বিজুর কিছুই ভালো লাগছিল না। শেষ পর্যন্ত সে আলগা হয়ে শুতে চাইল। অমলেশও কোনো জোর করল না আর। পাশাপাশি দুজন শুয়ে আছে অপরিচিতের মতো। কোনো কথা না। পথে কোনো অসুবিধা হল কি না, ওদের কলেজের সুধাদির কী খবর এবং যা হয়ে থাকে, কিছু না কিছু কথা, খেতে বসে, খেয়ে উঠে, মুখ ধুয়ে এবং বিছানায় শুয়ে-কথার শেষ থাকে না। অথচ আজ চুপচাপ।
শেষ রাতের দিকে অমলেশ টের পেল বিজু ওর পাশে নেই। অমলেশ ধকফড় করে উঠে বসল। বিজু গেল কোথায়! সে বুলুর বিছানা দেখল, না বিজু নেই।
সে যে এখন কী করবে ভেবে পাচ্ছে না। অথচ বারান্দায় এসে দেখল দরজা খোলা।
সে কেমন ভয় পেয়ে ডেকে উঠল, বিজু! বিজু! তারপর সে চিৎকার করবে ভাবতেই দেখল, বিজু পাতাবাহার গাছটার নীচে দাঁড়িয়ে মোমবাতি জ্বালিয়ে কী যেন খুঁজছে।
তুমি কী খুঁজছ বিজু।
পাখিটাকে।
পাখিটা মানে।
সেই বাচ্চা পাখিটা। বাথরুমে যাব বলে আলো জ্বেলেছি। পাখিটা এসে আমার মাথায় বসল। ধরতে গেলাম উড়ে জানালা দিয়ে গাছটায় এসে বসল।
সে ত ভালো হল। উড়তে শিখে গেছে।
অন্ধকারে কোথায় যাবে বলত! ও-তো বেশিদূর উড়ে যেতে পারে না। গাছটার কোনো ডালে বসে আছে কি না খুঁজে দেখছি। বলে বিজু এ-ডাল ও-ডালের ফাঁকে মোমবাতিটা তুলে ধরে বলছে, দ্যাখ তো আছে কি না!
অমলেশ ম্লান হাসল—এসো, ঘরে যাবে। মোমবাতির আলোতে পাখিটাকে খুঁজে পাবে না। কিন্তু বিজু এতটুকু নড়ল না। ওরা এবার পরস্পর মোমবাতির আলোয় নিজেদের মুখ দেখল। মনে হল ওরা এক দূরবর্তী রেল স্টেশনে দাঁড়িয়ে আছে। একটা ট্রেনের জন্য ওরা অপেক্ষা করছে। এই চেনা মুখ বড়ো অচেনা মনে হচ্ছে বিজুর। বিজু বেশিক্ষণ সেজন্য তাকাতে পারল না। ভয়ে চোখ বুজে ফেলল। বাঁ হাতে মোমবাতি জ্বলছে বিজুর এবং গলে গলে অন্ধকার ওর চার পাশে জোনাকির মতো উড়ছিল। বিজু পাতার ভিতর মুখ লুকিয়ে রেখেছে। মুখটা পাতার ভিতর মোমবাতির আলোতে কাঁপছে। অমলেশ আর স্থির থাকতে পারল না। বিজুকে গাছের নীচে জোর করে সে চুমু খেল। বিজু অমলেশকে চুমু খেল। মোমবাতির আলোতে আর পাখি খোঁজা হল না। বিজুর চোখে জল এসে গেল।
বৃদ্ধ ও প্রতারক
তিনি কী করবেন বুঝতে পারছেন না। আজকাল তাঁর কিছু মনেও থাকে না। বয়স হলে যা হয়। সকালে দেশ থেকে মেজভাই দেবীপদর ফোন পেয়ে তিনি কিছুটা উতলা। তাঁর দেশে যাওয়া দরকার। তাঁর কথায় দেবীপদর পুত্র বাবু। রাজনীতির শিকার, এবারের পঞ্চায়েতে ছাপ্পা ভোট দিতে গিয়ে ধরা পড়েছে। তারপর মারধর যা হয়, এখন সে বিছানায়। বিরোধীদলের লোকেরা তার লাশও ফেলে দেবে এমন আতঙ্ক ছড়িয়ে গেছে। এই বিড়ম্বনার হেতু যে তিনি এমনও ফোনে অভিযোগ করেছে। এটাই তিনি মনে করতে পারছেন না।
বিড়ম্বনার হেতু তিনি কেন হবেন!
বাড়ির সঙ্গে যোগাযোগ মায়ের মৃত্যুর পরই কমে গেছে। মা বেঁচে থাকতে বছরে অন্তত দু-তিনবার দেশে যেতেন। দেশের লোকজনদের সঙ্গে দেখা করারও টান বোধ করতেন। গোটা একটা গ্রামই দেশভাগের পর প্রায় একসঙ্গে না হলেও সামান্য এদিক-ওদিকে এই দেশে এসে চেনাজানা লোকের খোঁজ করতে গিয়ে দেখা গেল পুরো গ্রামটাই বাবা-জ্যাঠার টানে হাজির। আমার বাবা-জ্যাঠারা আবার চিঠি দিয়েও জানিয়েছিলেন, ও-দেশে হিন্দুরা থাকতে পারবে না। দাঙ্গা ধর্ষণ অগ্নিসংযোগ লেগেই থাকবে। ইজ্জত রক্ষার্থেও হিন্দুস্থানে তোমাদের চলে আসা দরকার। এখানে সবই সস্তা। ফাল্গুন-চৈত্রে এক পয়সায় দু সের বেগুন পাওয়া যায়। সতেরো টাকায় এক মন চাল। বাজারে দেশের সবরকমেরই মাছ পাওয়া যায়। এমনকি কাচকি মাছ পর্যন্ত। সামান্য দু-পা হেঁটে গেলে ভাগীরথী, প্রতিদিন নদীতে ডুব দিলে পুণ্য অর্জনেও অসুবিধে হয় না। সস্তায় জমি, সস্তায় চাল, ডাল, মাছ এবং পুণ্যসঞ্চয় এমন দেশটি কোথাও খুঁজে পাবে নাকো আর।
ফলে যা হবার হয়েছে।
চেনাজানা এবং দেশের আত্মীয়স্বজন প্রায় একলপ্তে জমিজমা কিনে, বাড়িঘর করে একসঙ্গে আছে সেই কবে থেকে। বিপদে-আপদেও আছে, পালাপার্বণেও আছে।
বিড়ম্বনার হেতু তিনি কেন, দেবীপদ তার বিরুদ্ধে এমন অভিযোগ কেন তুলছে ফোন করেই জানতে পারতেন। কিন্তু কেন যে তাঁর মনে হল–বাবুর সঙ্গে দেবীপদও সন্ত্রাসের শিকার। বিরোধীদলের লোকজনদের নিকেশ করে দেবার সঙ্গে ক্ষমতা দখলের জোর লড়াই হচ্ছে—সে ভাবতে পারে তিনি কাছে থাকলে যতই সন্ত্রাস হোক, তার কিংবা বাবুর কেউ ক্ষতি করতে পারবে না। তাঁর ব্যক্তিত্ব এবং সম্রান্ত আচরণে প্রতিবেশীরা কমবেশি সবাই আকৃষ্ট হয়। এবং তাঁর খ্যাতিরেও সবাই শরিক হতে চায়। দ্যাশের লোক সোজা কথা।
তবে ইচ্ছে করলেই যাওয়া যায় না। সংসারের অজস্র হ্যাপায় তিনিও যথেষ্ট নাস্তানাবুদ। তার নাতি-নাতনিরা স্কুলে কলেজে পড়ে। যা দিনকাল সতর্ক নজর না রাখলেও হয় না। সে যাই হোক দেবীপদর এতবড় বিপদে তার পাশে থাকা দরকার। তা ছাড়া বাবু গত সাত-আট বছর তাঁর বাড়িতেই ছিল। এবং বাড়িটায় তিনতলা মিলিয়ে দশটি ঘর, বাঁধা মাইনের দু’জন চব্বিশ ঘণ্টার লোকও আছে। প্রায় হোটেলের মতো হয়ে গেছে তাঁর বাড়ি। অসুখেবিসুখে ভালো চিকিৎসার দরকার হলে, দেশের ভাইবোন, আত্মীয়স্বজন সবারই চাকরির খোঁজে কিংবা চাকরির সূত্রে থাকার অস্থায়ী বন্দোবস্ত এই এক ঠিকানা—কী আর করবে। বড়দার শরণাপন্ন হলে সব ঠিক হয়ে যাবে।
