তার পাশে এত মানুষজন, তবু এত একা কেন বুঝছে না। আসলে অভ্যাস মানুষকে খুবই আলগা করে দেয়। এই ভিড়ের মানুষজনের সঙ্গে সে নিজেকে যেন মেলাতে পারছে না। কারো সঙ্গে কথা বললে হয়—কী নিয়ে বলবে! রাজনীতি, না কারো কোনো আগ্রহ নেই। ক্রিকেট টেস্ট চলছে। কেউ ট্রানজিস্টার কানে লাগিয়ে শুনছে না। সব মানুষকে মনে হচ্ছে সত্যি আলাদা গ্রহের।
দানাপুর এলে মাথায় হাত। কোনো কামরায় সে উঠতে পারছে না। ঠেলা খেয়ে নেমে আসছে। গাড়ি ছেড়ে দেবার সময় হাতল ধরে ঝুলে পড়ল। কপালে যা আছে। গুসকরায় গিয়ে মনে হল সে আর পারছে না। যে-কোনো মুহূর্তে কিছু একটা হতে পারে। পাশের লোকটা বলল, আর একটা স্টেশন! সামনে বোলপুর। জয়ন্ত আবার লাফিয়ে হাতল চেপে ধরল। মাঠের ভেতর দিয়ে হুইসেল বাজিয়ে ট্রেন যাচ্ছে। সে কিছুই দেখতে পাচ্ছে না। হুহু করে হাওয়া বইছে। যেন তাকে
উড়িয়ে দেবে। সে চোখ বুজে ছিল।
—বিপ্রটিকুরী কতদূর।
—কেউ জানে না কতদূর।
জয়ন্ত বলল, কে জানে?
–এগিয়ে যান। তারপর কে যেন বলল, বাসস্ট্যান্ডে যান—খোঁজ নিন।
–বিপ্রটিকুরীর বাস কটায়?
—এই আসে এই যায়, একজন বলল।
—কোথায় পাওয়া যাবে?
—এখানে না। দূরপাল্লার বাস এখান থেকে ছাড়ে।
সন্ধ্যা হয়ে গেল। চায়ের দোকানদারকে সে বলল, তুমি জান ঠিক সকাল পাঁচটায় বিপ্রটিকুরীর বাস!
-তাই তো মনে হয় স্যার।
–ঠিক কটায় বলতে পার না?
–না স্যার। ঠিক বলা যাবে না। বাসের মর্জি।
আর যাই করা যাক, আজ আর যাওয়া হবে না। চেনাজানা নেই, অজ্ঞাত পরিচয় একজন মানুষকে কে আশ্রয় দেবে! বিপ্রটিকুরী থেকে হাঁটা পথে ক্রোস খানেক। কেউ বলল, মশায়ের মাথা খারাপ। ফিরে যান। দেখছেন না, যেখানে সেখানে খুনখারাবি হচ্ছে, অচেনা লোক দেখলেই সন্দেহ। জয়ন্ত তাড়াতাড়ি একটা রিকশাকে ডেকে বলল, কাছে কোথাও কোনো ভালো হোটেল আছে ভাই।
—আছে স্যার। যোগমায়া হোটেল। চলুন। ফাস্ট ক্লাস!
আর ফাস্ট ক্লাস, এখন বলির পাঁঠা—কী যে রাগ হচ্ছে। জয়ন্তর মুখ থমথম করছে। হোটেলে ঢুকে ঘরভাড়া ত্রিশ টাকা, খাওয়া খরচ আলাদা। হোটেলের ভিতরের দিকে উঠোনে গাছপালা, গোরু-মোষ। ঘরটার লাগোয়া মেয়েদের বাথরুম। সারারাত দরজা খোলা-বন্ধ করার শব্দ। এটাচড বাথ বলতেই হোটেলওয়ালা কেমন ঘাবড়ে গেছিল। লোকটা বলে কী!
কিছু করার নেই। সারা রাত অনিদ্রায় কাটাতে হবে। বিছানায় চাদরে দুর্গন্ধ। জয়ন্ত কোনোরকমে বলল, এক গ্লাস জল খাওয়াতে পারো ভাই। হোটেল বয় জল আনল, ঘোলা। যা হয় হবে। সে আর পারছে না। এ-সময় দেখল উঠোনে একটা বড়ো মোষ চড়াচ্ছে, ছর ছর করে শব্দ। কোনোরকম রাতটা কাটিয়ে শেষ, পর্যন্ত জীবন নিয়ে বিপ্ৰটিকুরী রওনা হতে পারলে হয়। ভাগীরথী তোর কী যে এত দরকার পড়ল বুঝি না। থেকে গেলি। মতিলালের মাসির সঙ্গে ফিরে গেলে তোর মেসোর এই ভোগান্তি হয় না। রাতে সেই মোটা চালের ভাত। কাঁকর মেশানো। দাঁত আস্ত থাকছে না। আসলে জয়ন্ত বুঝতে পারছে, বিশ-বাইশ বছর আগের জয়ন্ত আর সে নেই। নিশ্চিন্ত চাকরি, স্ত্রীর চাকরি, বাড়িঘর বানিয়ে হালফ্যাসানের মানুষ সে। পূজার ছুটিতে বের হলে বার্থ রিজার্ভ করা ট্যুরিস্ট লজ বুক করা অথবা কোনো বনে-জঙ্গলে ঢুকে গেলে সঙ্গে ফরেস্ট অফিসারের গাড়ি। টিফিন, জল সব সঙ্গে। রাগ করে সে কিছুই সঙ্গে নেয়নি। যাবে কী করে জানে না, কোথায় যাচ্ছে জানে না, সবই যখন অনিশ্চিত, তখন আর টিফিন কতটা নিশ্চয়তা দেবে!
হোটেলওয়ালাকে সে বলল, দেখুন পাঁচটায় বাস-আপনার জানাশোনা কোনো রিকশা আছে, আগে বলে রাখলে বাস ঠিক ধরিয়ে দেবে? টাকার জন্য ভাববেন না।
—এই গোদা! শোন বাবু কী বলছে! গোদা হাজির।
-বাবু পাঁচটার বাস ধরবে। ধরিয়ে দিবি। পারবি কি? গোদা ঘাড় কাত করে চলে গেল। আর চারটেয় উঠে হাতমুখ ধুয়ে ব্যাগ কাঁধে নিয়ে বের হতেই দেখি করিভোরে গোদা বসে আছে। কোলাপসিবল গেট খুলে রিকশা বের করে বলল, কোথায় যাওয়া হবে বাবুর?
এইরে! কোথায় যাওয়া হবে। সে বলল, বিপ্রটিকুরীর বাস ধরব পাঁচটায়।
–রাত থাকতে বাস ছাড়ে! কার বাস?
ফেব্রুয়ারির মাঝামাঝি সময়ে ভোর পাঁচটায় কতটা অন্ধকার থাকে তার জানা নেই। তবু পাঁচটার বাস না ধরতে পারলে জীবনেও বোধহয় বিপ্রটিকুরী বাস সে আর ধরতে পারবে না। ভয়, কৌতূহল এবং অস্বস্তি নিয়ে সে রিকশায় উঠে বসল। গোদা ঠিকই বলেছে। রাস্তায় একটা লোক নেই। কুকুর বাদে কিছু দেখা যাচ্ছে না। সে সাড়ে-চারটেয় বের হয়েছে। সে বলল, গোদা ভাই, তুমি জান বিপ্রটিকুরী কোথায়? গোদা মাথা-কান গামছায় ঢেকে নিয়েছে। আর ঠান্ডা হাওয়ায় শুনতেও পাচ্ছে না বোধহয়। সে বলল, এই গোদা কোথায় নিয়ে যাচ্ছ! তার মনে হল গোদা ঠিক পথে যাচ্ছে না। গোদার কি কোনো কু-মতলব আছে। এখনো রাত, অন্ধকার, সব নিঝুম।
ইতস্তত জোনাকির মতো আলো, ঘরবাড়ি কোথাও স্পষ্ট, কোথাও আবছা। গোদা এত নীরব যে সে সওয়ারি নিয়ে যাচ্ছে, না মরা কুকুর নিয়ে যাচ্ছে বোঝা যাচ্ছে না। জয়ন্ত কেমন ভয় পেয়ে চিৎকার করে ডাকল, এই গোদা কোথায় ছুটলি বাবা!
-এই যে এসে গেছেন বাবু।
সত্যি সে এসে গেছে। কাল সাঁঝবেলাতে কী ভিড়, মানুষজন খুরিতে চা খাচ্ছে। এখন একেবারে ফাঁকা। লম্বা বেঞ্চগুলি আর ভেঁড়া ত্রিপল ছাড়া কিছু নেই, মাথার উপর গাছটা অশ্বত্থ হবে, পাখির কলরব, দুটো কুকুর উনুনের ভিতর থেকে হামাগুড়ি দিয়ে বের হয়ে এল। আর কোনো কাক-প্রাণী নেই—গাড়ি নেই, রিকশা নেই, কেমন এক মৃত শহরে দাঁড়িয়ে আছে যেন জয়ন্ত। গোদা বলল, বাস এলেই উঠে পড়বেন। বাস এলেই উঠে পড়তে বললে কেন। গোদা দাঁড়াল না। আসলে সে নিজের মধ্যে আছে তো! অচেনা জায়গায় ভূতুড়ে অন্ধকার তাকে কেমন গ্রাস করছিল। শুধু কুকুর দুটো আছে। ঘড়ি দেখে সে আরো মুষড়ে পড়ল। বের হবার সময় সাড়ে-চারটে দেখেছে, এখন চারটে। এ কিরে বাবা, কাঁটা পেছনে ঘুরছে! ঘড়ি পর্যন্ত বিভ্রাট করছে! না কি চারটেয় বের হয়েছে, মাথা গরম বলে, অনিদ্রা গেছে বলে চোখের ভুল। এইসময় গা-টা তার কাঁটা দিয়ে উঠল।
