তরুণের নাম বাদল। সে চিঠিটা হাতে নিয়ে উলটেপালটে দেখল। তারপর
বলল, ওর তো বিয়ে হয়ে গেছে।
-বিয়ে! তবে যে চিঠি লিখল।
–হ্যাঁ। বিয়ে মানে—বলে আমতা আমতা করতে থাকল। প্রৌঢ়াই বললেন, ও আর বিয়ে। ওর মা-বাবা ওকে আসলে বেচে দিয়েছে। হপ্তাখানেক আগে এলে পেতেন।
-কী বলছেন!
–এদিকটায় হামেশা এমন হচ্ছে। অভাবের তাড়না!
জয়ন্ত হতবাক। সে তাকিয়ে আছে।
—কী করবে! বড়ো গরিব। খেতে পায় না। বেচে না দিয়েও উপায় ছিল না। একসঙ্গে এত টাকা কে দেয়!
—কিন্তু।
-কিন্তু আর কী! আপনি তো কাগজের লোক। গ্রামটা ঘুরে দেখে যান না। লিখুন। গরিব চাষাভুষো মানুষের কী অবস্থা দেখে যান।
জয়ন্ত সহসা কেমন ক্ষিপ্ত হয়ে গেল। আপনারা থাকতে–সে তোতলাতে থাকল, একটা নিরীহ মেয়েকে, না আমার মাথায় আসছে না। এখানে পার্টির লোকেরা কিছু বলে না?
—কী বলবে? এটা তো গণতান্ত্রিক ব্যাপার। বাবা-মা তার মেয়েকে বিয়ে দিচ্ছে, তার কী বলার আছে!
-বিয়ে?
–ওই শো একটা। তারপর মেয়েগুলির আর খোঁজ পাওয়া যায় না। ইস সে যে কী ভুল করেছে! প্রথম চিঠিটাতেই ছিল—মেসোমশাই, আমাকে নিয়ে যান। বিয়ে-টিয়ে কিছু না। এলে জানতে পারবেন। তাড়াতাড়ি আসবেন। কাউকে দিয়ে সে চিঠিটা লিখিয়েছিল। জয়ন্তর এখন নিজের হাত কামড়াতে ইচ্ছে হচ্ছে। কোথায় কে নিয়ে গেল ভাগীরথীকে। আসলে পাঁচ-সাত বছরে ভাগীরথী তার বাড়িরই কেউ হয়ে গেছিল। ঘরে কুকুর-বেড়াল থাকলেও মায়া পড়ে যায়, আর এ তো মানুষ। তার চোখ সহসা ঝাপসা হয়ে গেল। সে সারা রাস্তায় শুধু নিজেকে নিয়ে ভেবেছে। ভাগীরথীর কথা একবারও মনে হয়নি তার।
সারা রাস্তায় নিজের অস্তিত্ব নিয়ে দুশ্চিন্তার ছিল, ভাগীরথীর অস্তিত্ব নিয়ে তার কোনো দুশ্চিন্তা ছিল না। সেই ভাগীরথী বিক্রি হয়ে গেছে। রাস্তায় নেমে এবার বোলপুরের বাস ক-টায় কাউকে তার জিজ্ঞেস করতে ইচ্ছে হল না। সে হেঁটে যাচ্ছে। রোদের ভেতর দিয়ে হেঁটে যাচ্ছে। কেমন বেহুঁশ।
চারপাশে খাঁ খাঁ মাঠ। গাছপালাহীন এক দাবদাহ ক্রমে তাকে গ্রাস করতে থাকল। সে নিজেকে এই প্রথম নির্যাতন করে যেন সবার উপর প্রতিশোধ নিচ্ছে। যে জানেই না কোথায় যাচ্ছে–কেন যাচ্ছে। ক-টায় বাস, কখন ট্রেন, তার যেন আর জানার দরকার নেই। গরমে সে হাঁসফাঁস করছিল। কোটটা ছুঁড়ে ফেলে দিল, মাফলার ছুঁড়ে ফেলে দিল, জলের বোতল—সব। তারপর সে হাঁটতে হাঁটতে কখন ক্লান্ত হয়ে গাছের ছায়ায় ঘুমিয়ে পড়েছিল জানে না। জেগে দেখল, আকাশে অজস্র নক্ষত্র। এই নক্ষত্রের ভেতর সে শীতের রাতে আবার কোনদিকে রওনা হয়ে গেল। সে এত আত্মপর এই প্রথম টের পেয়ে কোনো নিষ্ঠুর জীবনের স্বাদ গ্রহণের ইচ্ছায় উন্মত্তের মতো হাঁটছে। তার এ আর-এক যাত্রা—কে জানে এ-যাত্রার শেষেও আবার কোনো বিপ্রটিকুরী তার জন্য অপেক্ষা করছে কিনা।
বুলুর শেষ লুডোখেলা
সিঁড়িতে পা দিতেই অমলেশ টের পেল বিজু এসেছে। বিজুর স্লিপার বারান্দার এক পাশে, ঠিক দরজার মুখে এবং চৌকাঠের বাঁদিক ঘেঁষে থাকে—কারণ এটা স্বভাব বিজুর, সে এলেই তার হলুদ রঙের স্লিপার দরজার বাঁদিক ঘেঁষে রাখবে। অমলেশ দেখল এপাশে বিজুর হলুদ রঙের স্লিপার। দড়িতে ওর মীর্জাপুরি শাড়ি। এসব দেখলেই অমলেশ যেন ভিতরে ভিতরে অস্থির হয়ে ওঠে।
এ-সপ্তাহে বিজুর আসার কথা নয়। বিজু আসছে সপ্তাহে আসবে এমন কথা ছিল। চিঠিতেও তেমন লিখেছে। অথচ সহসা এই চলে আসা, এলেই একটা বিস্ময় নিয়ত খেলা করে বেড়ায়, যেন বিজু তার জন্য গ্রাম মাঠ থেকে নানারকমের ফসল সংগ্রহ করে এনেছে। ছেলে দুটো ঘুমিয়ে পড়লেই সে তার সব সংগ্রহ খুলে দেখাবে।
যা হয় অমলেশেরওর তখন রা-রা করে গান গাইতে ইচ্ছা হয়। গলা জড়িয়ে চুমু খেতে ইচ্ছা হয়। অথচ সে এখন কিছুই পারছে না। যতক্ষণ না টুলু বলু ঘুমোয়, ততক্ষণ সে চুপচাপ, যেন তার আর তর সয় না, সে যে কী করবে ভেবে পায় না, রান্নার লোকটাকে তাড়াতাড়ি ছেড়ে দিয়ে সে বিজুর পিছু পিছু তখন কেবল ঘুরে বেড়ায়।
অমলেশ বারান্দার একপাশে দাঁড়িয়ে থাকল। বিজুর গলা পাওয়া যায় কিনা শোনার চেষ্টা করল। ভিতরে কোনো সাড়া শব্দ নেই।
অথচ বিজু এলে এমনটা হয় না। চারপাশের যা কিছু অগোছালো, যেমন টুলু বুলুর টেবিল, তার টেবিল, নোংরা ঘরদোর, বিজু এলেই সব পরিপাটি করে সাজিয়ে রাখে। যে ক-দিন থাকে ঘরদোর কী তকতকে ঝকঝকে! আর বিজু চলে গেলেই সংসার বড়ো অগোছালো হয়ে যায়। ওর পিয়ন এসে দুই ছেলেকে স্কুলে রেখে আসে। বিকেলে সে বাড়ি এসে দুই ছেলেকে নিয়ে পার্কে যায় এবং রাত্রিতে ফিরে এসে ছেলেরা ঘুমিয়ে পড়লে সে একটা ক্রাইম নভেলে মুখ ডুবিয়ে পড়ে থাকে। ঘরদোর সাফসুতরোর ব্যাপারে সে কেমন উদাসীন হয়ে যায় তখন।
আর বিজু এসেই ঘরদোরের অবস্থা দেখে দু-পা ছড়িয়ে ছেলেমানুষের মতো কাঁদতে বসে। তোমাদের এত বলেও পারি না। লোকজন এলে কী ভাবে!
অমলেশের তখন সত্যি হুঁশ হয়—ওদের পড়ার টেবিলটা সত্যি অগোছালো। যেখানে যা থাকবার কথা সেখানে তা নেই। কোনো বই টেবিলের নীচে, কোনোটা খাটের ওপর ছড়িয়ে-ছিটিয়ে পড়ে আছে। পড়ার পর তুলে রাখার কথা ওদের মনে থাকছে না। বুড়ো মাসির পক্ষে এত দেখাশোনা করা কষ্ট। বিজু চলে গেলে সংসারের সবাই কেমন বাউণ্ডুলে হয়ে যায়। আলনাতে জামাকাপড় ভাঁজ করে রাখে না কেউ। কোনো কোনো দিন অমলেশ ভয়ে ভয়ে নিজের টেবিলটার দিকে তাকাতে পারে না পর্যন্ত। বিজু এবার তাকে নিয়ে পড়বে। সে যেন ভয়েভয়েই তখন কতকটা নিজের টেবিলের বইপত্র, লেখার প্যাড সব সাজিয়ে রাখতে গেলে দেখতে পায়, বিজু তেড়ে আসছে—হয়েছে থাক। আর কাজ দেখাতে হবে না, যতক্ষণ আছি করে যাব।
