কী সুন্দর ফুল! আমাকে একটা দেবে?
আমার ফুল দুটো কলাপাতায়, ওর দুটো কচুর পাতায়।
তুমি দুটোই নাও। দুটোই বাগানের তাজা গোলাপ।
বাড়িতে তোমাকে বকবে না? সব দিয়ে দিচ্ছ।
হাসলাম। শেষে বললাম তোমার দাদুকে দিও। দাদুকে বলবে—রাস্তার একটা লোক…. জানো, ফুল দুটো তোমাকে দিতে বলল। ……. আর কী বলবে, বলো তো?
বা রে, আর কী বলব, জানব কী করে? আমি কি তোমাদের মতো বড়ো?
বলবে—আমিও তোমার দাদুর বাড়ির দিকে হাঁটছি। আগে থেকেই তাঁকে আমার প্রিয় ফুল দুটো পৌঁছে দিলাম।
তুমি যাবে আমাদের বাড়ি?
যাবো।
কবে যাবে?
বাস থেকে নেমে যাবার সময় হাত তুলে বললাম যাবো। ঠিক একদিন চলে যাবো। যে-কোনও দিন।
আববু বাসের জানালার হাত নাড়ল।
টা টা।
আববুর মুখে দুরন্ত হাসি। যতক্ষণ দেখা যায় বাসের জানালায় দাঁড়িয়ে আববু। আমাকে দেখল। আমি হাত নাড়ছি। হাঁটছি।
বাসটা চলে যেতেই কেমন ঝুপ করে যেন সব অন্ধকার হয়ে গেল। চোখে যেন কিছু আর দেখতে পাচ্ছি না। কে যে কখন কার প্রিয়জন হয়ে যায়, কেউ বোধহয় জানে না।
বিদ্যুৎলতা
আমাদের দেশকালের এবং জীবনযাপনের যাবতীয় দৃশ্য উল্লেখ করা দরকার, এই কারণে যে তার একটা চালচিত্র ইতিহাসের পক্ষে অত্যন্ত জরুরি। যেমন আমাদের একান্নবর্তী পরিবার এবং বাবা-জ্যাঠা-কাকারা প্রবাস থেকে ফিরে বড়ো ঘরে প্রথমে মাথা ঠুকে তারপর গৃহদেবতার বারান্দায় প্রণাম করতেন। বড়ো ঘরে এক বৃদ্ধা বসবাস করেন, কানে শোনেন না, চোখে দেখেন না, অথচ তাঁর অনুমতি ছাড়া তৃণটুকু পর্যন্ত ধরা যেত না। তাঁর কথাই শেষ কথা এবং শেষ দিকটায় দেশে ঋণসালিশি বোর্ড হয়ে যাওয়ায় এবং সংসারের আয় কমে যাওয়ায় প্রাচুর্য আর। থাকে না। পিতামহীর বোধহয় প্রত্যয় জন্মে ফজলে হিন্দুদের মাথায় কাঁঠাল ভেঙে গরিবদের বীচি খাওয়াচ্ছে। পিতামহীর বাপের খুবই প্রভাব-প্রতিপত্তি, কারণ জমি এবং জমিদারিসহ সুদের কারবার, তল্লাটে তাঁর নুন খায়নি এমন মানুষজন কমই আছে, ফজলে তাঁর নানার হাত ধরে কাছারি বাড়িতে এলে বালিকা প্রভাবতী সমবয়সি ফজলেকে যথেষ্ট সমাদর করত। কথায় কথায় আমার পিতামহী বউমাদের শাসাতেন, মনে রাইখ, আমি বরিশাল্যার মাইয়া, আমার চোখে ফাঁকি দিয়া কাম সারবা সেইটা হইব না। শুনতাছি ফজলে দ্যাশের নেতা হইছেন, তুই নেতা হইছসত আমার কি। হিন্দুরা জমিদার জ্যোতদার, সুদের ব্যাবসা করে, ট্যাঁয়া থাকলে সকলেই করে, তগ ট্যাঁয়া নাই ক্যানরে নিব্বইংশা? হিন্দু জাতের যত দোষ। এবং ফজলে গরিব চাষিদের যত্রতত্র খুশিমতো সুদের আদায় পত্রে লাগাম দিতেই, পিতামহীর ঘরে সরকারমশাইর হাজিরার নির্দেশ এল। হাজিরা দিলে জানতে পারা গেল, সরকারমশাই বরখাস্ত হয়েছেন। সুদের কারবারে টাকা খাঁটিয়ে সদে-আসলে সব যেতে বসেছে। টাকা খাঁটিয়ে আর লাভ নেই এমন সিদ্ধান্তে প্রভাবতী স্থিরকৃত হলে, বাপ-জ্যাঠাদের ডেকে বললেন, খাতাপত্র সরকারমশাইর কাছ থাইকা বুইজা ন্যাও। আমি তীর্থে চইলা যামু। বলেই সবার মুখের উপর দরজা বন্ধ করে দিলেন। পরদিন দরজা ভেঙে লাশ বের করা হল এবং আমরা টের পেলাম আমাদের প্রাচুর্য আর থাকছে না। দোল-দুর্গোৎসব বন্ধ হয়ে গেল। বছর না ঘুরতেই বাপ-জ্যাঠারা পৃথগন্ন এবং শেষমেষ, বাড়ির গৃহশিক্ষক বিদায় হলে আমার পিতাঠাকুর ফরমান জারি করলেন, অজুর পড়াশোনা বন্ধ। পড়ার খরচ চালাইতে পারমু না। মা ফ্যাল ফ্যাল করে আমার দিকে শুধু তাকিয়ে থাকলেন।
আসলে বাড়িটা শেষ পর্যন্ত আট শরিকের বাড়ি হয়ে গেল। আমার দাদাকে বড়োমামা এসে নিয়ে গেলেন, সেজোদা ছোড়দা শান্তি চলে গেল নারাণগঞ্জের সেজো জ্যাঠার বাড়ি, পড়ে থাকলাম আমি আর বড়দা মোহন। এবং কোনো বন্দোবস্ত হওয়ায় পড়াশোনা থেকে ছুটি হয়ে গেল। আমরা দুজন হাওয়ায় উড়তে থাকলাম। পড়া থেকে ছুটি কী যে মারাত্মক স্বাধীনতা। যখন তখন দু-ভাই বঁড়শি ফেলে পুকুরে বসে থাকি, বিকেলে কাবাডি খেলা সরকারদের উঠোনে, কখনো আখচুরি, আর পুকুরে ওয়ারে ওয়া। গাঁয়ের সমবয়সিরাও জুটে গেল। তখনকার গণ্ডগ্রামে পড়াশোনা অবশ্য কর্তব্য কখনো ভাবা হত না। একটাই মাইনর স্কুল ক্রোশখানেক দূরে, হাইস্কুল আরও দূরে-সাত-আট মাইল হাঁটলে অবশ্য আড়াই হাজার হাইস্কুল ধরা যায়, পিতাঠাকুর যখন বলে দিয়েছেন অত পয়সা খরচ করে হস্টেলে রেখে পড়ানোর ক্ষমতা নেই, তখন আমাদেরই বা দোষ কি। আমার বাবা বিষয়ী লোক নন। পালাগান লেখার বাতিক থাকলে যা হয় আর বড়ো জ্যাঠামশাই সেই কবে থেকে নিখোঁজ, নিখোঁজ বাপের ছেলের দায় নিতে আর কে চায় এবং যখন এমতাবস্থা অর্থাৎ আমরা ওয়ারে ওয়া কিরে ওয়া বলে গাছের ডাল থেকে লাফিয়ে জলে ডাইভ দেওয়া শিখছি, সাঁতার জলে নামলে ওঠার নাম থাকত না, ডুব সাঁতার, চিৎ সাঁতার এবং গভীর জলাশয়ের তলা থেকে এক ডুবে মাটি তুলে আনারও প্রতিযোগিতা শুরু হয়ে গেল, ঠিক এই সময়ে এক সকালে সম্মানদির ছোটো ঠাকুরদা বাড়ি এসে হাজির। সব শরিকের বউমারাই তটস্থ—কারণ বউদের জন্য পৃথগন্ন, দায় তাদের, ছোটো ঠাকুরদা বৈঠকখানায় ঢুকে আমার সেজোকাকাকে নাগাল পেতেই
তোরা কি মানুষ!
সেজোকাকা ভালো ছেলের মতো প্রায় করজোড়ে শুধু দাঁড়িয়ে আছেন। আমি কি মরে গেছি মানু!
