর হাসি পেয়েছিল। বাপ-ঠাকুরদার কথা মনে হল। সেই বংশের ছেলে কী হয়ে যাচ্ছে। তবু রাস্তায় যদি আনা যায়, অথবা বাগে আনা যায়।
গাড়ি যাচ্ছে।
মনোরঞ্জন বলল, সার ঘুমিয়ে পড়েছেন।
না না, কিছু বলবে!
সারগাছি পার হলাম।
তাই তো দেখছি। চারপাশে ধানের জমি সব সবুজ হয়ে আছে। আদিগন্ত মাঠ–আগে এইসব জমিতে লঙ্কার এবং আখের চাষ হত। আখচাষ আর হয় না। পলাশির চিনিকল বন্ধ হয়ে যাওয়ার পরই আখচাষ বন্ধ হয়ে গেল। কত লোক বেকার হয়ে গেল।
আসলে নিজের সঙ্গেই তিনি কথা বলছেন।
সার সোজা বাড়ি যাবেন?
দেখি।
বাবুর বউটার চাকরি হলেও তিনি বেঁচে যান। তারপরই মনে হল তার ভাইবোন আত্মীয়স্বজন, কে নয় যে তাকে হিপনোটাইজ করে অর্থ উপার্জন করেনি। ছোটোভাই কালীপদ শেষদিকে মাসে মাসে টাকা নিতে আসত। তিনি বিরক্ত হতেন, এভাবে কতদিন যে চলবে। বাড়ি থেকে বাবা তাকে বের করে দিয়েছিলেন, ত্যজ্যপুত্র করেছিলেন—সে তার বউ দুই পুত্র এবং এক কন্যাকে নিয়ে পাহাড়েই ঘর ভাড়া করে থাকত। তিনি বাবার চিঠিতে খবর পাবার পরই ছুটে গিয়েছিলেন, বাবাকে বুঝিয়ে বাড়ির এক কোণায় কালীপদর থাকারও বন্দোবস্ত করে দিয়েছিলেন।
তারপর আবার সেই ভিক্ষা।
না আর পাবি না।
দাদা তোর তো মেলা টাকা।
পণের টাকাটা দিবি।
আর দেব না। এই দিয়ে দিয়ে তোদের গরিব করে রেখেছি। নিজেদের আত্মনির্ভর করে তুলতে পারলি না।
আর আসব না। শুধু কথা দে তোর ভাইঝির বিয়ের পণের টাকাটা দিবি।
পণের টাকা দিতে পারব না। পুলিশে খবর দেব।
ধূর্ত কালীপদ কত সহজে বলল, ওই হল। বিয়ের খরচ আর কত লাগে। ছেলের দাবিও কম। একটা দোকান করবে বলে পণ নিচ্ছে। তুই যেভাবেই দিস, দিলেই হল। এত নগদ টাকা তুই না দিলে কে দেবে? না দিলে বংশের কলঙ্ক হবে।
তোর ভাইঝি পালানোর ধান্দা করছে কলোনির অবনী পালের পোলার লগে। পালালে তুই মুখ দেখাতে পারবি। এতে বাপ-ঠাকুরদার কলঙ্ক না।
আর সঙ্গে সঙ্গে তিনি যে কত সহজে বাপ-ঠাকুরদার সম্মান রক্ষার্থে বিয়ের সব খরচই দিলেন।
