অরু খেপে গিয়ে বলল, আমার কপালে না তোর কপালে!
বারে, আমার কী দোষ!
হরিশবাবুকে ছোটোপিসির চিরকুট গোপনে পাচার করিস, ওটা বুঝি দোষ না।
তুমি অরুদা নিষ্ঠুর। জান, ছোটোপিসি বালবিধবা?
জানব না কেন? তাই বলে তোকে দিয়ে চিঠি পাচার করাবে! জানতে পারলে তোর কী হবে জানিস?
কী হবে?
অন্দর থেকে তোকে বাবুরা তাড়াবে।
জানবেই না, জানতে দেবই না। তুমি ছাড়া আর কেউ যে জানে না।
চিঠিতে কী লেখা থাকে জানিস?
হ্যাঁ, জানি।
বড়ো অকপটে তিথি স্বীকার করে ফেলল।
কী লেখা থাকে বলত! স্ব
প্নের কথা লেখা থাকে। জান স্বপ্নের কথা পড়তে নেই, পড়লে অভিশাপে পাথর হয়ে যেতে হয়। আমি পাথর হয়ে যাই, তুমি কি চাও?
তারপর তিথি আর দাঁড়াল না। সুপারি বাগান পার হয়ে নদীর চরায় কাশবনের ভিতর অদৃশ্য হয়ে গেল। কেন যে গেল! তিথি কী চায়! সে কিছুটা দৌড়ে গিয়েও ফিরে এল।
তার সাহস নেই। তিথির সঙ্গে নদীর চরে কাশের জঙ্গলে হারিয়ে গেলে বড়ো পাপ কাজ হবে। সে ধীরে ধীরে কাছারিবাড়িতে উঠে গেল।
বাগানের তাজা গোলাপ
আজকাল কোনো অনুষ্ঠানে আমার যেতে ইচ্ছে হয় না। তবু যেতে হয়। এমন সব কাছের মানুষজন আসে অনুরোধ নিয়ে, যাদের শেষ পর্যন্ত কিছুতেই ‘না’ বলতে পারি না। অনেক সময় উপরোধে ঢেঁকিও গিলতে হয়।
এই উপরোধের ঢেঁকি গিলতে আজ যাচ্ছি। নতুন লাইব্রেরি ভবনের উদবোধন। ফিতে কাটতে হবে। আমি এবং আমার এক লেখক-বন্ধু প্রধান অতিথি, বিশেষ
অতিথি। স্টেশন থেকে গাড়ি করে নিয়ে গেল। অনুষ্ঠানে মানুষজনের সমাগম বেশ ভালোই হয়েছে। যদিও এই গল্পের জন্য এগুলো বাড়তি কথা, তবে গল্পের তো শুরু থাকে–শুরুটা এভাবেই করা গেল।
অনুষ্ঠান শেষে অটোগ্রাফের কিছুটা ব্যস্ততা থাকে। একজন বিশ-বাইশ বছরের মেয়ে পায়ে হাত দিয়ে প্রণাম করল। আজকাল পায়ে হাত দিয়ে প্রণাম বড়ো কেউ করে না। করলেও আমার অস্বস্তি হয়। বললাম, আমি তো তোমার বাবা-কাকা হই না। প্রণাম কেন? যাকে-তাকে প্রণাম করতে নেই।
মেয়েটি একদম ঘাবড়াল না। বলল, তার চেয়েও বেশি।
খুবই দমে গেলাম কথাটাতে।
মেয়েটি দুটো তাজা গোলাপ আমার হাতে দিয়ে বলল, আমার বাগানের।
তুমি বাগান করো?
ওই আর কী! আপনাকে দেবো বলে এনেছি।
তারপরই মেয়েটি ভিড়ের মধ্যে কোথায় যে হারিয়ে গেল!
কে যে কখন নিজের পৃথিবী আবিষ্কার করে ফেলে, বুঝি না। অনুষ্ঠানের মঞ্চেই রজনীগন্ধার মালা কিংবা ফুলের স্তবক ফেলে রেখে আসি। অথবা যে বালিকা মালা পরায়, তাকে পরিয়ে দিই। কিশোর হলে, তাও পারি না। কোথায় যে সংস্কারে বাধে। অবশ্য এ-সবও গল্পের জন্য লিখছি না গল্পটি এখনো শুরুই হয়নি।
আমার এই হয়। গল্প শুরু করতে সময় লাগে, গল্প শেষ করতে সময় লাগে না।
অনুষ্ঠানের মাতব্বর ব্যক্তিরা এই প্রাচীন লাইব্রেরির বার্ষিক অনুষ্ঠানে যে-সব রথী মহারথীদের নিয়ে এসেছিলেন গত একশো বছর ধরে, তাঁদেরও বিস্তারিত বর্ণনা দিলেন। আমার মতো চুনোপুঁটিকেও কিছু বলতে হল। লাইব্রেরিতে শরৎচন্দ্রও এসেছিলেন—তিনি আসতেই পারেন। জায়গাটা থেকে শরৎচন্দ্রের বাড়ি বেশি দূরও না। একটা জংশন স্টেশন থেকে মাইল দেড়েক হেঁটে গেলেই তাঁর বাড়ি।
এমন সব কথার মধ্যেই আমাকে নতুন ভবনের ছাদে নিয়ে যাওয়া হল। ছাদটি অতি বিশাল, সামনে বর্ষার গঙ্গা কলকল ছলছল।
নদী থেকে ভারি মনোরম ঠাণ্ডা বাতাস উঠে আসছে। সামনে নিরন্তন আকাশের নীচে দাঁড়িয়ে মেয়েটির মুখ কেন যেন মনে পড়ে গেল। সে তার বাগানের দুটো তাজা গোলাপ দিয়ে গেছে। অবহেলায় গোলাপ দুটো অনুষ্ঠানের মঞ্চে যদি পড়ে থাকে, তবে তাকে খাটোই করা হবে। সে জানবেও না—গোলাপ দুটো ফেলে এসেছি। ভাবলাম, গোলাপ দুটো যত্নকরে নেওয়া দরকার। ব্যাগে রাখলে—গোলাপ দুটো নষ্ট হয়ে যেতে পারে ভেবে, একজনকে বললাম, ভাই, সামান্য কলাপাতায় গোলাপ দুটো একটু জড়িয়ে দেবে।
এবারে গল্পটা শুরু করা যাক।
হাওড়া স্টেশনে নেমে ট্যাক্সি পাওয়া গেল না। আচমকা ট্যাক্সি ধর্মঘট। কোথায় যেন ট্যাক্সি ডাইভারের খুনখারাবির খবর পাওয়া গেল।
আমার লেখক-বন্ধুটি থাকে দক্ষিণে। আমি থাকি উত্তরে। রাত প্রায় দশটা বাজে। আমাদের দিকের বাস-টাস কিংবা মিনি রাত দশটার পর বিরল হয়ে আসে। শেষে বিপদে না পড়ি—এই ভেবে, একটা মিনিবাস ধরার আশায় সাবওয়ের দিকে এগোতে থাকি।
বাস স্ট্যান্ডে গিয়ে দেখলাম আমাদের দিকের একটা বাসও নেই।
আর একটু এগিয়ে দেখা দরকার, মিনি যদি থাকে। ভাগ্য প্রসন্ন, পেয়েও গেলাম। উঠে দেখি, ভেতরের দিকে একটি সিট-ই খালি আছে। তবে বসা মুশকিল। একজন সাত-আট বছরের বালিকা সিটের অধিকাংশ জায়গা দখল করে রেখেছে।
কী যে বলি!
মেয়েটির পাশে একটি সুন্দর প্লাস্টিকের ব্যাগ। কোলে প্ল্যাস্টিকের একটি হরিণ-শিশু। একপাশে তার ছোট্ট খেলনার রেলগাড়িও আছে। সে তার লটবহর নিয়ে বেশ ছড়িয়ে-ছিটিয়ে বসে আছে।
বললাম, আমাকে একটু জায়গা দেবে? বসব।
মেয়েটি আমাকে দেখে মুখ তুলে, তারপর জানালার দিকে তাকিয়ে বলল, না। আমি সরে বসব না।
সুন্দর প্লাস্টিকের ব্যাগটি সে জানালার দিকেই রেখেছে। আর আশ্চর্য, ব্যাগটি সুরক্ষার জন্যই হোক, অথবা অন্য কোনো কারণেও হতে পারে, সে বেশ দু-সিটের অনেকটা জায়গাই দখল করে বসে আছে। ও সরে না-বসলে, আমার বসার জায়গা হয় না।
