আমি যে কী করি।
অশ্বখুরের শব্দ আরও শব্দময় হচ্ছে। আবার কখনো ভূতেরা লড়ালড়ি করলে কট কট শব্দ হয় কঙ্কালের হাড়গোড় ঠোকাঠুকি হলে যা হয়।
আর তখনই দেবী আবিভূতা।
তিনি লাফ দিয়ে নামলেন। তারপর প্রান্তরে দাঁড়িয়ে ডাকলেন, কোথায় তারা। জ্যোৎস্নায় কিছুই স্পষ্ট নয়।
বললাম, রেবাদী কী তুমি?
তোরা কোথায়?
এইত এখানে। খাদের মধ্যে চিৎপাত হয়ে পড়ে আছে। সাধক মানুষ, তার এক কথা, হে মা কালী, হে মা জননী, মানুষের কল্যাণ করো রেবাকে সুখ্যাতি দাও। রেবাদি এসে কী করে বসবে কে জানে।
বিশাল প্রান্তরে রেবাদি তার আলখেল্লার মতো আবরণটি খুলে দেখার আগে বলল, এই তুই যা তোদ্যাখ কোনো লোকজন ছুটে আসছে কি না। এসে বলবি সাধক মোহনচাঁদের নিষেধ আছে, আর এগুবেন না।
আবরণটি খুলে একেবারে দাদার সামনে গিয়ে দাঁড়াল রেবাদি। কারণ দাদা যে কোনো সময় ছুটে পালাতে পারে। রেবাদিকে বাঘের মতো ভয় পায়। কাপুরুষ কোথাকর। আমাদের দেশ বলেই সাধক, মহাপ্রভু সাজার তোমায় সুযোগ মিলেছে বোঝ? কোথায় আমার শরীর অপবিত্র, কোন জায়গায় বলো! মানুষ কখনো অপবিত্র হয়। অগ্রহণীয় হয়। এস—ঘোড়ার পিঠে বেঁধে ছেড়ে দেওয়া যেত—কিন্তু অজুটা যে একা পড়ে যাবে। আর কোনো পাগলামি নয়। আর যদি ভর ওঠে, মা কাত্যায়নী বলে হুংকার দাও সত্যি আমি মুকুলবাবুর ছোটোপুত্রকে বিয়ে করে কলকাতায় চলে যাব। অনেক সহ্য করেছি।
দাদা সেই থেকে ভালো হয়ে গেলেন। তার ঠাকুর-ঠুকুর, মা-কালী কাত্যায়নীর পাগলামিও সেরে গেল। মানুষের শরীর কখনো অপবিত্র হয় না। রেবাদিই দাদাকে জ্যোৎস্না রাতে শরীর দেখিয়ে বুঝিয়ে দিল।
বিপ্রটিকুরী যাত্রা
বিপ্রটিকুরী যাত্রা নিয়ে বাড়ি গরম—সকাল থেকেই কথা বললেই জয়ন্ত চটে যাচ্ছে। বিরক্ত।
আরে বিপ্ৰটিকুরী কোথায়, কোন স্টেশনে নামতে হবে, সেখান থেকে কোন বাস ধরতে হবে সেসবের বিন্দুবিসর্গ জানা নেই! এরা কী ভাবে! তুই গেছিস, তোর বাবাকে বল দিয়ে যেতে। না, আমায় তিনি যেতে লিখেছেন। মেলোমশাই আমাকে নিয়ে যান। আমি কি বসে আছি। বাড়ির লোকজনও হয়েছে তেমনি! মাসিমা ফোন করেছে ভাগীরথীকে নিয়ে আসতে। মাসিমার সঙ্গে যাবে, আবার চলে আসবে। চলে আসবে যখন আসবে। আমি যেতে পারব না। আমার কি বাড়িতে দাসখত দেওয়া আছে!
ভিতর থেকে জবাব আসছে, মাথা গরম করছ কেন বুঝি না। অফিস থেকে উপরতলার মাসিমাকে ফোন কর না? ফোন করলেই জানতে পারবে। বলে দেবে সব।
–ফোন করেছি। মাসিমা নেই। কবে আসবেন তাও বলেননি। মেয়ে না কার বাড়ি গেছেন। না আমি বুঝি না, তুই গেলি মাসিমার সঙ্গে, চলে এলি না কেন! কোথায় বিপ্ৰটিকুরী সেখানে যেতে হবে। বাড়ি অচল—বোঝ! বাড়ি থাকলে তো তুই ভাগীরথী এটা করলি না, ওটা করলি না, না তোকে দিয়ে হবে না! হবে না, হবে না করেও তো পাঁচ বছর কাটিয়ে দিলে। দু-এক হপ্তার জন্য গেলে মাথা গরম। এত করে বলি—পেছনে লেগ না, গেলে আর আসবে না। নাও ছোটো বিপ্রটিকুরী।
–ও তো আসতেই চাইছে। ওকে না নিয়ে এলে আসবে কী করে! তোমার কথাবার্তা শুনে তো মনে হয় বিপ্রটিকুরী এ গ্রহের নয়। অন্য কোনো গ্রহে। বাড়ি অফিস করলে এই হয়। কোথাও যাবার কথা হলেই মাথায় বাজ পড়ে। মাসিমা তো একবার বলেছিল, বিপ্রটিকুরী যেতে হলে বোলপুরে নামতে হয়। সেখান থেকে বাসে। বোলপুর গেলেই খবর পেয়ে যাবে।
জয়ন্ত অফিস বের হবার মুখে জুতোর ফিতে বাঁধছিল। সে রা করছে না। সত্যি একটা আতঙ্ক সৃষ্টি হয়েছে তার মধ্যে বিপ্রটিকুরীর নামে। বাড়িতে আর কেউ নেই যে যাবে। বড়োছেলে চাকরি নিয়ে বাইরে। ছোটোমেয়ের পরীক্ষা—যেন পরীক্ষা না থাকলে মাধুই যেত ভাগীরথীকে আনতে। তুমি পুরুষমানুষ পার না, দেখ আমি মেয়ে হয়ে পারি কি না।
জয়ন্ত ভেবে দেখল, অশান্তি করে আর লাভ নেই। সময়ে চা, সময়ে জলখাবার, চানের গরম জল। পাঁচ-সাত বছর থেকে ভাগীরথী সংসারে কার কী দরকার সব এত জানে যে রাগ করে ছেড়ে দিলেই আর এক ফাঁপরে। ভাগীরথী মতিলালের মাসির সঙ্গে ফিরে না আসায় ধরেই নিয়েছিল ওর বাবা বিয়ের ব্যবস্থা করছে। মেয়েটি বড়ো ঠান্ডা মেজাজের। কথা কম বলে, এত কালো যে অন্ধকারে দাঁড়িয়ে থাকলেও তাকে দেখা যায়। কালোর মধ্যে আরও গভীর কালো ছাপ মানুষের।
আর এও আশ্চর্য ভাগীরথী অন্ধকার বড়ো ভালোবাসে। অন্ধকারে চুপচাপ বসে থাকারও একটা নেশা আছে। কিছু চাইতে জানে না। বাড়ি থেকে তার চিঠি এলে পড়ে শোনানো হয়, ওতে সে খুশি না অখুশি ঠিক বোঝা যায় না। একটাই দোষ, বেশি খায়। পাঁচ-সাত বছর শহরে থেকেও বেশি খাওয়ার অভ্যাস পালটাতে পারেনি। বিশ-বাইশ দিনে টের পেয়ে গেছে ভাগীরথী না থাকলে সবাই বিশ বাঁও জলে। জয়ন্ত নিজেও। আজই সে অফিসে জেনে নেবে বোলপুর কোন ট্রেনে গেলে সবিধা। কতক্ষণ লাগে। ফিরে আসা যাবে কি না, না বোলপরে হল্ট করতে হবে। কোথাও না বের হয়ে কখন কোথাকার কোন ট্রেন ছাড়ে কিছুই জানে না। অফিসে এসে সে জানল, শান্তিনিকেতন এক্সপ্রেসেই সুবিধা। ন-টা চল্লিশে ট্রেন। বারোটার মধ্যে পৌঁছে গেল, ঘণ্টাখানেক বাসে—এই আড়াইটে ধরে নেওয়া যাক, বোলপুরে ফিরতে চারটে। পাঁচটা সাড়ে-পাঁচটায় ট্রেনে, না হয় বাসে বর্ধমানে–তারপর কলকাতা। কলকাতা মানেই নিশ্চিন্তি। শেষে পৌঁছে যাওয়া।
