সকালে সেদ্ধ ভাত খেয়ে জয়ন্ত বের হয়ে পড়ল। আসলে সে ভীতু স্বভাবের। রওনা হবার সময় মাধু বলল, চাদর নিয়েছ তো! এখানে শীত নেই, গাঁ-জায়গায় শীত লাগতে পারে। বাইরে বের হচ্ছ, সঙ্গে বেশি টাকা রেখো।
জয়ন্ত মুখ ব্যাজার করে রেখেছে! যেন সে নির্বাসনে যাচ্ছে। কে বলবে এই সে এক মানুষ, গাঁয়ে জন্মেছে গাঁয়ে বড়ো হয়েছে। শহরে এসে বাড়িঘর করার পর নিজের গাঁয়ে ছাড়া আর কোথাও যেতে ভালো লাগে না—এমনই স্বভাব তার—আর তারই মধ্যে ফ্যাসাদের মতো বিপ্রটিকুরী হাজির-ঝকমারি আর যাকে বলে! খুব সে মিশুঁকেও নয়। একা একা সারাটা দিন-না, ভাবতে গেলেই মাথা গরম হয়ে যাচ্ছে। তবু যাবে, মরণ হয় সেও ভালো, বুঝবে নিজেদের কাজ নিজেরা করে নিতে না পারলে কী বিপাকে পড়তে হয়। হাতের কাছে জল, গ্যাস, ফ্রিজ এতসব আছে তবু কেউ কুটোগাছটি নাড়বে না। এই ভাগীরথী, বিছানা করেছিস? এই ভাগীরথী জামা-প্যান্ট ভিজিয়ে দে। এই ভাগীরথী জুতো পালিশ করে দে। সবার ফরমাস। আর পারেও মেয়েটা। মুখে রা নেই। চুপচাপ সবাইকার ফাইফরমাস খেটে দুপুরের খাওয়া হলে ওর বিশ্রাম। তখন সে বাথরুমে অনেকক্ষণ ধরে চান করবে, অনেকক্ষণ ধরে রান্নাঘরে বসে খাবে—তারপর ছাদে উঠে রোদে চুল শুকোবে। চুলও বটে, কালো আর ততোধিক ঘন। খোঁপা বাঁধলে বিশাল। অবসর সময়টায় সারাক্ষণ চুলের যত্ন। চুলই তার গর্ব। যা দেখবার মতো চুল—এই অহংকার ভাগীরথী করতেই পারে।
মাঝে মাঝে জয়ন্ত ভাবে, এই ভাগীরথী তাহলে সংসারটা ধরে রেখেছে। পাঁচ বছরে দুবার গেছে, দুবারই মতিলালের মাসির সঙ্গে ফিরে এসেছে। এবারেও বলেছিল, চলে আসবে। এল না বলে দুশ্চিন্তা—তা বিয়ে-টিয়ে দিলে খবর দিতে বলা হয়েছিল। খবর এসেছে, আমাকে নিয়ে যান।
জয়ন্ত একবার ভেবেছিল টাকা মানিঅর্ডার করে দেবে। ওর বাবা যেন দিয়ে যায়। কিন্তু মাধুর এক কথা—না, অভাবী মানুষ, টাকা পাঠালেই খরচ করে ফেলবে। তাছাড়া ওর বাবা গাঁয়ের বাইরে যেতে চায় না। কলকাতায় এলে হারিয়ে যাবে, আর তার ফেরা হবে না, এমনও নাকি আতঙ্ক আছে। ভাগীরথীর অসুখের সময় এটা জয়ন্ত আরো বেশি বুঝেছে। শত হলেও পরের মেয়ে—সে জানিয়েছিল, ভাগীরথী হাসপাতালে। এপেনডিসাইটিস অপারেশন। তবু কেউ আসেনি। খবর নেয়নি। এই পরের মেয়ে এমন যে সে নিজের পুরো নামটাও বলতে পারে না। বলবে—আমার নাম ভাগু।
ভাগু কী?
ভাগু কী এই কথায় ভাগীরথী চেয়ে থাকে। তার বাবার ঠিকানা মাধুর কাছে আছে। মাধুই মাসে মাসে ওর বাবার নামে টাকা পাঠিয়ে দেয়। বাবার নাম মোহন দাস। সুতরাং ভাগু দাসী। ভাগু যে আসলে ভাগীরথী বিপ্রটিকুরী না গেলে জয়ন্ত জানতেই পারত না। সেই ভাগু গ্যাসে রান্না করে। মাধু তাকে হাতে ধরে সব শিখিয়েছে। রান্না, ঘরমোছা থেকে সব। কাপড় কাচাও। ভাগু মোটামুটি সব কাজ একাই সামলাতে পারে। অথচ ভাগু কিছু চাইতে জানে না।
জয়ন্ত হাওড়ায় এসে শুনল, শান্তিনিকেতন এক্সপ্রেস যাবে না। বুধবার শান্তিনিকেতন এক্সপ্রেস ছাড়ে না। কেমন মাথা গরম হয়ে গেল। অফিস ছুটি করে বের হয়ে পড়েছে। বোলপুরে আর কোন ট্রেনে যাওয়া যায়। সে খোঁজ নিতে, থাকল। বাইরে বের হলে সে টের পায়, সেও আর এক ভাগু। এত লোকজন, এত কাউন্টার, এত গাড়ি যে, কোনটায় উঠে শেষে কোথায় গিয়ে উঠবে ভাবতেই কেমন আতঙ্কে পড়ে গেল। সে একজন চেকারকে সামনে পেয়ে খুবই বিনয়ের সঙ্গে বলল, স্যার একটা অ্যাডভাইস চাইছি।
জয়ন্ত মধ্যবয়সী মানুষ, এবং অভিজাত চেহারা। অ্যাডভাইস চাইছে! চেকার ভদ্রলোকও গলে গেল।বলুন।
–বোলপুর যাব। শান্তিনিকেতন এক্সপ্রেস ছাড়ছে না—কোন ট্রেনে গেলে সুবিধা হবে।
–দানাপুর এক্সপ্রেসে যেতে পারেন।
–কটায় ছাড়বে।
–এগারোটা ত্রিশে।
মাথায় বাজ। সে বলল, কতক্ষণ লাগবে?
–ঘণ্টা তিনেক।
তাহলে আজ আর ফেরা যাবে না। আসলে সে যতক্ষণ ফিরে আসতে না পারছে, ততক্ষণ ভূতের মতো ফেরার আতঙ্কটা মাথায় চেপে বসে থাকবে। অজানা অচেনা জায়গায় থাকারও বিড়ম্বনা। নিজের ঘর-বাথরুম ছাড়া সে কিছু বোঝে না। বাইরে বের হলে এই অস্বস্তিগুলি আছে। এত রাগ হচ্ছিল মাধুর উপর যে সে আর কোনো কথা বলতে পারছে না।
মাধুর জন্যই ভাগু মাঝে মাঝে বাড়ি যাবার তাড়া বোধ করে। বোকা বলে অপমান বুঝবে না কেন!-তোকে দিয়ে হবে না। এখন কেন ছুটতে হচ্ছে! ভাগুকে বোকা অচল বললে রাগ করে যখন, বলতে যাও কেন! সে বলল, এর আগে কোনো ট্রেন নেই? আমি আজই ফিরতে চাই।
চেকার ভদ্রলোক বললেন, তুফানে চলে যান। বর্ধমান নেমে কোনো লোকাল পেয়ে যেতে পারেন। এক্ষুনি ছাড়বে।
যেন কিছুটা অস্বস্তি কেটে গেল। গাড়িতে উঠে দেখে তিলমাত্র জায়গা নেই। ইস দুঘণ্টা এইভাবে ভিড়ের মধ্যে দাঁড়িয়ে থাকতে হবে! কত ধানে কত চাল। এ-সময় সে যেন নিজেকে কষ্ট দিয়ে বাড়ির উপর প্রতিশোধ নিচ্ছে। ভাবছে ফিরে গিয়ে এক চোট নেবে।
ট্রেন ছেড়ে দিল। একটুও হাওয়া ঢুকছে না। সে হাঁসফাঁস করছে। বিপ্রটিকুরী যাত্রা এমন একটা মারাত্মক বিষয় আগে যদি জানত! দুর্ভাগ্য কাকে বলে।
বর্ধমানে নেমে শুনল, না কোনো লোকাল নেই। সেই দানাপুর এক্সপ্রেসের জন্যই বসে থাকতে হবে।
প্রচণ্ড খিদে পেয়েছে। রাস্তার জলটল সে খায় না। জন্ডিস থেকে উঠেছে বছরও পার হয়নি। রেলের ক্যান্টিনে খেয়ে নিলে হয়। আর খাওয়া জুটবে কিনা তাও জানে না। একা কোথাও বের হলেই সে বড়ো অসহায় বোধ করে। সে কী করবে ভেবে পাচ্ছে না। তবু রেলব্রিজ পার হয়ে ক্যান্টিনে খেতে গিয়ে বুঝল, এত মোটা চালের ভাত তার সহ্য হবে না। এত বিশ্রী রান্না যে সে কোনোরকমে ছড়িয়ে ছিটিয়ে কিছুটা খেল, বাকিটা সে ফেলে রাখল। জোড়া ডিমের ঝোল। বোঁদা লাউয়ের ঘন্ট। নেড়েচেড়ে উঠে পড়ল। জীবনে একটা সময় সব সহ্য হত, আর এক জীবনে সবই অসহ্য। মানুষের শরীরে যে এত বিশ্রী গন্ধ থাকে ভিড়ের ট্রেনে সে টের পেয়েছে। গাঁয়ের মানুষজন, গরিব, জনমজুর—সব যেন কাক-চিল হয়ে চারপাশে উড়ছে। দানাপুর এক্সপ্রেস কখন আসবে!
