বুধবার শান্তিনিকেতন বন্ধ সে জানত না। বুধবার দেরিতে রাত শেষ হয় এখানে—সে জানত না। বুধবার ঘড়ির কাঁটা পেছনের দিকে হেঁটে যায় জানত না। গোদা পাঁচটা টাকার বিনিময়ে তেমাথায় দাঁড় করিয়ে দিয়ে চলে গেছে। এখন যে কেউ এসে তাকে বলতে পারে, যা আছে দিন। সে ঠিকই করেছে, সব দিয়ে দেবে। কোট খুলে দেবে। হাতঘড়ি খুলে দেবে। বেশি টাকা যা আছে দিয়ে দেবে। রাত এত নিশুতি হয়, রাত এত নির্জন হয়, রাত এমন বিশ্বাসঘাতকতা করতে পারে এর আগে সে টের পায়নি। তেমাথা জায়গা কোনোদিন ভালো হয় না। ছেলেবেলার সংস্কার আবার মাথায় পোকা হয়ে ঢুকে গেছে।
রাস্তার আলো, দূরে মাঠ পার হয়ে বাড়ি-ঘরের আলোর রহস্য ক্রমেই ভূতুড়ে হয়ে উঠছে। গাছপালার পাতা ঝরছে। সামান্য ঘূর্ণিঝড় উঠল। না—আর এভাবে দাঁড়িয়ে থাকলে সে পড়ে যেতে পারে। ঠকঠক করে কাঁপছে। ঘড়ি দেখবে, তাও ভয় হচ্ছে। যদি দেখতে পায় কাঁটা সাড়ে-তিনটের ঘরে ঢুকে গেছে। আধঘণ্টা হয়ে গেল, তবু আকাশ ফর্সা হচ্ছে না। সে রাস্তার আলোতে আবার ঘড়িটা দেখবে ঠিক করল। যা হয় হবে। বের হবার সময়ই মনে হয়েছে, বিপ্রটিকুরী বড়ো বেশি অচেনা জায়গা। আর তখনই দেখল, দুটি জীব দুলতে দুলতে এদিকে এগিয়ে আসছে। ঘোড়া, গোরু না কুকুর, না ঘোড়া নয়, ঘোড়া এভাবে হাঁটে না, গোরুও নয়, গোরু এভাবে হাঁটে না। কুকুর অত যদি বড়ো হয় তবে তার যাও সাহস অবশিষ্ট আছে সেটুকু নীল হয়ে যাবে। মানুষজন যদি কখনো এখানে আসেই দেখতে পাবে কেউ ভয়ে মরে পড়ে আছে।
ধীরে ধীরে বেশ চালে আসছেন। যত আসছেন, তত জয়ন্ত বড়ো বড়ো চোখে দেখছে। ও-তেনারা দুজন গাধা। রাত থাকতেই বের হয়ে পড়েছেন। সব জোড়ায় জোড়ায়। এক জোড়া কুকুর উনুন থেকে উঠে পথ শুকতে শুকতে চলে গেল। একজোড়া গাধা চলে গেল। তারপরই গেল একজোড়া ঢাকি। চোখের উপর দিয়ে চলে গেল। সে ডাকল, তারা সাড়া দিল না।
সে বোধহয় ভিরমি খেত। আর তখনই পাশের একটা দোকানের ঝাঁপ উঠে গেল। লোকটা বের হয়ে তার সামনেই পেচ্ছাপ করতে বসল। গাছের অন্ধকারে তোকে দেখতে পাচ্ছে না। সে ডাকল, ও দাদা—আপনি কি আবার ঘুমোতে যাচ্ছেন? লোকটার ঘুমের ঘোর কাটেনি বোধহয়। বলল, কে?
–বিপ্রটিকুরীর বাস ধরব আশায় বসে আছি। কটা বাজে।
লোকটা বিন্দুমাত্র দাঁড়াল না। দৌড়ে ঘরে ঢুকে গেল। ঝাঁপ বন্ধ করে দিল। ঘড়ি দেখতেই হয়। যা হয় হবে। ঘড়িটা চলছে। অথচ ঘড়ির কাঁটা পেছনের দিকে ঘুরছে। আবার যদি তাই দেখে! হয় হোক ভেবে তবু সে যা দেখল। চলছে সামনে চলছে। সাড়ে চারটে—এবারে সে কিছুটা সাহস পেয়ে গেছে। আসলে উদ্বেগ, দুর্ভাবনা এবং ভয় তাকে সারারাত জাগিয়ে রেখেছে। সে আসলে বের হয়েছে চারটের আগে। ঘড়িতে সাড়ে-তিনটে দেখতে সাড়ে-চারটে দেখেছে। এখন আর তার ভয় লাগছে না। ভাগীরথীকে নিতে এসে এটা সে কত বড়ো ধৈর্যের পরীক্ষা তার বাড়ির লোক যদি বুঝত।
পাঁচটায় বাস এল সাড়ে-সাতটায়। একজন বলল, পাঁচটায় বাস বিপ্রটিকুরী থেকে ছাড়ে। সাড়ে-ছটায় আসে। সাড়ে-সাতটায় রওনা হয়।
-একখানা বাস।
–আজ্ঞে হ্যাঁ।
তা শেষ পর্যন্ত বাসে সে সামনের দিকে সিট পেয়ে গেল। একটা ব্রিজ পার হয়ে বাসটা থেকে নেমে সামনে কিছু ঘরবাড়ি পার হতেই দুপাশে শীতের মাঠ। তার ভালো লাগছিল। এখন ভাগীরথীকে নিয়ে ঠিক ঠিক ফিরতে পারলে হয়। ভাগীরথীর আঁচলে তার ঠিকানা লিখে একটা কাগজে গিঁট মেরে দিতে হবে। এত হাবা কিছুতেই বাপের নাম, নিজের নাম, তার নাম মনে রাখতে পারে না। নিয়ে যাবার সময় পথে হারিয়ে গেলে আর এক কেলেঙ্কারি। পরের মেয়ে নিয়ে কত দায় মাধু যদি বুঝত।
শেষ পর্যন্ত বিপ্রটিকুরী পৌঁছোন গেল। জয়ন্ত রাস্তাতেই মতিলালের বাড়ির খবর নিতে গিয়ে জানল, ওরা ওখানকার জমিদার বাড়ির বৌ। জমিদারি যাবার পর সব এখানে ওখানে ছিটকে পড়েছে। দু-চার শরিক এখনো আছে—জয়ন্তর এ যেন আর এক তেলেনাপোতা আবিষ্কার। সে পরিচয় দিতেই একজন তরুণ বের হয়ে এল। বেশ ছিমছাম যুবক। গালে দাড়ি সবে উঠেছে। চেহারা বেশ মার্জিত। গাঁয়ে এইরকমের চেহারা বড়ো একটা দেখা যায় না। আসলে অভিজাত পরিবারের ছেলে। জয়ন্ত তার পরিচয় দিলে সে বলল, ভেতরে আসুন!
জয়ন্ত এখানে তেলেনাপোতা আবিষ্কারের মতো এক যুবতীকেও আবিষ্কার করে ফেলল। দোতলা বাড়ি, ভাঙা ঘর-দালান, পলেস্তারা খসা, চুন-সুরকি ঝুর ঝুর করে খসে পড়ছে। কোথাও দেয়ালের সামান্য রসটুকু নিঠুর বটের চারা শুষে নিচ্ছে। বাড়িতে ঢুকতে তার ভয় করছিল। দোতলায় উঠে বুঝল, সে হাঁটলে বাড়িটা কাঁপে। ভাগীরথীর খবর এদের কাছ থেকেই তার জেনে নেবার কথা। যুবতী গা ঢেকে বারান্দায় এসে উঁকি দিয়ে চলে গেল। প্রৌঢ়া মহিলা এসে বললেন, আমার জা হয়। দারিদ্র্য এবং হতাশা আড়াল দেবার জন্য শাড়ি-সায়া পালটে এসেছেন বোঝা যায়। কিন্তু মুখে-চোখে দুশ্চিন্তার আভাস টের পাওয়া যায়।
জানলা দিয়ে গ্রামটা দেখা যায়। এককালে বর্ধিষ্ণু গ্রাম ছিল বোঝা যায়। এখন চারপাশে ছোটো ছোটো সব কুঁড়েঘর, দূরে স্কুলবাড়ি, পিছনে দাওয়া। কোনো ভগ্নস্তূপের ভিতর থেকে সে একটা মন্দিরও দেখতে পেল।
সে বলল, বসব না। ভাগীরথীর চিঠিটা সে দেখাল।
