একবার অমলেশের সঙ্গে বিজুর এই নিয়ে কথা কাটাকাটি হয়েছিল। বিজু চলে গেলে অমলেশ এবং টুলু বুলু মিলে খুব সাবধানে থাকল। টেবিল, আলনা, বইপত্র যেখানে যা থাকার রেখে দিল। যেদিন আসবে সেদিন সকালে আর একবার গুছিয়ে রাখল সব।
আর বিজু এসেই দেখল, একেবারে চারপাশটা ঝকমক করছে। কোথায় সে এসব দেখে খুশি হবে, তা না, সে ভয়ংকর দুঃখী মানুষের মতো মুখ করে ফেলল। সে যেভাবে সব রেখে গেছে সব প্রায় তেমনি গুছোনা। বিজুর মনটা টনটন করে উঠল। সে এতটা শাস্তি আশা করেনি। সে সারাক্ষণ কাজকর্ম ছাড়া বাঁচে না। কাজকর্ম করতে করতে একটু বচসা করা ওর স্বভাব। দুই দামাল ছেলে, ঠিক দুজন নয়, ওর কাছে ওরা তিনজন, কারণ সে এ-সময় কখনো অমলেশকে স্বামী বলে ভাবতে পারে না, যেন ঘরে সে তিন দামাল ছেলে রেখে গেছে—ওরা হুটোপুটি করে সব অগোছালো করে না রাখলে তার হাতে কাজ থাকে না—সে চুপচাপ বসে থাকলে মনে হয় বেড়াতে এসেছে এখানে, সে অমলেশের কাছে বেড়াতে এসেছে। সে এ-সংসারের কেউ নয়।
বিজু এসেই সে রাত্রে আর অমলেশের সঙ্গে কথা বলেনি।
কি ব্যাপার! অমলেশ প্রশ্ন করেছিল। এসেই একেবারে মুখ গোমড়া করে বসে থাকলে।
কোনো কথা না বলে বিজু বাথরুমে চলে গিয়েছিল। সে ঘাড়ে গলায় জল দিয়েছিল। অন্যদিন সে যেমন এসেই আয়নায় মুখ দেখে সেদিন সে তাও দেখেনি। হাত-পা ধুয়ে একটা চাদর গায়ে সে পাশ ফিরে শুয়ে পড়েছিল।
অমলেশ বলেছিল, আরে হয়েছে কি তোমার? বিজু জবাব না দিলে অমলেশ কেমন উদবিগ্ন গলায় বলেছিল, তোমার শরীর খারাপ! ডাক্তার ডাকব।
বিজু আর চুপ করে থাকতে পারেনি। সে ফেটে পড়ল। আহা, বাবুদের চোখে ঘুম নেই। বাস ট্রেন করে এতদূর আসা-বিজুর কি কষ্ট! সব কাজ ওর আমরা করে রাখি! বিজু এবার উঠে বসল। সে তার বড়ো ছেলেকে ডাকল, এই টুলু তোরা সবাই মিলে যে খুব সংসারী হয়েছিস!
ঠিক আছে আর কিছু করব না। তুমি এসে বোকার মতো খাটবে।
বিজুর একটা অদ্ভুত অভিমান আছে ভিতরে। কিছু কথা কাটাকাটি হলেই বিজু বলে, সংসার থেকে তাকে ইচ্ছা করে দূরে সরিয়ে রাখা হয়েছে, যেন ইচ্ছা করলেই অমলেশ তাকে এই বড়ো শহরে নিয়ে আসতে পারে। আনে না, অমলেশের ইচ্ছা নেই তাকে নিয়ে আসার। অমলেশের প্রভাবশালী বন্ধুবান্ধবের অভাব নেই। একটু অনুরোধ করলে কে তেমন মানুষ আছে তাকে অবহেলা দেখায়।
অমলেশ তখন চুপচাপ থাকে। বিজু রেগে গেলে ভীষণ ভয় করে তার। সে কিছুতেই বোঝাতে পারে না, অনেক চেষ্টা করছে কিন্তু সে কিছু করতে পারছে না। সুতরাং আজ এসেই আবার বিজুর তেমন কিছু হল কিনা—কারণ সব চুপচাপ, টুলু বুলুর পর্যন্ত সাড়াশব্দ পাওয়া যাচ্ছে না, অমলেশের চোখে-মুখে অস্বস্তির ভাব ফুটে উঠছে। সে ঘরে ঢুকে দেখল পরদাটা নড়ছে হাওয়ায়। এ-ঘরে কেউ নেই। সে দেখল ক্যালেন্ডারে এসেই বিজু একটা দাগ দিয়েছে, আবার সে কবে আসতে পারবে তার নির্দেশ। সে আর মুহূর্ত দেরি করতে পারল না। পরদা ঠেলে শোবার ঘরে ঢুকতেই দেখল, নিবিষ্টিমনে মা এবং দুই ছেলেতে কী যেন করছে। টেবিলের উপর চেয়ার রেখেছে বিজু। টুলু বুলু চুপচাপ টেবিলের পাশে। দু-হাতের ফাঁকে কিছু একটা লুকিয়ে রেখেছে এবং বিজু চেয়ারের উপর দাঁড়িয়ে টুলুর হাত থেকে সেটা নেবার সময় দেখল পিছনে অমলেশ। যেন ধরা পড়ে গেছে এমন সংকোচে সে তাড়াতাড়ি ওটা উপরে রেখে দেবার সময় শুনল অমলেশ বলছে পড়ে গেলে বুড়ো হাড় জোড়া লাগবে না। যেন এসব কথা বিজুকে বলছে না, এই ঘরের দেয়াল, খাট আলনা এসবের উদ্দেশে বলছে।
বিজু কোনো উত্তর করছে না দেখে সে টেবিলের পাশে এসে দাঁড়াল। বলল, নাগাল পাচ্ছ না। দাও আমি রেখে দিচ্ছি।
বিজু যেন হাঁফ ছেড়ে বাঁচল। বলল, দেখো যেন পড়ে না যায়।
এত মায়া তোমার!
অমলেশ যে এমন একটা খোঁচা দেবে সে যেন জানত। কারণ চড়াই পাখি দুটো যখন প্রথম এ দেয়ালে এসে বাসা বাঁধে, বিজুর কী রাগ। সে এসেই যতবার দেখেছে মেঝেতে চড়াই হেগেমুতে একেবারে যাচ্ছেতাই করে রেখেছে, তখন সে যে কতবার রাগে দুঃখে পাখি দুটোকে তেড়ে গেছে, আর বলিহারি যাই পাখি দুটোও কী বেহায়া। বিজুকে সারা ঘর ছুটিয়ে মেরেছে, কিন্তু ঘর ওরা ছেড়ে দেয়নি। বিজু প্রতিবার এসেই চড়াই দুটোর বাসা ভেঙে দিত। আর বিজু চলে গেলেই চড়াই দুটো আবার বাসা বানিয়ে নিবিষ্টমনে সুখে-স্বচ্ছন্দে এ-ঘরে উড়ে বেড়াত।
আর এ-ব্যাপারেও বিজু অমলেশকে দায়ী করত। এরই কাজ। যেন অমলেশ শলাপরামর্শ করে বিজুকে এভাবে বার বার জব্দ করছে পাখিদের দিয়ে। সুতরাং বিজু ভেবেছিল, চড়াইর ছানাটাকে অমলেশ আসার আগে আগেই তুলে রাখতে হবে। যাতে অমলেশের কাছে সে ধরা না পড়ে। এবং বিজু এবারই প্রথম বাড়ি এসে সব সাফসুতরো করার সঙ্গে পাখিটার বাসা ভেঙে দেয়নি। সে বরং দেখল পাখির একটা ছোট্ট বাচ্চা নীচে পড়ে আছে। বুলু খেলতে যায়নি। সে সারাক্ষণ বাচ্চাটাকে পাহারা দিয়েছে। কারণ পাশের ফ্ল্যাটের বেড়ালটা ওৎ পেতে আছে, কখন বুলু উঠে যাবে এবং সে খপ করে বাচ্চাটাকে গিলে খাবে।
বিজু তখন এসে দেখল বুলু খেলতে বের হয়নি, যখন দেখল বুলু বলছে দ্যাখো মা বাচ্চাটা এখানে পড়ে আছে, আমি সারাক্ষণ বসে আছি, বাবা এলে বলব তুলে দিতে তখন বিজুর এই ঘরসংসারের মতো বাচ্চাটার উপর চড়াই পাখি দুটোর উপর কেমন মায়া পড়ে গেল!
