মুখে তার আশ্চর্য হাসিটুকু লেগেই আছে। কেউ বোধহয় এত গুরুত্ব দিয়ে তার সঙ্গে কথা বলে না।
আমার দিকে তাকিয়ে ফের মুখ তুলে বলল, তুমি অফিস যাও না?
হুঁ। যাই।
তোমার বাড়িতে কে আছে?
আমার কেন যে সহসা গলায় কথা আটকে গেল! কী বলি! সবাই আছে অথচ কেউ নেই।
একসময়, সে যেন কবেকার কথা—মা বাবা ভাই বোন, আত্মীয়স্বজনও কম ছিল না। একে একে আলগা হয়ে যেতে থাকল। স্ত্রী-পুত্র-কন্যা সম্বল করে ফ্ল্যাটবাড়ি। তারপর নিজের বাড়ি। তারপর সব ফাঁকা। পুত্র-কন্যারা সময়ই পায় না! বছরে, দু-বছরে বাড়ি ঘুরে যায় ঠিক, তবে কোথায় যেন সেই আন্তরিকতা আর নেই। এককালে এক বিছানায় সবাই শুয়েছে, বড়ো হয়েছে। তারপর কখন যে সব আলগা হয়ে গেছে।
কানের কাছে মুখ নিয়ে ফিসফিস করে বললাম, তুমি মার সঙ্গে শোও, না বাবার সঙ্গে?
বা রে, আমরা তো এক বিছানায় শুই। একসঙ্গে না শুলে আমার ঘুমই হবে না।
তুমি কাকে বেশি ভালোবাস? মাকে, না বাবাকে?
আমি সবাইকে ভালোবাসি।
তারপর থুতনিতে আঙুল রেখে কী ভাবল, যে আমার প্রশ্নের সে সঠিক জবাব দিতে পারেনি।
জানো, আসলে আমি ভাইকে সবচেয়ে বেশি ভালোবাসি।
মা-বাবাকে?
সমান-সমান।
ভাই তোমাকে ভালোবাসে?
মোটটেও না। দ্যাখো না, আমার হাত কামড়ে দিয়েছে সকালে।
খুব অন্যায়। তুমি এত ভালোবাসো, ভাই জানে না?
জানবে না কেন। মা বলেছে—নতুন দাঁত উঠেছে তো, তাই কামড়াবে। ওর তো কোনো দোষ নেই। ছেলেমানুষ, বোঝে না—কামড়ালে লাগে।
মিনিবাসটা মানিকতলার মোড়ে এসে, সামান্য জ্যামে পড়ে গেছে।
চুপচাপ বসে থাকলে যা হয়, গোলাপ দুটোর কথা মনে পড়ে গেল। খুবই যত্নের সঙ্গে কলাপাতায় মুড়ে ব্যাগে রেখেছি। ফুল দুটো কেন যে কিছুটা মায়ায় জড়িয়ে আছে, তাও ঠিক বুঝছি না। মেয়েটির মুখ মনে পড়ে গেলে যা হয়—সে দিয়েছে, সে দিয়েই খুশি তার প্রিয় লেখককে। সে কিছু আর চায়ও না। দু-দণ্ডের জন্য হলেও, আমার ফুলদানিতে ফুল দুটো শোভা পেল, তার যে খুশির অন্ত থাকবে না, তাও বুঝি।
ব্যাগে ঠিকঠাক আছে কি না, চেপ্টে না যায় সেজন্য সতর্কতার শেষ নেই।
হাত দিয়ে দেখলাম-না ঠিকই আছে।
তবে এই ফুলের জন্য বাড়ির কারও কোনো যে আগ্রহ নেই, টেবিলে রেখে দিলে পড়েই থাকতে পারে, আর কাজের লোকের দায়ই বা কতটা। সুমিত্রার অফিসে কাজের চাপ, তার শরীরও বিশেষ সুস্থ না, যেন কোনোরকমে জীবনযাপন।
কেন জানি মনে হল—ফুলদানিতে নিজেই গোলাপ দুটো রেখে দেবো। যে ক দিন তাজা থাকে। মেয়েটি আমাকে প্রণাম করার কেন যে সহসা ক্ষেপে গেছিলাম, তাও বুঝতে পারছি না। বরং এখন মেয়েটির সেই করুণ মুখের কথাও ভেবে আমার খারাপই লাগছিল।
আমার কোনো গল্প কিংবা উপন্যাস পাঠের পর মেয়েটির হয়তো মনে হয়েছিল —যদি কোনো দিন তার সঙ্গে আমার দেখা হয়, তবে এই গোলাপ দুটি তার ইচ্ছের প্রতীক হয়ে থাকবে।
তখনই আববু বলল, তোমাকে কে বেশি ভালোবাসে?
এ ভারি কঠিন প্রশ্ন।
শিশুদের প্রশ্ন এত কঠিন হয়, জানা ছিল না। মিছে কথাও বলতে পারছি না। সবাই আমাকে ভালোবাসে বলতে পারলে, খুশি হতে পারতাম। কিন্তু মিছে কথা হয়ে যাবে। এই মুহূতে কে আমার নিজের, তাও বুঝতে পারছি না। এমন নিষ্পাপ শিশুর সঙ্গে ছলনাও করা যাবে না।
বললাম, আমি ঠিক জানি না, এ-মুহূর্তে কে আমাকে বেশি ভালোবাসে।
আমার মুখ কেমন হতাশায় ভরে গেছে দেখে আববু বলল, জানো, আমার নানাজির ভারি কঠিন অসুখ। আমি ফুল নিয়ে যাচ্ছি। নানাজি ফুল খুব ভালোবাসে।
দাদুর জন্য ফুল নিয়ে যাচ্ছ? কোথায় থাকেন তিনি?
বা রে, হাতিয়াড়ায় পীরের দরগা আছে না, দরগার পাশে থাকেন।
তোমরা কোথায় থাকো?
তারকেশ্বরে। আমাদের কোয়ার্টারের পাশে সবুজ ধানখেত। যতদূর তাকাবে না….. কেবল ধানের খেত। কোয়ার্টারের পাশে ডোবা আছে। কত জল। কত কচুরিপানা। মা আমাকে যেতে দেয় না। ডোবার পাড়ে জঙ্গল। জানো, জঙ্গলে একটা ভূত থাকে।
ভূতের সঙ্গে কথা হয়।
হবে না! আড়ি দিয়ে রেখেছি। আবার ভাব হলে কথা বলব। ভূতটাই তো এসে বলল—দাদুর বাড়ি যাবি, ফুল নিবি না?
তারপর আববু কী ভেবে বলল, কী ফুল নিই, কোনো ফুলই নেই—যা গরম পড়েছে! তখনই কচুরিপানার ফুল মনে পড়ে গেল। লুকিয়ে জলে নেমে গেছি— কেউ জানে না, দুটো ফুল ডোবা থেকে তুলে এনেছি।
ভূত না বলে বন্ধু বলো।
আববু বলল, বন্ধুই তো। আমি কি বলেছি, বন্ধু নয়?
এ-সব কথাবার্তার মধ্যেই আববু তার ব্যাগ থেকে কচু পাতায় মোড়া ফুল দুটো বড়ো সন্তর্পণে বের করে আনল।
সে তারপর কচুর পাতা খুলে যা বের করল অবাক না হয়ে পারলাম না।
সত্যি, দুটো কচুরিপানার ফুল।
জীবনের ঝুঁকি নিয়ে সে ফুল দুটো বোধহয় তুলে এনেছে। সামান্য দুটো কচুরিপানার ফুল নীল-সবুজ পাপড়ি মেলে, এক বিশাল ফোয়ারার মতো আববুর দু-আঙুলের ফাঁকে দাঁড়িয়ে আছে।
আববু বলল, কী সুন্দর না! বাবা জানে না—ব্যাগে লুকিয়ে নিয়ে যাচ্ছি।
আমি বললাম, আমারও কেউ জানে না। ব্যাগে লুকিয়ে নিয়ে যাচ্ছি।
বারে, বড়োরা আবার কিছু লুকিয়ে নিয়ে যায় নাকি?
আমি বলতে চাইলাম, যায়। বড়রাই যায়।
আববু বলল, কী লুকিয়ে নিয়ে যাচ্ছ?
তোমার মতো দুটো ফুল।
দেখি কোথায় ফুল?
ব্যাগ থেকে কলার পাতা খুলে দেখাতেই আববু লাফিয়ে উঠল।
