তারপর কেন যে মনে হল বাবুকে তিনি দেশে স্টুডিও করে দিয়েছিলেন। স্টুডিওতে ছবি তোলার সুযোগে তার ছেলে লেখাপড়া জানা মেয়ের সঙ্গে প্রেম করে এবং বিয়ের আগেই মেয়েটি গর্ভবতী হয়, অবশ্য ঘুণাক্ষরেও জানানো হয়নি, তবে কথা ভেসে আসতে কতক্ষণ–
ছোটোভাই জানিয়েছিল, ভয়ংকর বিপদ দাদা। তুই বাবুর বিয়েতে মাথা গলাস। বাবু বংশের কলঙ্ক।
ভবেশ খুবই দুঃখ পেয়েছিলেন। পুত্রবৎ ভাইপোটিকে এ-ধরনের কলঙ্কে লিপ্ত করা ছোটোর উচিত না—তারপর দেবীপদর সেই চিঠি, দাদা তুই শিগগির আয়। আমার মাথা ঠিক নেই। জাত-বেজাতের প্রশ্ন নিয়ে দেবীপদ তার পুত্র বাবুকে কুলাঙ্গার এবং অন্য যাবতীয় যা গালাগাল আছে সবকিছুর উল্লেখ করেছে—তিনি অনুমতি না দিলে পত্রের বিবাহ সম্পন্ন হবে না, কারণ মাথার উপর দাদাই আছেন, তাঁর অনুমতি পেয়ে গেলে দেবীপদ আর কাউকে ভয় পায় না।
রাস্তা ভালো থাকলে তাঁর দেশের বাড়ি ঘণ্টা পাঁচেকের রাস্তা। রাস্তা ভালো কি মন্দ তাও তিনি ঠিক জানেন না। যোগাযোগ না থাকলে যা হয়। তবু খোঁজখবর নিয়েছেন। বর্ষায় রাস্তা ভালো থাকার কথাও নয়।
তিনি বের হবার আগে মনোরঞ্জনকে ডেকে পাঠালেন। বাড়ির ড্রাইভার মনোরঞ্জনকে কোথায় ডিউটি দেওয়া হয়েছে তিনি জানেন না। নিয়মিত বেরও হন না তিনি। তাঁর যে দেশে যাওয়া খুবই দরকার তাও কাউকে বলেননি। দেবীপদও ফোন করেছে, সে কথাও কাউকে জানানো হয়নি। ছোটোপুত্র অবনকে শুধু ফোনে জানিয়েছিলেন, তাঁর গাড়ির দরকার। কার গ্যারেজে তাঁর গাড়ি, মনোরঞ্জন কোথায় অবনই বলতে পারে। অবনের গ্যারেজে, না প্রীতমের গ্যারেজে, কিংবা গাড়িতে কারও বের হবার যদি কথা থাকে, অবনই সব বলতে পারবে। পুত্ররা সবাই আলাদা থাকে। তাদের নিজস্ব আলাদা গাড়ি। বউমাদেরও গাড়ি আলাদা। কেউ কলেজে, কেউ হাসপাতালে কেউ করপোরেট হাউসে আছে। বাবুর জন্য তাদের কোনও দায় ছিল না। সবাইকে তিনি বলেছেন, প্রীতম তো বলেই দিল তোমার এই বংশপ্রীতি ছাড়ো। এত ঠকেও তোমার শিক্ষা হল না। দেশের জমি তো শুনেছি ভাইরা তোমার সব দখল করে নিয়েছে।
ভবেশ বলেছিলেন, ওরা নেবে না তো কে নেবে। তোমরা দেশের বাড়িতে গিয়ে থাকবে?
থাকব না কেন। একটা বাড়ি করে রাখলে ছুটিছাটায় বেড়াতে যেতে পারতাম। দাদুর জমিজমায় আমাদেরও ভাগ আছে। ওটা তোমার পিতৃভূমি। তোমার কষ্ট হয় না বাবা।
এটা ঠিক, তাঁর অংশের জায়গা ছোটো দখল করে নিয়েছে। ছোটো বন্টননামাতেই রাজি নয়। তাঁরা পাঁচ ভাই। তিনি এবং মেজ মেট্রিক পরীক্ষা দিয়েই গ্রাম থেকে নিষ্ক্রান্ত হয়েছিলেন। মেজ বাড়ির সঙ্গে কোনও যোগাযোগই রাখে না। সে বোম্বাই শহরে বিশাল বাড়ি গাড়ি নিয়ে আছে। স্ত্রী আই এ এস। একমাত্র পুত্র দেরাদুনে মিলিটারি কলেজে পড়ে। ছোটো তিন ভাই-এর মধ্যে জমি বাড়ি নিয়ে চাপা বিবাদের সৃষ্টি হয়েছে। প্রীতমের কথায় তিনি বুঝেছিলেন বাবুকে দেশ থেকে তুলে আনায় তারা বেজায় অখুশি। এবং তখনই ভবেশ বুঝতে পারেন—বাবুর চাকরির ব্যাপারে তার পুত্ররা মোটেই আগ্রহী নয়।
ভবেশ এখন বুঝতে পারেন, তিনি গরিব বাবার পুত্র। মেলা ভাইবোন নিয়ে বাবা তাঁর মুখাপেক্ষী ছিলেন। বাবার হতদরিদ্র চেহারা এখনও মনে করতে পারেন ভবেশ। মায়ের বিষণ্ণতা—সবই মনে পড়ে তার। মায়ের দুই পুত্র বড়ো মেজো পার পেয়ে গেলেও ছোটো তিনপুত্র দেবীপদ, নিরাপদ, কালীপদ গাঁয়েই পড়ে থাকে। পরে বাবা বেঁচে থাকতেই তারা পৃথগন্ন হয়ে যায়। বাবা-মার দায়িত্ব শেষ পর্যন্ত তাকেই বহন করতে হয়। সেই সূত্রেই বাড়ি যাওয়া আসা। ভাইপোরা কে কী করছে খবর নেওয়া। ছোটো তো পঞ্চাননতলায় মুদিখানা করবে বলে বাবা তাঁকে একবার ডেকে পাঠিয়েছিলেন।
বাবার কথা ফেলাও যায় না।
দোকান করতে টাকাকড়ির ব্যবস্থা তাকেই শেষ পর্যন্ত করতে হয়। দেবীপদ অবশ্য সদরে একটা সরকারি কাজ জুটিয়ে নিয়েছিল। সে এখন তারই পেনশনে চলে। তার দুই মেয়ের মোটামুটি সচ্ছল পরিবারেই বিয়ে দিয়েছে। শুধু পুত্রটিকে সামলাতে পারছিল না।
গাড়ি যাচ্ছে। মনোরঞ্জন বলল, গাড়িতে উঠবেন সার?
দেখি।
দেশের অবস্থা কী জানিই না। মনে মনে ভাবলেন।
আসলে দেবীপদর পুত্র বাবু সব অর্থেই বাবু। মিথ্যে কথায় বাবু, ফুটানিতে বাবু, খাওয়াতেও বাবু। অলস এবং কুঁড়ে এটাও টের পেয়েছিলেন ভবেশ।
কীরে খেলি না।
আমি খাই না জেঠু।
কইমাছ খাস না।
মাথা নীচু করে কথা বলার স্বভাব।
আরে কত দাম জানিস! ভবেশ সব কাজ থেকে অবসর নিলেও প্রতিদিনের বাজার করার অভ্যাস ছাড়তে পারেননি।
খুব কাঁটা কই মাছ।
কাঁটা। কোন মাছে কাঁটা নেই বলতে পারিস।
পমফ্রেট, পাবদা, তপসে মাছ দিলে খুঁটে খুঁটে খেত। ভবেশ ভাইপোকে দিয়ে মাঝে মাঝে বাজার করাতেন, তাজা মাছ আনতে বলতেন। কিন্তু সে কোনওরকমে বাজারের থলে ফেলে দিয়ে বলত, যা চড়া দাম। মাগুরমাছের কেজি তিনশো টাকা। বাজার ঘুরে দেখতেন ভবেশ—দেশি মাগুর আনেনি বাবু, হাইব্রিডের মাগুর নিয়ে এসেছে। দেশি আর হাইব্রিডের মাগুরের দাম আকাশ-পাতাল তফাত।
গাড়ি যাচ্ছে।
মনোরঞ্জন ভবেশের সঙ্গে কথা বলতে বিশেষ সাহস পায় না। তিনি কিছু বললে সে শুধু উত্তর দেয়।
হরিণঘাটার বাজার পার হয়ে গাড়ি যাচ্ছে।
