শত হলেও একমাত্র জীবিত গুরুজন, কী বলবেন সেজোকাকা বুঝতে পারছেন। থতোমত খেয়ে গেছেন।
পুকুরে দেখলাম গুষ্টিসুষ্ঠু পোলাপানের লগে মোহন অজু। অগ স্কুল নাই। জলে নাইমা পুকুরে ডুব সাঁতার চিৎ সাঁতার দিয়া বারবার পাড়ে উঠে যাওয়া কি পড়ার অঙ্গ? চক্ষু লাল কইরা ফ্যালছে। জ্বর জ্বালা হলে কে দেখবে। সেজোকাকা খুবই কাতর গলায় বললেন, আজ্ঞে না। স্কুল নাই। অজুর বাবা হস্টেলের খরচ দিতে পারব না কইছে। মোহন বলছে সে আর পড়বে না। পড়তে তার ভালো লাগে না।
কি করবে কইছে?
তরকারি বিইচা খাইব কইছে।
খাওয়া বাইর করতাইছি।
২.
বারদি গ্রামের নাম শোনেনি এমন মানুষজন হাটেবাজারে পাওয়া কঠিন। কী নাই। বারদি লোকনাথ ব্রহ্মচারীর আশ্রম। ১৯ জ্যৈষ্ঠ মেলা বসে। সাতদিন ধরে হাজার হাজার মানুষ লাবড়া খিচুড়ি পায়েস খায়। পুণ্যার্জনে তীর্থদর্শনে সে এক মহামেলা। এই এলাকার জেলাসমূহের একজন জমিদারও বাদ যায় না। আশ্রমের প্রাঙ্গণে বিশাল মাঠ, সেখানে তাঁবু পড়ে। কাঙাল ভোজন চলে। শক্তি ঔষধালয়ের মথুরাবাবু পর্যন্ত পরিবারসহ সদর থেকে চলে আসেন। বারদির জমিদার চৈতন্য নাগ, অমৃত নাগ—বিশাল বিশাল প্রাসাদের পরে প্রাসাদ-আম জাম জামরুলের বাগান আর ছাগল বামনি নদী, তার কাঠের সাঁকো সর্বোপরি পশ্চিমবঙ্গের মহান বিপ্লবী নেতা জ্যোতি বসুর পৈতৃক ভিটাও আবিষ্কার করা গেছে। আর বারদির হাইস্কুলের খ্যাতির সঙ্গে আমি আর বড়দাও জড়িয়ে গেছি। ছোটো দাদুর সম্মানদির বাড়ি থেকে আমরা তখন বারদির হাইস্কুলে ভরতি হয়ে গেছি।
গাঁয়ের বিভূতি কবিরাজকে ছোটো ঠাকুরদা বললেন, অবশ্য আমাদের নিয়ে গেছিলেন সঙ্গে, বড়ো ফ্যাসাদে পইড়া গেছি বিভূতি—তুই যদি পারস বারদির বিদ্যালয়ে ভরতি কইরা দে। অমৃত নাগারে তুই কইলেই হইব।
আরে বাব্বা কী বিশাল চকমেলানো বাড়ি বিভূতি কবিরাজের। আর গাছপালা পাখি-কড়ই গাছ অর্জুন গাছ চন্দন গোটার গাছ এমনকী দারুচিনি ত্রিফলা থেকে আমলকি গাছ, লবঙ্গ গাছের জঙ্গল পর্যন্ত আছে—সামনে বিশাল দিঘি, বাঁধানো ঘাটলা, আর লম্বা একতলা বাড়ি—আস্তাবলে বিশাল বড়ো একটা আরবি ঘোড়া বিভূতি কবিরাজ অঞ্চলে দশ বিশ পঁচিশ পঞ্চাশ এবং আরও সব সংখ্যা যোগ করে যতই অঞ্চলটা লম্বা হয়ে যাক, আপত্তি নেই, বিভূতি কবিরাজের ঘোড়া ছুটছে তো ছুটছেই। শীত গ্রীষ্মে ঘোড়ায় আর বর্ষায় পানসি নৌকা—নৌকা না বলে নৌবহরই বলা ভালো, রান্নার ঠাকুর এক নৌকায়, এক নৌকায় বড়ো বড়ো কাচের বয়াম, কোনোটার স্বর্ণসিন্দুর কোনোটায় মুক্তাভস্ম আর বায়ুপিত্ত কফ নিরোধক নানাপ্রকারের বড়ি ভরতি বয়াম। ঝোপঝাড় জ্যোৎস্না আর মল্লিকা ফুল আর দিঘি পার হয়ে কিছুটা ভিতরে ঢুকলে মনে হবে অরণ্যে নির্বাসন। এই অরণ্যে একজন দেবীকে কখনো কখনো দেখা যায়। কথিত এই বনদেবী দর্শনে পুণ্য হয়। অপুত্রকের পুত্র হয়, নিখোঁজ স্বামী ঘরে ফিরে আসে। দিঘির চারপাশে এতবড়ো একটা অরণ্য আছে আমি আর বড়দা অবশ্য পরে টের পেয়েছিলাম। কারণ বিভূতি কবিরাজ বড়দাকে বিশেষ পছন্দ করতেন। তুমি কোন ক্লাশে পড়?
এইটে।
তোমার বাবা মহেন্দ্র কত বড় কৃতী পুরুষ ছিল জানো?
বড়দার অবশ্য ফের একটা বছর নষ্ট হয়েছে। এবং সাধারণভাবে বড়দা দু বছরের কমে কোনো ক্লাশ থেকেই উত্তীর্ণ হতে চান না। আমার চেয়ে বড়দা পাঁচ বছরের বড়ো।
তুমি কোন ক্লাশে?
সিকসে।
তিনি বিশাল বারান্দায় একটি ইজিচেয়ারে বসে আছেন। সাঁজবেলা। আমরা বারান্দার একপাশে বসে আছি। ভিতর বাড়িতে যে নানা গুঞ্জন সৃষ্টি হচ্ছে, নানা কৌতূহল—কেউ কেউ মুখ বের করে উঁকিও দিয়ে গেল। আমার ছোটো ঠাকুরদার কোনো নেশা নেই, বিভূতি কবিরাজ ছোটো ঠাকুরদাকে গাঁয়ের বরিষ্ঠ মানুষ হিসাবে সম্মান প্রদর্শন করে থাকেন—ধূমপানের ইচ্ছা হলে ভিতরের ঘরে ঢুকে যাচ্ছেন, আবার বের হয়ে আসছেন, কিছুক্ষণের মধ্যেই আমাদের ভিতর বাড়িতে ডাক পড়ল—ঘরে ঘরে ঝাড় ল’নের দ্যুতি ছড়াচ্ছে এবং এই নিরবচ্ছিন্ন দ্যুতির মধ্যে এক বিস্ময়ীকে দেখা গেল।
বিদ্যুময়ী হেসে গড়িয়ে পড়ছে—
মোহন আমাকে চিনতে পারছ?
আর মোহন! মোহন মাথা নীচু করে আছে। ঘামছে।
দাদার হয়ে বললাম, আমার দাদা খুব লজ্জা পায়।
এই মোহন তুমি লজ্জা পাও?
বড়দা ঘাড় কাৎ করে বলল, না। যতই দস্যি মেয়ে হও আমি আর ডরাই না।
আমিও তাকে চিনতে পারি। বারদির লোকনাথ মন্দিরের পুরোহিত অর্ঘ্যদাদুর সম্মতিতে আমরা ছোটোঠাকুরদার সঙ্গে এসেছি। সেবারে ঠাকুমাও এসেছিলেন। মেলায় এসে ঠাকুমাই চিঠি দিয়েছিলেন, বিভূতি তোর নাতনিটাকে পাঠায়। আমাদের সঙ্গে কদিন থেকে যাক। আমি নাতি-নাতনিদের নিয়ে এসেছি, মেলায় আমাদের তাঁবু পড়েছে, সেখানে তোর নাতনি আমার সঙ্গে থাকবে। তাকে দেখার বড়ো বাসনা। তখন অবশ্য বিদ্যুত্রয়ী ফ্রক পরে। এবং কিশোরী। সে, তাঁবুতে আমাদের সঙ্গে সাত-আট দিন রাত্রিবাসও করে। বড়োদা তাকে নিয়ে মেলায় ঘুরে বেড়াত। মেঘনা নদীর চরে গিয়েও বসে থাকত। দাদা ও রেবাদি পালিয়ে চরে বসে বিন্নির খই লালবাসা খেত। আসলে প্রেমের হাতেখড়ি বলা যায়। রেবাদি ঠাকুমার পালিতা কন্যা শেফালি পিসির কন্যে। পিসির অকালমৃত্যুতে ঠাকুমার সেই ভয়ঙ্কর শোকের কথাও আমাদের মনে আছে। বিদ্যুৎস্ময়ী না বলে বিদ্যুৎলতা বললে সেই পূর্বেকার ফ্রক পরা মেয়েটিকে বেশি মানায়। সে আর যে কিশোরী নেই, তরুণী হয়ে গেছে—তার রূপে আশ্চর্য বাহার আছে, তাকে না চেনার বড়দার কোনো হেতু থাকতে পারে না। সে আমাদের জন্য চিনেমাটির প্লেটে নানারকমের মিঠাই সাজিয়ে রেখেছে। আর বড়দার মুখের দিকে তাকিয়ে মুখে আঁচল চাপা দিয়ে হাসছে।
