বড়দা সহসা উঠে দাঁড়াল। বলল, এই অজু চল। আমরা বরং দাদুর পাশে গিয়ে বসি। তারপর রেবার দিকে তাকিয়ে বলল অত হাসার কী হল! এত দস্যুবৃত্তি ভালো না।
রেবাদি বড়দার হাত ধরে বলল, ঠিক আছে হাসব না তুমি যে এত ভিতু জানব কি করে! আমার কী এমন অপরাধ ছিল। আমার যে ইচ্ছা করে। সকালে মেলা থেকে ফেরার দিন তুমিতো কথা বন্ধ করে দিয়েছিলে। আমি কিছুটা হতবাক। বুঝছি না রেবাদি কেন বড়দাকে ভিতু বলছে। সেই তাঁবুবাসের পর তো রেবাদির সঙ্গে আমাদের আর দেখাও হয়নি। যদি কিছু ঘটেও থাকে সেটাতো বছর পাঁচেক আগে বারদির লোকনাথ ব্রহ্মচারীর মেলায়—এতদিন পর সেই স্মৃতির কোনো হাস্যকর ঘটনা কি দাদাকে দেখে রেবাদির মনে পড়ে গেছে। কিংবা রেবাদি কেন যে বলল, আমার পাপটা কি তোমাকে বলতেই হবে। এটা পাপ কাজ, তুই এটা কি করলি রেবা, আমি কি পাপ কাজ করেছি বলতে হবে। আজ না হোক, কোনো একদিন। এবার যাবেটা কোথায়! আমার যে ইচ্ছে করে। তার দাম দেবে না!
তুমি খুব চপল, অসহিষ্ণু রেবা। অজু ছেলেমানুষ। তার সামনে কী আরম্ভ করলে! শোভন অশোভন বুঝবে না। তুমি আর কিন্তু ছোটোটি নেই!
রেবাদি আঁচল দুলিয়ে শিস দিতে দিতে ভিতর বাড়ির দিকে চলে যেতেই আমার কেন যে মনে হল রেবাদি অনেক কিছু জানে, অথচ এটা জানে না মেয়েরা শিস দিলে সংসারের অমঙ্গল হয়। রেবাদি শহরে থাকে। গ্রীষ্মের বন্ধে কিংবা পূজার ছুটিতে আসে। এমনিতেও আসে। এই প্রকৃতির নিরিবিলি গাছপালা, পাখি, আস্তাবলের ঘোড়া, কিংবা দিঘির চারপাশের অরণ্য তাকে টানে। বড়দাকে তাদের বাড়িতে দেখে সে কি কিছুটা বেশি বুদ্ধিমতী সাজার ভান করছে! বাড়িতে ফেরার সময় আমাকে একা পেয়ে বড়দা বলল, তুই কিন্তু ওর সঙ্গে মিশবি না। ভারি পাজি পুচ্ছ পাকা মেয়ে। জেদি। যা কিছু খুশি করতে পারে। আরে যে মেয়ে ঘোড়ায় চড়ে ছুটতে পারে; শহরে থাকিস বলে এত দেমাক ভালো না।
মিশলে কী হবে বড়দা।
তোকে নষ্ট করে দেবে অজু। শহরের মেয়ে ওরা সব জানে। রেবার স্বভাবচরিত্র ভালো না।
কী জানে!
জানি না, যা। কী জানে’, অতশত জানার দরকার নেই। রেবা ডাকলে সাড়া দিবি না।
দাদুর বৈঠকখানা ঘরে আমরা থাকি, একটা চৌকি, দুটো চেয়ার একটা টেবিল, একটা মুলি বাঁশের বেড়া দিয়ে আলাদা পড়ার ঘরের বন্দোবস্ত। বলা ভালো, তখনকার দিনের বাড়িঘর সব টিনের, চৌচালা আটচালা, টিন কাঠের বেড়া, মুলি বাঁশের হেঁচা বেড়াও থাকে—একমাত্র এ-তল্লাটে একটাই পাকাবাড়ি বিভূতি কবিরাজের-তারপর যতদূরেই যাই না, কেবল দারিদ্র্য চোখে পড়ে। শনের চাল পাটকাঠির বেড়া আর বনঝঙ্গল। কোথাও আর পাকাবাড়ি চোখে পড়ে না, সেই বারদির স্কুলে গেলে চৈতন্য নাগ, অমৃত নাগের জমিদারি, পাকাবাড়ি দালানকোঠা সবই দেখা যায়। দালানকোঠা থাকলেই বাড়ির সম্ভম অন্যরকম। কোনো পাকাবাড়ি থাকলেই মনে হত কোনো সম্ভ্রান্ত পরিবার এ-গাঁয়ে থাকে।
বাড়িতে ছোটোদাদু, ঠাকুমা, দুই পিসি, কাজের লোক ইদা আর দুই কাকি। কাকারা কলকাতায়। দুই বাড়ির মেলামেশা একেবারে ঘনিষ্ঠ আত্মীয়ের মতো। রেবার সঙ্গে ছোটোকাকির ইদানীং অর্থাৎ আমরা আসার পর ঘনিষ্ঠতা আরও বেড়েছে। রেবা ফাঁক খুঁজে ঠিক আমাদের ঘরে সবার আড়ালে ঢুকে যাবে, এবং আমার তখন কাজ ঘর থেকে বের হয়ে যাওয়া।
তাদের কথোপকথন এ-রকমের। আড়াল থেকে শোনার চেষ্টা করি, চুমু খেলে দোষ হয়। জড়িয়ে শুলে দোষ হয় মোহনদা?
হয়। দাদার এক কথা।
কী করব বল। আমার যে ইচ্ছে হচ্ছিল, রাতে তাঁবুতে সবাই ঘুমিয়ে আছে। অন্ধকার। নদীর চরে শুধু চুমু খাওয়ায় রাগ করেছ, খারাপ লাগে না। তোমার মান ভাঙাতে পাশে গিয়ে শুয়েছিলাম।
আর কিছু করিসনি।
হ্যাঁ নেড়েচেড়ে দেখছিলাম। কী করব, আমার যে ইচ্ছে করে কিছুতেই ঘুম আসছিল না। একলাফে জায়গাটা থেকে আমার পালাতে ইচ্ছা করলেও কেন যে নড়তে পারলাম না। বাল্যবয়সে পাপবোধ বেশি মাত্রাতেই থাকে।
গুরুজনদের কথা আড়ালে দাঁড়িয়ে শোনাও পাপ।
একদিন রেবাদি ফুঁসেও উঠল।-তুমি কাপুরুষ মোহন। দাদু আমাকে কী বলেছে জানো, কত বড়ো সম্ভান্তবংশের ছেলে মোহন, দুর্ভাগ্য বছর বছর ফেল করে। দীর্ঘকায় পুরুষ, পাল্টিঘর, তোর সঙ্গে মানাবে। চুমু খেলে পাপ হয়। অন্ধকারে শরীর আমার কেমন পাগল হয়ে উঠেছিল, তুমি আমাকে ক্ষমা করতে পার না? তারপর রেবাদি বলেছিল, আমার দাদু তোমার বাবাকে কত বড়ো কৃতী মানুষ ভাবে জানো! বলে—কত বড়ো কৃতী মানুষ। বউঠানের কপাল মন্দ, কপালে সইল না। মাথার দোষ দেখা দিল—কম চিকিৎসা করিনি। আর আরোগ্য লাভ করল না। বড়দা বলেছিল, রেবা তুমি চরিত্রহীনা। সতীসাধ্বী নও। আমি চরিত্রহীনা মোহনদা? রেবাদি ফ্যাঁচ ফ্যাঁচ করে কাঁদতে থাকল। হ্যাঁ হ্যাঁ, চরিত্রহীনা।
আমি জানতাম, ফেরার দিনে কত করে বলেছি চিঠি দিয়ো। শহরের ঠিকানা দিলাম। বান্ধবীর ঠিকানা। চিঠি দিলে না। এতবড়ো সাধুপুরুষকে দিয়ে আমার কী হবে! দাদুকে বলেছি, আর যাই করো, ও কাজটা করো না। বারবার পরীক্ষায় যে ফেল করে, সে আবার মানুষ। পাড়ায় ঘরে ঢুকে দেখি বড়দা কাগজ কেটে ভাঁজ করছে। কিছুক্ষণের মধ্যে কাগজটা একটা দোয়াত হয়ে গেল। বিভূতি পরিবারের বাড়ি এখন আমার অবারিত দ্বার। সবাই আমি গেলে খুশি হয়। রেবাদি ছুটে আসে।
