আমি কাগজের দোয়াত দিয়ে বললাম, চিঠি আছে দাদার। চিঠিতে কী লেখা আছে জানি—দাদা লিখেছেন, তুমি তোমার এই দ্বিচারিতার জন্য সারাজীবন ভুগবে। তোমার সন্তানসন্ততি হলে পাপবোধে ভুগবে। রেবাদি আর আমি সেই অরণ্যের ভিতর দিয়ে হাঁটছি। চিঠিটা ছিঁড়ে হাওয়ায় উড়িয়ে দিলে সব কেমন প্রজাপতি হয়ে উড়ে গেল। কী সুন্দর নারে? আয় তোকেও একটা চুমু খাই। কথা নেই বার্তা নেই খটাস করে চুমু খেয়ে বসল। তারপর বলল, তোর দাদাকে বলিস, দাদু আমার পাত্র দেখছে। ওরা জমিদার, মুকুলবাবুর ছোটো পুত্র। ওদের কলকাতায় বাড়ি আছে।
কবিরাজ দাদা তোমার বিয়ে দিয়ে দেবে?
দেবে না? আমি বড়ো হয়েছি না। বছর বছর যে ফেল করে, তার আবার দ্বিচারিতা। এত সংস্কৃত ঘেষা বাংলা সে পায় কোথায়! আমি দ্বিচারিণী হই হব। তোর দাদার শিক্ষা হওয়ার দরকার। তারপর আর কথাবার্তা নেই। কেমন গুম মেরে গেল রেবাদি। তারপর জঙ্গলের গভীরে ঢুকে যেতে থাকলে আমার কেমন ভয় হল, রেবাদি কোথায় যাচ্ছ? তোর দাদাকে খুঁজতে। বলেই একেবারে সায়া শাড়ি খুলে উদোম হয়ে গেল এবং আমার চোখ বিস্ফারিত।
আমি দ্বিচারিণী, এই কথাগুলো বারবারই বলছে। দ্যাখ আমার কী আছে অজু, আমার এমন সুসময়, আর কিনা বলে আমার পাপ, এবং ক্ষেপে যাওয়ার তার মান-ইজ্জতেরও বোধ ছিল না। সে উড়তে থাকল যেন। জ্যোৎস্না রাতে মল্লিকা বনে এক নারীর অপার সৌন্দর্যে আমি মুগ্ধ হয়ে গেলাম।
কখন যে দেখলাম ঘাটলায় রেবাদি বসে আছে নতমুখে। কাছে যেতেই বলল, কী রে তুই আমাকে খারাপ ভাবিসনি ত!
না না, খারাপ ভাবব কেন রেবাদি।
আমার মাথায় যে কী হয়। শরীরে যে কী হয়! তোরা পুরুষমানুষ ঠিক বুঝবি না। দাদুর কত সাধ, এমন সুপুরুষ তুই কোথায় পাবি রেবা। একেবারে বাপের চেহারা পেয়েছে মোহন। মোহনের বাবা মহেন্দ্র ঠিক এরকমই ছিল দেখতে। তারপরই আবার খেপে গেল রেবাদি। ওঠ ওঠ। যা বাড়ি যা। শরীরের আমার আগুন জ্বলছে। কখন কী করে বসি। তুইও আর ছোটো নস অজু। তোর তো ক্লাশ নাইন হল আর তোর অকৃত্রিম দাদা নির্লজ্জ বেহায়ার মতো নাইন থেকে টেনে উঠে আমার মাথা কিনে নিতে চাইছে।
রেবাদির বিয়ের কথা হচ্ছে শুনেই বড়দা কেমন মনমরা হয়ে গেল। কোনো চিঠি দিয়েছে কি না জানতে চাইল। আসলে বিভূতি কবিরাজের নাতনি দাদুর আদরে একটু বেশিই স্বাধীনতা ভোগ করে। একদিন সকালে তাকে অশ্বপৃষ্ঠেও দেখা গেল। সে আমাদের বাড়ির দিকেই আসছে। দাদা পালিয়ে গাব গাছে উঠে বসে থাকল।
মেয়েটার যে মাথার ঠিক নেই, অতি আদরে বাঁদর হয়ে গেছে বুঝতেই পারে না, এ-বয়সে এ-সব সাজে না। তবে শত হলেও বিভূতি কবিরাজের একমাত্র নাতনি, তার পক্ষে সবই শোভা পায়। শহরে থাকলে নারী-স্বাধীনতারও সুযোগ অনেক বেশি। কাজেই রেবাদির পক্ষে সবই মানিয়ে যায়। আর বড়দা গাবগাছ থেকে নেমে কাগজ ভাঁজ করে একটা নৌকা বানিয়ে ফেলল। তার ভিতর সাধের চিরকুট লিখল–বিবাহ মানুষের অতি পবিত্র কর্তব্য। বিবাহের আগে কোনো শারীরিক সংসর্গ আমাদের ধর্মে পাপ বলে চিহ্নিত হয়। তুমি আসলে সোজা বাংলায় এঁটো পাতা। তোমার কলকাতার পাত্রটির নিতান্ত দুর্ভাগ্য। তুমি যে উচ্ছিষ্ট। তিনি নিশ্চয়ই জানেন না তুমি অগ্রহণীয়।
খামে নয়, কারণ খাম হাতে থাকলেই পরিবারের কারও সংশয় হতে পারে, হাতে কার চিঠিরে! সুতরাং খেলার ছলে, কখনো দোয়াত, কখনো নৌকা, মাঝে মাঝে কাগজের তৈরি অ্যারোপ্লেনের ভূগর্ভে সেই অমূল্য চিঠি গোপনে বড়দা আমাকে দিয়ে পাচার করাত।
তারপর দু-বাড়িতেই থমথমে ভাব। রেবাদি বলেছে, এর শেষ দেখে আমি ছাড়ব অজু। শহরে যাচ্ছি না। কারণ একটাই রেবাদিকে চিঠি না দিয়ে বড়দা অর্থাৎ ঠাকুর ভাই কেমন নিস্তেজ, আহারে রুচি নেই, এবং এক সকালে দেখা গেল পুকুরে নেমে ডুবের পর ডুব দিচ্ছে। পাড়ে আমাকে দাঁড় করিয়ে রেখেছে। ডুব গোনার জন্য। একশো হয়ে গেছে—একবার চেঁচিয়ে বলাম একশো হয়ে গেছে, উঠে আসুন। কেবল বললেন, তুই গুনে যা। বাধাবিঘ্ন আমি পছন্দ করি না। সে জানে না আমি কে?
এবং লোকজন জড়ো হয়। দাদা নিরন্তর ডুব দিতে দিতে কখন কাহিল হয়ে গেছে। লোকজন ছুটে আসছে। ছোটো দাদু পড়ে গেছেন বিপাকে। জল থেকে তুলে আনার পর কিছুটা অজ্ঞান অবস্থা। সে অবস্থায়ই মা-কালী ক্যত্যায়নী, দাদার ওপর ভর করেছেন।
ও বিভূতি, সর্বনাশ।
আমি জানি দাদা। আমারও কী নিস্তার আছে। নাতনি সারারাত চন্দন কাঠের অরণ্যে ঘুরে বেড়িয়েছেন অনেকেই দেখেছে। বলে দেবদেবীর আবির্ভাব হয়—তাই রক্ষা। উলঙ্গ দেবী প্রত্যক্ষ করে মা মা বলে কেঁদেছে। প্রার্থনা করেছে। ওর মাসি মামিরা ওকে শেষে চাদর ছুঁড়ে দিয়ে চ্যাংদোলা করে তুলে এনেছে। ঘোটদাদু একটি বড় রকমের দীর্ঘশ্বাস নিয়ে বললেন, তোর নাতনির শরীর গরম হয়ে গেছে রে বিভূতি।
এমনই চলছিল সব। বড়দা আজকাল খুব সকালে ওঠেন। প্রাতঃস্নান করেন। এবং মাঝে মাঝে শনিবার মঙ্গলবারে তাঁর ভর ওঠে। বাড়ির সবাই, অর্থাৎ দুই পিসি, ছোটোঠাকুমা থেকে ছোটো ঠুকরদা সবারই ত্রাহি মধুসূদন অবস্থা। ঠাকুর দেবতা নিয়ে ছেলেখেলা করা যায় না। ঘরদোর পবিত্র রাখতেই হয়। বাড়িটা সবসময় উৎসবের মেজাজে থাকে।
বড়দা অর্থাৎ মোহন সাঁজবেলায় পুকুরে নেমে গেলেই আমার অন্তরাত্মায় কাঁপুনি ধরে যেত।
