বললাম ব্যাগটা কোলে নাও, তাহলেই জায়গা হয়ে যাবে।
ছোট্ট মেয়েটি খুবই গম্ভীর হয়ে গেল।
পেছনের সিট থেকে কেউ তখন বলছে, অ্যাই, সরে বস না। ওনাকে বসতে দে। তুই কী রে?
আমার দিকে তাকিয়ে ভদ্রলোক বললেন, সারা রাস্তায় জালাচ্ছে। কাউকে বসতে দিচ্ছে না পাশে। কিছুতেই সরে বসবে না।
অবশ্য বাসে অন্য উত্তেজনা প্রবল।
কেউ বলছে, এতদিনে সরকার একটা কাজের কাজ করেছে!
কেউ বলছে, আগেই করা উচিত ছিল। সুরক্ষা বলে কথা!
কিছুদিন ধরেই মানুষজন বড়োই উত্তেজনায় ভুগছে। এখন সুরক্ষা ছাড়া মানুষের মাথায় যেন সব কিছুই ভোঁতা হয়ে গেছে।
পেছনের সিটে বসা ভদ্রলোক মেয়েটির হয়তো কেউ হবে। বাবা হতে পারে। মামা কাকা যে-কেউ হতে পারে।
ওঁর কথায় আমি কেমন বিব্রত বোধ করলাম।
মেয়েটি আমার দিকে আর তাকাচ্ছে না। জানালার চোখ রেখে সেতু পার হবার সময় নদীর জল দেখছে। বাসে যে সুরক্ষা নিয়ে এত উত্তেজনা চলছে—কীসের সুরক্ষা, কেন সুরক্ষা সে কিছুই বুঝছে না। তার নিজের জায়গাটির সুরক্ষা ছাড়া, সে বেশি কিছু যেন বোঝেও না।
বাধ্য হয়ে বললাম ঠিক আছে। না বসলেও চলবে। আমার দাঁড়িয়ে যেতে অসুবিধে হবে না। আপনি ওকে প্লিজ, কিছু বলবেন না।
আসলে মিনি কিংবা বাসে বসতে পাওয়া গেলে, সৌভাগ্যবান হতে হয়। এখন তো আবার সুরক্ষার আবেগে মানুষজন ভাসছে। একজন বলেই ফেলল, আপনি এখানটায় বসুন। আমি দাঁড়িয়ে যেতে পারব। কোনো অসুবিধা হবে না।
না না, আপনি বসুন। আপনি দাঁড়িয়ে যেতে পারলে আমিও পারব।
লোকটির কথায় কিছুটা যে আহত, মেয়েটি আমাকে দেখেই তা টের পেয়েছে। সে কী ভেবে জানালার দিকে সামান্য সরে বসল। তার ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা কিছু খেলনাপাতি গুছিয়ে, প্লাস্টিকের ব্যাগে তুলেও রাখল।
আমি তবু বসছি না দেখে মেয়েটি বলল বোসো না। জায়গা হয়ে যাবে।
আমি হাসলাম।
মেয়েটি এত চঞ্চল আর সুন্দর যে তাকে ভারি আদর করারও ইচ্ছে হল। শিশুরা আছে বলে পৃথিবীটা যে এত সুন্দর তাও টের পেলাম।
মেয়েটি আরও চেপে, আরও একটু সরে বলল, কী হবে না?
আমি না বসলেও স্বস্তি পাচ্ছে না যেন মেয়েটি—তবু সুন্দর প্লাস্টিকের ব্যাগটি কোলের উপর রাখবে না।
কী আছে ওই ব্যাগে? এত সতর্ক ব্যাগটি নিয়ে। ব্যাগের মধ্যে এমন কোনো কোমল বস্তু থাকতেই পারে, কোলে তুলে রাখলে হাতের চাপে তা নষ্ট হয়ে যেতে পারে।
যাই থাকুক, আমার বসে পড়া ছাড়া আর উপায় নেই।
আর বসতেই মেয়েটি বলল, তোমার নাম কী গো?
এতটুকুন মেয়ে চোখ দুটো ভারি সুন্দর—আবার কখনো সব কিছু তার মনে হয় ভারি রহস্যে ভরা, সে আমার পাশে বসে আছে, পেছনে কেউ আছে তার—কত সহজে সে আমার নাম জানার আগ্রহ প্রকাশ করল।
তার দিকে তাকিয়ে হেসে দিলাম। বললাম, আমার নাম দিয়ে কী হবে?
বলোই না। জানো, বাবা আমাকে আববু বলে ডাকে। জানো, আমার না, বাবার, বাবা আছে। তাঁর বাড়িতে আমরা যাচ্ছি।
মেয়েটির কথাবার্তা এত আন্তরিক যে কেবল আদর করতে ইচ্ছে হয়। কী পাকা পাকা কথা অথচ নিষ্পাপ।
এমন জীবন তো আমরাও পার করে দিয়ে এসেছি।
বললাম, বাবার বাবা তোমার কে হয়?
বা রে, তুমি তাও জানো না! নানাজি হয়।
তাহলে দাদুর বাড়ি যাচ্ছ?
হ্যা। জানো, আমার দাদুর খুব অসুখ। বাঁচবে না। তারপর পেছনে ঘাড় ফিরিয়ে বলল, আমার বাবা। আমার মা। কোলে দ্যাখো আমার ভাই।
পেছনে চেয়ে দেখলাম—ভাইটির বয়স বছরখানেকও নয়।
ওর বাবা আমার দিকে তাকিয়ে বলল, পাশে তো বসলেন, সারা রাস্তা জ্বালিয়ে মারবে।
আমি কিছু বললাম না। ঘণ্টাখানেকের রাস্তা এবং এরা জানে না, আববুর কথা আমি কত আগ্রহ নিয়ে শুনছি।
আমার ছেলেমেয়েরা বড়ো হয়ে গেছে, তারা উড়েও গেছে—আমি আর আমার স্ত্রী এখন বাড়িতে, আমরা বড় নিঃসঙ্গ মানুষ। কাজের লোক ছাড়া আমাদের দেখারও কেউ নেই। অফিস ছাড়া কথা বলারও লোক নেই। কাগজের অফিসে কাজ, বিকালে যাই, রাতে ফিরি। আর এ-সময়ে এমন সবুজ তাজা প্রাণের স্পর্শ, কে না পেতে চায়।
আববু এবার কী বুঝে, খুব যত্নের সঙ্গে সুন্দর প্লাস্টিকের ব্যাগটি কোলে তুলে, জানালার কাছে ঘেসে বসল। তারপর আমাকে দেখল। শেষে কী ভেবে বলল, ঠিক হয়ে বোসো না। এত জড়ভরত হয়ে বসলে হয়!
ঠিক হয়ে বসতে না বসতেই বলল, এতে কী আছে, বলো তো?
এবারে ধাঁধা শুরু।
বললাম, এতে তোমার সব খেলনা, রেলগাড়ি, পুতুল উড়োজাহাজ, প্লাস্টিকের ঘরবাড়ি সব।
কিছু বলতে পারলে না। কী মজা। তুমি খুব বোকা আছো।
আমি বোকার মতো তাকিয়ে থাকলাম।
আববু বলল, এতে আছে আমার ভাইয়ের ফিডিং বোতল। জানো তো, ভাইকে আমি দুধ খাওয়াতে পারি।
কত কাজের মেয়ে পৃথিবীতে এ-কাজটি সে ছাড়া যেন আর কেউ করতে পায়ে না।
আমি ততোধিক বিস্ময়ের গলায় বললাম, বলো কী! এত কাজের মেয়ে তুমি?
জানো, আমার বাবা রোজ অফিসে যায়। মা তো একা, ভাইকে নিয়ে পেরে ওঠে না।
আর কী কাজ করো।
ঘর ঝাঁড় দিতে পারি। জানো, মা আমাকে তখন বকে। ঝাঁটা হাত থেকে কেড়ে নেয়।
তাই নাকি? তোমার মার এটা ভারি অন্যায়।
মার সঙ্গে বাসনকোসন মাজতে বসলেও বকে। কেবল বলবে—যা, পড়তে বোস। আমার পড়তে ভালো লাগে না।
কাজ করতে গেলেই, মা রেগে যায়।
খুব অন্যায়।
আমাদের কাজের দিদি না খুব ফাঁকি দেয়।
তুমি বকে দিতে পারো না?
