আসলে আমার বড়োপুত্রটি শহরের সবচেয়ে বড়ো হাসপাতালের অভিজ্ঞ চিকিৎসক, থাকা-খাওয়া এবং পরামর্শও পাওয়া যাবে ভেবেই তারা আসত। সম্প্রতি কয়েকবছর ধরে জেলা সদরেই চিকিৎসার যথেষ্ট উন্নতি হয়েছে বলেও হতে পারে, আবার আত্মাভিমানও মানুষের জাগ্রত হতে পারে, কারণ কে এখন আর কোনও গলগ্রহ হয়ে বেড়ায়। তবে তাঁর কপাল মন্দ, ভাইপো বাবুকে কোথাও অনেক চেষ্টা করেও চাকরির সুযোগ করে দিতে পারেননি। কোনওরকমে হায়ার সেকেন্ডারি পাশ করে বসেছিল, সে কলকাতায় তাঁর বাড়িতে উঠে এসেছিল একটা ক্যামেরা সম্বল করে। দেবীপদও জানিয়েছে, বাবুর ফটোগ্রাফির হাত ভালো, তুমি চেষ্টা করলে ঠিক কোনও চ্যানেলে ঢুকিয়ে দিতে পারবে। বাবু বিয়ের অন্নপ্রাশনের ছবি তুলে বেড়ায়, এ-লাইনে এত প্রতিযোগিতা যে সে পেরে উঠছে না। বিশ বাইশ হাজার টাকায় এতসব সস্তা ভালো ক্যামেরা পাওয়া যায় যে শুনেছি সিরিয়ালের ছবিও সেইসব ক্যামেরায় তোলা যায়।
সমাজে তিনি যথেষ্ট প্রতিষ্ঠিত বলে প্রথমেই তিনি মৃণাল নন্দীকে ফোন করলেন।
আজ্ঞে বলুন ভবেশদা।
তুমি তো সিনেমার লোক, ছবির এডিটিং-এর জন্য রাষ্ট্রপতি পুরস্কারও পেয়েছ। এদিকে দেশ থেকে কাঁধে ক্যামেরা ঝুলিয়ে জ্যাঠার বাড়িতে ভাইপো হাজির। কোনও চ্যানেলে ছবি তোলার যদি সুযোগ করে দিয়ে পারে।
মৃণাল শুধু বলল, চেষ্টা করবে—তবে সিনেমা কিংবা সিরিয়ালের ছবি তোলার কাজটা খুব সহজ নয়—বাবুকে তবু দেখা করতে বলল সে। তারপর একদিন বলল হল না দাদা। খুবই কাঁচা হাত। ওকে বরং সরকারি ব্যবস্থায় ফটোগ্রাফির অ আ ক খ শিখে নিতে বলুন। ইয়ুথ হস্টেলে এ-মাসেই একবছরের সেশন শুরু হচ্ছে। ওটা শেষ হলে চিত্রবাণীতে ভর্তি করে দিন। বছর দু-এক পরে আমার সঙ্গে যেন দেখা করে।
বাবুর চোখ দুটো মানুষকে সহজেই আকৃষ্ট করে। বাবু এখানে থাকবে শুনে তার জেঠিও খুশি। শত হলেও বাড়ির ছেলে, না-ও করা যায় না। তারপর এই থাকা না-থাকার বিষয়টা সবই নির্ভর করে জেঠির পছন্দ-অপন্দের উপর। সুতরাং তিনি যখন রাজি, বাবু থেকে গেল। দেবীপদকে জানালেন বাবু এখানেই থাকবে। আপাতত কোনও কাজের ব্যবস্থা করা যায়নি।
তারপর লিখলেন, ছবির বিষয়ে এখানে দুটো কোর্স আছে, সেটা শেষ করুক। বাবু তো বলল, অ্যাডমিশন এবং মাইনে নিয়ে প্রথম দফাতেই যে টাকাটা লাগবে সেটা তুমি দেবে।
এখানে বলে রাখা ভালো, সে-সময়ে দেবীপদর বাড়িতে কোনও ফোনের সংযোগ ছিল না। মোবাইলও নেই। তার, ফলে চিঠি না লিখেও ভাল বাবুর উপায় নেই। তবে খুব জরুরি বার্তা থাকলে এস টি ডি বুথ থেকে করা যায়। বাড়ি থেকে বেশ দূরে—শত হলেও দেশের বাড়ি তাঁর প্রত্যন্ত গ্রাম জায়গায়, জমিজমা এবং ফলের গাছও কম নেই। সবই ভাইরাই ভোগ করে। দিন যত যাচ্ছে, জিনিসপত্রের দাম বাড়ছে, দেবীপদ এবং কালীপদ শুধু মাঝে মাঝে জানায়, গাছ বিক্রি করতে হবে, বাড়িতে ভাইপোদের একটি সাইকেল দরকার, ফল বিক্রি হয়, পুকুরের মাছও বিক্রি হয়। ভবেশ জানেন, ভাইরা অভাবী, একজনের মুদি দোকান, অন্য দুজন সরকারি অফিসে চতুর্থ শ্রেণির কর্মী, বাবা বেঁচে থাকতে চিঠিতে তাদের কথা থাকত—তারা যে লেখাপড়া করতে চায় না, সে কথাও থাকত।
অতীত কথনে দেখা যায় ভবেশবাবুও নানা ঘাটের জল খেয়ে শেষমেশ এই শহরে, একটি বিখ্যাত দৈনিকের সহসম্পাদক এবং লেখালেখিতে প্রভূত অর্থ উপার্জনও হয়।
ক্রমে সব দায় তারই মাথার উপর যেন। বাবার চিঠিতে শুধু আক্ষেপ, তাঁর পুত্ররা ক্রমে অমানুষ, তার মাসোহারায় আর চলে না-পুত্ররা বিয়ে থা করে বাবা বেঁচে থাকতেই পৃথগন্ন। তাদের পুত্রকন্যাদের দায়ও ভবেশবাবুর ওপর। ভবেশবাবুর নামে পরিবারে তখন গগন ফাটে। ভাইঝিদের সম্বন্ধ দেখতে এলে ভবেশবাবুর নাম কথাবার্তায় জড়িয়ে দিত, এবং পনের টাকার জন্য ভাবনা নেই, বড়দা আছে না। আপনাদের মেয়ে পছন্দ কি না বলুন। আবার বিয়েই শেষ নয়, কন্যা গর্ভবতী, সদর থেকে ডাক্তার বলে দিয়েছে জরায়ুতে জলাভাব, পুরো দশ মাস চালাতে গেলে জরায়ুর জলাভাবে শিশুটির মৃত্যু অবধারিত এবং অকাল প্রসবের সম্ভাবনা এবং অবধারিত মৃত্যুর হাত থেকে রক্ষা করতে পারেন ভবেশই। কলকাতা শহরের হাসপাতালে এবং নার্সিংহোমে অস্ত্রোপচারের পর যে ইনকিউবেটরে রাখা হবে তা শুধু বড়ো হাসপাতালে কিংবা দুই-একটি অতি বৃহৎ নার্সিংহোম দুর্লভ সুযোগ পাওয়া যায়—তবু বড়দা যখন আছেন তিনি শিশুটির প্রাণরক্ষার্থে যথাবিহিত ব্যবস্থা গ্রহণে সক্ষম।
সারাজীবন এ ধরনের নানা হ্যাপা মাথায় বয়ে বেড়িয়েছেন। শেষবেলায় ভাইপো হাজির এবং তাকে একটি কাজে ঢুকিয়ে দেওয়া যে কত কঠিন কাজ হাড়ে হাড়ে টের পেয়ে বলেছিলেন, তুই বাবু দেশে ফিরে যা। পার্টি কর। পার্টি না করলে এখন চাকরি হয় না। কতদিন হয়ে গেল, এত ভালো ছবি তুলিস, তবু কোনও চ্যানেল, কিংবা কাগজে হোর চাকরি হয় না। ভবেশ বুঝল, দেবীপদ এইসুত্রেই বোধহয় তার দিকে অভিযোগের আঙুল তুলেছে। সে পার্টি করতে না বললে, তার পুত্র রাজনীতি নিয়ে যে জীবনেও মাথা ঘামাত না—এখন রাজনীতি করতে গিয়ে তার প্রাণসংশয়, কে সামলাবে—যার পরামর্শে তাকে ছাপ্পা ভোট দিতে বাধ্য করা হয়েছিল, পার্টি না করলে ছাপ্পা ভোট দিতে কেউ জোরজার করত না—সুতরাং দেশে গিয়ে এ-বিষয়ে পার্টির লোকদের সঙ্গে কথা বলতেই হয়—
