মনোরঞ্জন, কোথাও বসে চা খেলে হত।
একেবারে রানাঘাটে গেলে হয় না। আপনি কি সার রাস্তার দোকানের চা খেতে পারবেন!
সব পারব।
তার যে কত কথা মনে হচ্ছে।
পাঁচ-সাত বছরে বাবুর উপর বিশ্বাস হারিয়েই বলেছিলেন—যা দেশে গিয়ে পার্টি কর। পার্টি না করলে, আজকাল চাকরি হয় না।
আসলে কি তিনি শেষ পর্যন্ত ভাইপোটিকে জাহান্নামে যাবার রাস্তা বাতলে দিয়েছিলেন।
মানুষের তো সময় একভাবে যায় না।
একদিন হঠাৎ ভবেশ দেখেন একতলা থেকে বাবু উঠে এসেছে।
বাড়ি যাব।
হঠাৎ।
সেই যে গেল আর ফিরল না।
দেবীপদকে ফোন করলে বলেছিল, তুই দাদা চিন্তা করিস না। বাবু হারিয়ে যাবার ছেলে না।
তা হবে হয়তো।
পাঁচ-সাত বছরের সম্পর্ক। বছরের বেশি সময়টা আমার কাছেই থাকত। তিনি ভাবলেন।
কীরে গেছিলি?
হ্যাঁ গেছিলাম।
কী বলল, শুভ!
আমাকে নেবে বলল।
শুভ দূরদর্শন নিউজ এডিটর। আট-দশ জন ফটোগ্রাফার নেবে। ভাইপোটির সুযোগ হতে পারে ভেবেই ফোন। তারপর অ্যাপ্লিকেশন, শুভ ফোনে শুধু বলল, দাদা দেখছি কী করা যায়। কেউ ঝেড়ে কাশে না।
একদিন তো বলল বাবু, জানেনা জেঠু আমাদের প্যানেল হয়ে গেছে। আমার নাম আছে।
শুভ তবে তার কথা রেখেছে। শুভ কি তাকে কোনও কথা দিয়েছিল। সেই প্যানেলই সার। পরে শোনা গেল, প্যানেল বাতিল। শুভকে ফোন করে আর তাকে ধরা গেল না।
তবু তিনি শুভকে ছেড়ে দেবার পাত্র নন। একদিন নিজেই গলফগ্রিনে হাজির। দূরদর্শনের লোকজন তাঁকে দেখে অবাক। তিনি তো কোথাও আজকাল বের হন না। সহসা দূরদর্শনের অফিসে হাজির। কোনও বিশেষ অনুষ্ঠানের কথাও তাঁরা জানে না। লাইফপ্রোগ্রাম যদি হয়—এসব ভাবার সময়ই তিনি এসেছেন শুনে শুভ নিজেই বের হয়ে এল, এবং তার ঘরে নিয়ে গিয়ে বসিয়েছিল।
শুভর এক কথা, দাদা হল না।
কেন হল না।
আমি তো একা না। কমিটিতে আরও অনেকে আছে।
তোমার উপর আমার ভরসা ছিল। তুমি না বললে এত দামি ক্যামেরা কিনে দিতাম না। প্যানেলে তো ওর নাম ছিল।
শুভ খুবই ইতস্তত করছে।
খুলে বলবে তো! তোমার ফোনেও সাড়া পাওয়া যায় না। কী ব্যাপার বল তো।
বাবুর ভালো নাম, অতুল।
সে বলল, অতুল নিজের নাম-ঠিকানা পর্যন্ত ঠিকঠাক লিখতে পারে না। ছবির হাতও কাঁচা। সামান্য কথাবার্তায় ওর অবজ্ঞা ধরা পড়ে।
তা বেশ। সে তো কথা বলবে না। ছবি তুলবে। ও তো হায়ার সেকেন্ডারি পাশ।
না পাশ না। সার্টিফিকেট দিতে পারেনি। মিনিমাম কোয়ালিফিকেশন না থাকলে কী করি!
ভবেশ খুব দমে গিয়েছিল।
প্যানেলে ওর নাম আছে বলল।
শুভ বলল, এসব কথা থাক। চা খান। আমার নিজেরই অস্বস্তি হচ্ছে দাদা। কী বলব।
চা খাচ্ছি। তুমি দ্বিধা কর না।
প্যানেলই হয়নি।
অতুল যে বলল প্যানেলে ওর নাম আছে।
মিছে কথা। ও হায়ার সেকেন্ডারি পাশও না।
বল কি।
আরও সব কুকীর্তির সাথী তিনি। বাবুকে নানা কাজেই লকারের চাবি দিতে হত। অনেক সময় তার কাছেই চাবি পড়ে থাকত। বাবু যে এতবড়ো চাটুকার এবং প্রতারক, সে চলে গেলে ভবেশ টের পেলেন।
বাবুর চাটুকারিতাই তার মধ্যে এক অন্ধস্নেহ প্রশ্রয় পাচ্ছিল।
কারও কথাতেই গুরুত্ব দেননি।
ছোটোভাই কালীপদও সতর্ক করে দিয়েছিল, ওকে বাড়িতে রাখা ঠিক না।
দেবীপদর সঙ্গে কালীপদর মুখ দেখাদেখি বন্ধ। সে বাবুর নিন্দা করতেই পারে। এরা সবাই তাঁর টাকার লোভে নানাভাবে তাঁকে ভজিয়েছে। একসময় কালীপদ বছরের পর বছর তাঁর টাকায় সংসার নির্বাহ করত। এখন সেই পৈতৃক ভিটা থেকে তাঁকে উৎখাত করেছে। এই কিছুদিন আগে কালীপদ এসে আট হাজার টাকা নিয়ে গেল। জমির উপর দিয়ে আট ফুটের একটি রাস্তা বের করতে না পারলে, বন্টননামা করা মুশকিল। রাস্তার মুখে কালীপদ ঝুপড়ি বানিয়ে থাকে—তা সরিয়ে নেওয়ার জন্য সেও অনেক টাকার দাবি জানায়। বাড়ির বন্টননামার জন্য খেপে খেপে কত যে টাকা নিয়ে গেছে এরা। পাঁচ ভাই দু বোনের জন্য জমি বন্টননামার এই এক নাটকেই তিনি জেরবার। নোংরামি এবং ছ্যাঁচড়ামির শেষ ছিল না। অথচ এরা সবাই তাঁর পায়ে পায়ে বড়ো হচ্ছিল। মা বাবা ভাইবোন ছাড়া তার অন্য কোনও জগৎ ছিল না তখন।
তখনই গাড়িটা থামল।
মনোরঞ্জন বলল, হাতমুখ ধুয়ে নিন। আপনাকে নামতে হবে না। আমি নিয়ে। আসছি। বউদিরা সঙ্গে কিছু দিল না, কী খাবেন।
না। তোমাকে কিছু করতে হবে না। চল তুমিও খেয়ে নেবে।
মনোরঞ্জন বলল, ভিড়। আপনার কষ্ট হবে।
রাখো তো ভিড়। খিদেয় পেট চোঁ চোঁ করছে।
মনোরঞ্জন অবাক হয়ে গেল। সে তাঁকে অনেক অনুষ্ঠানে নিয়ে যায়। তাঁর গুণগ্রাহীরা ভিড় করলে সে নিজেও গর্ববোধ করে। এতবড়ো মানুষটা কিনা বলছে একই টেবিলে খাবে।
কী হল, এসো।
মনোরঞ্জন আর কী করে!
বাবু অথবা ভালো নামে অতুল, সত্যি কি জুয়া খেলে।
দেবীপদ ঘুণাক্ষরেও জানায়নি।
তিনি নানা কাজে কিংবা তাঁর লেখালেখি নিয়ে এত ব্যস্ত থাকেন যে চারপাশে কী হচ্ছে টের পান না। একদিন টের পেয়েছিলেন, কিছু পাঁচশো টাকায় নোট লকারে কম। তিনি টাকাপয়সা লকারে সাধারণত এক জায়গায় রাখেন না। লকারে তার অনেক জরুরি ফাইল আছে, তার ভিতরে ভাগে ভাগে টাকা রেখে দেন।
আর মুশকিল তাঁর দুর্বল স্মৃতিশক্তি। কাউকে দিতে পারেন, অন্য কাজে খরচ করতে পারেন, তিনি তো তাঁর উপন্যাসের চরিত্রের পেছনেই সারাজীবন বেশি ছোটাছুটি করেছেন। এবং তাঁর এটাই নেশা। লেখার সময় তিনি তাঁর চরিত্রগুলির সঙ্গে তুমুল ঝগড়াও বাঁধিয়ে দেন। চরিত্ররা তখন তার স্বজনের মতো। এবং বাবুও কি গল্পের শেষে চরিত্র হয়ে যাচ্ছে। আসলে একজন প্রতারককে নিয়ে তিনি কোনও গল্প লেখেননি। এটা তো একজন প্রতারকের গল্প হয়ে যাচ্ছে।
