হয়ে গেল।
কী হয়ে গেল!
বড়দা পুকুরে আবার নেমে গেছে।
ছোটঠাকুমা এবং বাড়ির কাজের লোকের সবারই ব্যস্ততা বেড়ে যেত। সারাবাড়ি গোবরজল ছিটিয়ে বাড়িটিকে দেবী আগমনের জন্য প্রস্তুত রাখা হত। বারান্দায় উঠোনে হ্যাজাকের আলো জ্বলত। গাঁয়ের লোকজন ভিড় করত এবং ক্রমে দাদার ওপর দেবী ভর হওয়ার বিষয়টি গ্রাম থেকে গ্রামান্তরে রটে যেতে থাকল। মানুষজন এমনিতেই ঈশ্বরবিশ্বাসী—তার ওপর জ্যান্তঠাকুরমা কাত্যায়নী অঞ্চলের কাত্যায়নীর থান খ্যাত দেবী। স্বেচ্ছায় পুণ্যবান ছোটোঠাকুরদার বাড়িতে তাঁর আবির্ভাব হতেই পারে।
আমার অবশ্য কাজ বেড়ে গেল। ভর না ছাই, আসলে ভারাক্তি। দাদার জন্য আমারও লেখাপড়া লাটে ওঠার অবস্থা।
এই অজু বাজারে যা।
এই অজু মোহন আজ খিচুড়ি খাবে বলেছে। পায়েস খাবে বলেছে, খেজুরের গুড় আনবি, বেগুন আনবি—শিংনাথ বেগুন।
কোনোদিন আবার পড়তে বসলেই ছোটোঠাকুরদা ডেকে পাঠাত, শোন মোহন বলেছে আজ কাচকি মাছের ঝোল দিয়ে ভাত খাবে। তার ওপরে আর এক মুশকিল, রোজ রেবাদিকে দাদার খবর দিতে হয়।
আজও স্কুলে যাবে না বলছে তার দাদা?
বলল ত।
কী মনে হয়, ভর উঠবে।
তেমন লক্ষণ দেখছি না।
স্কুলে যাবে না, বাড়ি বসে কী করবে?
ঠাকুর ঘরে বসে গীতাপাঠ করবে।
এই অজু কোথায় যাচ্ছিস!
বেলপাতার ডাল।
খুব জ্বালাচ্ছে তোর দাদা।
কী করি বলো রেবাদি। জানো তো আমার ওপর খুব খাপ্পা।
তোদের বাড়িটা দেখছি চিড়িয়াখানা হয়ে গেলরে। তোদের নিয়ে এল, বারদি স্কুলে ভরতি হলি, তোর দাদা টেস্টে অ্যালউ হল না, তুই হলি, খেপে তো যাবেই!
না রেবাদি সেজন্য নয়।
তবে কী জন্য।
কাল তো তুমি যাওনি। কত লোক বাড়িতে। কত দূর দূর জায়গা থেকে লোক হাজির। অপুত্রকের পুত্র চাই, কন্যের ভালো ঘরে বিয়ে চাই, পুত্রের সামনে কোনো যদি অমঙ্গল থাকে, তার বিধান চাই। মা-কাত্যায়নীর সব বিধান নাকি ফলে যাচ্ছে। কী করে হয়? দোষের মধ্যে বলেছিলাম, মা কালীর গোঁফ থাকে নাকি।
গোঁফ।
হ্যাঁ গোঁফ। সেই গোঁফটি কিছুতেই ছাটবে না। আমি কত করে বললাম, দ্যাখ বড়দা গরদের শাড়ি পরে মেয়েমানুষের মতো বসে থাকিস, ফুল বেলপাতার পাহাড় জমে যায়, সব ভালো, তবে তোর মুখে আয় গোঁফ মানায় না। মা কালীর কি গোঁফ থাকে। মা কালীর মুণ্ডমালা থাকে। তুই কী রে বড়দা। রেবা হাসল।
রেবাদি তুমি হাসছ কেন?
হাসব না, কবে যেন একদিন গোঁফের প্রশংসা করেছিলাম। সেই থেকে গোঁফের ওপর খুব নজর। গোঁফ ছেটে ফেললে আমি কি তোর দাদাকে আস্ত রাখব।
ও তোমার ভয়ে।
তবে কী!
তুমি রেবাদি বলতে পার না, অনেক তো হয়েছে, টেস্টে এলাউ হতে পারল না, ভর ওঠলে সূর্যমাস্টারও শুনেছি হাজির হয়। কড়জোড়ে দরজার সামনে বসে থাকে।–কখন মা জননী হাতে হাতে প্রসাদ দেবে, আচ্ছা সন্দেশের ঠোঙাটি কে সাপ্লাই করে বল তো। সূর্যমাস্টার ইচ্ছে করলেই এলাউ করে দিতে পারে, দিল না কেন, ভর উঠলে কাত্যায়নী, ভর না উঠলে মোহন মজুমদার। জানিস তোর দাদা হাড়ে বজ্জাত। আমার ওপর প্রতিশোধ নিচ্ছে, আমি অগ্রহণীয়। সব বের করব।
জানো রেবাদি, সারাক্ষণ পাহারা দিতে হয় এখন।
পাহারা। রেবা ঘাটলায় বসে পা নাচাচ্ছিল।–পাহারা কেন?
কোথায় কোনদিকে ছুটবে, কোথায় গিয়ে হুমড়ি খেয়ে পড়বে—আর মা মা বলে চেঁচাবে। দু-হাত বাড়িয়ে মা কাত্যায়নীকে খুঁজবে। কোথায় গেলে মা তুমি। আমার আর ভাল্লাগছে না রেবাদি। সামনে পরীক্ষা।
সেই।
আজও সাঁজবেলায় পুকুরে নামবে মনে হয়। আজ তো শনিবার। সামিয়ানা টাঙানো হয়েছে। এবং এভাবে রটে যায়, শনিবার শনিবার ভর ওঠে। দাদা পূজার ঘরে চুপচাপ শুয়ে আছেন। সারাদিন কিছু খাননি। উপবাস। এইসবই ভর ওঠার সংকেত।
কিন্তু দাদা মস্তবড়ো চাঁদের দিকে তাকিয়ে পুকুরপাড়ে বসে থাকলেন। পরনে সেই গরদের শাড়ি—লোকজনের ভিড় বাড়ছে। দাদা কেমন বাহ্যজ্ঞান শূন্য, তারপর ধীরে ধীরে জলে নেমে চেঁচালেন, মা মা, মা-কালী করালবদনা তারপর পুকুরে নেমে ডুব। আজ কি হাজারবার ডুব দেবেন, আমার কাজ পাহারা দেওয়া। একটা হ্যারিকেন হাতে পাড়ে দাঁড়িয়ে আছি। কারণ দিন দিন উপসর্গ বাড়ছে।
জলে নামার আগে বললাম, বড়দা, রেবাদি আসবে বলেছে। তোমার ভর ওঠা দেখবে।
আর যায় কোথায়। এবারে গাবগাছেও সানাবে না—বড়দা ছুটছে। কোথায় ছুটছে জানি না। লোকজনও ছুটছে পেছনে। মা-কালীর ভর না তুলে কোথায় যাচ্ছেন, আপনার আসার ইচ্ছা পূর্ণ হোক মা। দৌড়াতে গিয়ে আমার হ্যারিক্যান নিভে গেল—মাঠ পার হয়ে এক দূরবর্তী কবরখানায় পাশে চলে এসেছি। এবং দাদার যা হয়, শত হলেও সাধক মানুষ আমার দাদা, গাছপালায় জলে, গাছপালায় ফলে যাকিছ ধরেন সবই মহাকালীর অংশ। জ্যোৎস্নায় আলো অন্ধকারে শুনতে পেলাম, অশ্বখুরের শব্দ। এবং তিনি সকলকেই অর্থাৎ যারা পুণ্যার্থী ভিড় করেছিল অজুদের বাড়িতে জ্যান্ত দেবীর আশায়, তাঁদের কাছে এক বার্তা পৌঁছে দেওয়া হয়েছে—কেউ জায়গা ছেড়ে নড়বেন না, নড়লেই মা-কালীর কোপে পড়ে যাবেন!
কবরখানার পাশে বিশাল এক প্রান্তরে বসে আছি—একটা ঝিল সামনে, জোনাকি জ্বলছে, নানারকমের জলজ ঘাসের সোঁদা গন্ধ। আতঙ্কে আমি কাহিল, এটা তো একটা পরিচিত ভূতুড়ে জায়গা। ভূতেরা এখানে খুশি হলে লাফাতে পারে, ঘাড় মটকে দিতে পারে আর বড়দা বেঁহুশ হয়ে মাটিতে পড়ে আছে।
